ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থেকে ঢাকাসহ বা অন্য কোনো শহরে যাতায়াতে কুমিল্লার মুরাদনগর অথবা পার্শ্ববর্তী বাঞ্ছারামপুর ঘুরে নারায়ণগঞ্জের ভুলতা-ধনবাড়িয়া হয়ে যেতে হয়। এতে ৫০-৬০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরতে হয়। আবার নবীনগর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরে যাতায়াতে স্পিডবোট বা পার্শ্ববর্তী কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে যেতে হয়। মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে আশুগঞ্জ থেকে নবীনগর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০১৮ সালে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর থেকে দেখা দেয় নানা জটিলতা। প্রকল্প প্রস্তাবের ত্রুটির কারণে সংশোধন করতে হয়। এরপর থেকে ঠিকাদারের গাফিলতিতে সময় পার হওয়ার পর সড়কটির নির্মাণকাজে এখন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূমি অধিগ্রহণ। গত সাত বছরে প্রকল্পের মেয়াদ তিন দফা বাড়ানো হলেও মাত্র নয় কিলোমটার সড়ক নির্মাণ শেষ করতে পেরেছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। চলতি বছরের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় আরো দুই বছর বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, জেলার দুই উপজেলার মধ্যে সড়কটি সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা ছাড়াও ঢাকার সঙ্গে নবীনগরের যোগাযোগকে সহজ করবে। ৫০-৬০ কিলোমিটার পথ ঘুরে কুমিল্লা হয়ে আর ঢাকা যেতে হবে না তাদের। তবে সড়কটি নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের।
লালপুর সিএনজি স্টেশনের কাছে মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিনের বাড়ির মুখে এসে বন্ধ রয়েছে সড়কের কাজ। অন্যদিকে লালপুর পশ্চিমপাড়ায় হোসেন ডাক্তারের বাড়ির মুখে এসে থেমে গেছে সড়কটি। মাঝখানে কৃষিজমির ওপর দিয়ে সড়ক নির্মাণ হলেও তা ব্যবহার করতে পারছেন না স্থানীয়রা। সড়কের দুই মুখে থাকা বাড়িঘরও উচ্ছেদ করা হয়নি। অধিগ্রহণের টাকা না পাওয়ায় অনেকে জমি খালি করে দিচ্ছেন না। দুই বছর ধরে থমকে আছে নির্মাণকাজ।
লালপুর পশ্চিমপাড়ার তানভীর মাহমুদ বলেন, ‘মঙ্গলবার বাইশমৌজা গরুর হাটের কারণে ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে পারে না। প্রচুর গাড়ি আসা-যাওয়া করে। কিন্তু সড়ক নির্মাণকাজের কোনো খোঁজখবর নেই। আমাদের ৪ শতাংশ জমি অধিগ্রহণের মধ্যে পড়েছে। ক্ষতিপূরণ না দেয়ায় জমি খালি করছেন কেউ। এজন্য সড়কের কাজ হচ্ছে না।’
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৪২১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নবীনগর-আশুগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন হয়। ১৯ দশমিক ৯৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ১০ দশমিক ৩ ফুট প্রস্থের সড়কের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের ১ জুলাই। ২০২১ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অনুমোদিত প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ না থাকা, ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা, প্রকল্প প্রণয়ন কমিটির বিশেষজ্ঞদের ভূমি অধিগ্রহণের পরিমাণে ভুল, ঠিকাদারের সময়মতো কাজ শুরু করতে না পারা ও প্রকল্প সংশোধনের কারণে কাজ শুরু করা যায়নি। প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় প্রকল্পের ব্যয় ছিল ৪২১ কোটি টাকা। পরে ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা নিরসনে ব্যয় ৪৩ দশমিক ৫২ শতাংশ, অর্থাৎ ১৮৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা বাড়িয়ে সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। সর্বশেষ ৬০৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হয়। দ্বিতীয় দফায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তৃতীয় দফায় প্রকল্পে বরাদ্দের অর্থ ও সময় দুটিই বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। তবে নতুন প্রকল্প প্রস্তাব পাস হলেও কাজ এগোয়নি। গত সাত বছরে তিতাস ও পাগলা নদীতে দুটি বড় সেতুসহ আটটি সেতু, ১৩টি কালভার্ট এবং সাব বেইজসহ নয় কিলোমিটার সড়কের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এরই মধ্যে চলতি বছরের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় আরো দুই বছর বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
সরজমিনে দেখা গেছে, সড়কের কৃষ্ণনগর-বাইশমৌজা অংশের গাজীরকান্দি ও কিশোরপুরে সড়ক থেকে সেতু অনেক উঁচুতে। এতে যানবাহন ওঠা তো দূরে কথা, মানুষের ওঠাই কষ্টকর। লালপুর থেকে আশুগঞ্জের দিকে নোয়াগাঁও ও ত্রিমোহনায় প্রায় দুই কিলোমিটার অংশে সড়কের কাজই শুরু হয়নি।
সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৮ সালের ১ জুলাই থেকে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সড়ক বাস্তবায়নের সময় রয়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাগজপত্রে কাজের অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৭৮ শতাংশ।
এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভূমি অধিগ্রহণ হয়নি, এটাই মূল সমস্যা। সড়ক নির্মাণে ৫৩ একর ১৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়েছে ২০২২-২৩ অর্থবছরে।’
আঞ্চলিক এ মহাসড়কের জন্য ভূমি অধিগ্রহণে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা। তবে ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত ঘটনায় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে কয়েকটি মামলা রয়েছে। এসব জটিলতা শেষে কবে নাগাদ সেতুর কাজ শেষ হবে, তা বলতে পারছেন না কেউই।
এ ব্যাপারে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জেসমিন সুলতানা বলেন, ‘মামলাগুলোর একেকটি ধাপে আমরা কাজ করছি। মোটামুটি সবগুলোতে গণবিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছে। বেশকিছু কমিশনার স্যারের অফিসে আপত্তির জন্য সময় দেয়া হয়েছে। আপত্তির শুনানি সাপেক্ষে এখানে ৭ ধারা নোটিস জারি হবে। তারপর ৮ ধারা নোটিস জারির পর যাদের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, তারা টাকা পেয়ে যাবেন। এর মধ্যে একটি মামলায় আগামী ১৫ দিনের মধ্যে টাকা দেয়া শুরু হবে। বাকিগুলোর টাকা দিতে আরো তিন মাস সময় লাগবে।’










