বিত্তবান বিদেশীদের আকৃষ্ট করতে ২০১৯ সালে গোল্ডেন ভিসা চালু করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। বাংলাদেশী ধনিক শ্রেণীর অনেকেই আমিরাতের দেয়া এ সুযোগ লুফে নিচ্ছেন। ব্যাংক পরিচালক, পোশাক ব্যবসায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেটর, রেল ও সড়কের সামনের সারির ঠিকাদার—দেশের বড় ও মাঝারি এমন অনেক পুঁজিপতিই এখন আমিরাতের গোল্ডেন ভিসাধারী। আর দুবাইয়ের এ গোল্ড কার্ডধারী ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে দেশ থেকে বিপুল অংকের পুঁজি পাচার হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একসময় বাংলাদেশের ধনিক শ্রেণীর পুঁজিপতিদের কাছে অবকাশযাপনের জন্য জনপ্রিয় গন্তব্য ছিল দুবাই। তবে কয়েক বছরে বিনোদনের পাশাপাশি দুবাইকে ঘিরে ব্যবসায়িক কার্যক্রমেরও ব্যাপক প্রসার ঘটিয়েছেন বাংলাদেশী বিত্তবানরা। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশটির আবাসন খাতে বড় অংকের বিনিয়োগ করেছেন বাংলাদেশীরা। এছাড়া দেশের অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছে দুবাইকে।
জানা যায়, গোল্ডেন ভিসাধারী ব্যক্তি ও তার পরিবারের সদস্যরা আমিরাতে ১০ বছরের রেসিডেন্সিয়াল সুবিধা পান। ভ্রমণের ক্ষেত্রে গোল্ডেন কার্ডধারীদের ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া বেশ সহজ। এছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও বিশেষ সুবিধা দেয়া হয় ভিসাধারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের। ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি পাওয়ার প্রক্রিয়াগুলোও এক্ষেত্রে তুলনামূলক সহজ। এদিকে সম্প্রতি গোল্ডেন ভিসাকে আরো জনপ্রিয় করতে এর প্রক্রিয়া সহজতর করার পাশাপাশি এর সুযোগ-সুবিধার পরিধি আরো প্রসার করেছে আরব আমিরাত। আগে গোল্ডেন কার্ডধারীরা টানা ছয় মাসের বেশি আমিরাতের বাইরে অবস্থান করার সুযোগ ছিল না। তবে ৩ অক্টোবর সংশোধন করা নীতি অনুযায়ী, গোল্ডেন ভিসাধারীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশটির বাইরে অবস্থান করতে পারবেন।
দুবাইয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন মোহাম্মদ মাহবুব পারফিউমস ও টোকিওস্যাট এলএলসি গ্রুপের কর্ণধার মো. মাহাবুব আলম। আমিরাতে গোল্ডেন ভিসাপ্রাপ্ত বাংলাদেশীদের মধ্যে শুরুর দিককার একজন তিনি। বাংলাদেশী পুঁজিপতিদের মধ্যে গোল্ড কার্ড গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধির বিষয়ে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘গোল্ডেন ভিসার কারণে একদিকে যেমন দেশটির পক্ষ থেকে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়, পাশাপাশি এটা সামাজিক মর্যাদা ও সম্মানেরও বিষয়। বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া কোনো ধরনের জটিলতা ছাড়াই বেশ দ্রুত সম্পন্ন হয়। বিশেষ করে করোনাকালীন দেশটিতে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে যখন বেশ বিধিনিষেধ ছিল, তখন এখানকার নাগরিক ও গোল্ডেন ভিসাধারীরা নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পেরেছেন। সুযোগ-সুবিধা ও সম্মানের কারণে করোনা-পরবর্তী সময়ের এ কার্ডটি পাওয়ার জন্য বাংলাদেশীসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আগ্রহীরা অনেক বেশি হারে আবেদন করতে শুরু করেন। বিশেষ করে গত এক বছরে প্রচুরসংখ্যক বাংলাদেশী এ ভিসা পেয়েছেন। কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ না করা হলেও সাধারণ পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আমিরাতের গোল্ডেন ভিসা প্রাপ্তির দিক থেকে এশিয়ার মধ্যে ভারতের পরেই বাংলাদেশীদের অবস্থান। আমার জানা মতে, বর্তমানে অন্তত দুইশ বাংলাদেশী এ ভিসা পেয়েছেন। এর মধ্যে অন্য পেশার কিছু ব্যক্তি থাকলেও নব্বই শতাংশের বেশিই ব্যবসায়ী।’
গোল্ডেন ভিসা প্রদানের প্রক্রিয়া সহজীকরণ বিষয়ে এ ব্যবসায়ী বলেন, ‘২০১৯ সালে আমরা যখন এ ভিসার জন্য আবেদন করি, তখন নানা ধরনের শর্ত ছিল। বিভিন্ন আর্থিক ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের নিরীক্ষা প্রতিবেদনও জমা দিতে হয়েছিল। তখন শত মিলিয়ন দিরহামের মালিক এমন অনেকেও এ ভিসা পাননি। আর এখন দুই মিলিয়নের মালিক হলেও এ ভিসার আবেদন করতে পারেন। শর্ত ছাড়াও ভিসা প্রদানের প্রক্রিয়াও আগের চেয়ে অনেক সহজে ও দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে।’
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সম্প্রতি বছরগুলোয় বড় ও মাঝারি মানের বাংলাদেশী পুঁজিপতিরা সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছেন আবাসন খাতে। দুবাইয়ের ইংরেজি ভাষার টেলার রিপোর্ট ও আরবি ভাষার ইমারাত আল ইউমের একটি প্রতিবেদনেও এমন তথ্য উঠে আসে। বাংলাদেশীদের বিনিয়োগ নিয়ে গত বছর ‘রিচ পিপল অব বাংলাদেশ বাই রিয়েল এস্টেট ইন দুবাই ওর্থ ১২৩ মিলিয়ন দিরহামস’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে টেলার। দুবাইয়ে ভূমি বিভাগের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনাকালে আরব আমিরাতের আবাসন খাতে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছেন বাংলাদেশীরা। এ খাতে বাংলাদেশীদের বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১২ কোটি ৩০ লাখ দিরহাম।
দুবাইয়ে সম্পত্তি গড়ার ক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ডের নাগরিকদেরও পেছনে ফেলেছেন বাংলাদেশীরা। দেশটির ধনাঢ্যরা ১১ কোটি ৭৬ লাখ ৭০ হাজার দিরহামের সম্পত্তি কিনে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন। আর দুবাইয়ে সুইজারল্যান্ডের নাগরিকরা ১১ কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার দিরহামের সমপরিমাণ বিনিয়োগ করে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন। চীনের মতো দেশকেও এক্ষেত্রে হার মানিয়েছেন বাংলাদেশীরা। চীনের নাগরিকরা ১০ কোটি ৭৯ লাখ দিরহামের সম্পত্তি কিনেছেন। আর জার্মানির নাগরিকরা সাড়ে ১০ কোটি দিরহামের সম্পত্তি কিনে পঞ্চম স্থানে রয়েছেন।
আবাসন খাতে বেশি বিনিয়োগের কারণ বিষয়ে কথা হয় দুবাইয়ে বসবাসরত বাংলাদেশী একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীর। তিনি নিজেও গোল্ডেন ভিসাধারী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আবাসনে বিনিয়োগ করলে কোনো ধরনের ঝুঁকি থাকে না। বরং উল্টো এর মূল্য বাড়তে থাকে। এছাড়া নিয়মিত দেখভাল বা সময় দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। যেহেতু দুবাইয়ে বিনিয়োগকারী অনেক বাংলাদেশীই এখানে অবস্থান করেন না, তাই তাদের পক্ষে অন্য কোনো খাতে বিনিয়োগ করা সম্ভব হয় না।
তিনি আরো বলেন, যারা নিয়মিত দুবাইয়ে আাাসা-যাওয়া করেন, তারা এখানে নিজেদের থাকার জন্য প্রপার্টি গড়ে তুলছেন। অনেকে নিজে অবস্থান করতে না পারলেও তার পরিবারের সদস্যদের এখানে রেখে যান। পরিবারের সদস্যদের অবস্থানের জন্যও অনেকে প্রপার্টি কিনছেন। এসব কারণেই রিয়েল এস্টেটে বাংলাদেশীদের বিনিয়োগের পরিমাণ এত বেশি।
গত কয়েক বছরে দুবাইয়ে বড় মাপের ব্যবসা শুরু করেছে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বৃহৎ শিল্প গ্রুপ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এজন্য বাংলাদেশ থেকে বিপুল অংকের অর্থ অবৈধ পন্থায় দুবাইয়ে স্থানান্তর করতে হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ করা নিষিদ্ধ। দুবাইয়ে বসবাসরত বাংলাদেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও আমলা শ্রেণীর বাংলাদেশী পুঁজিপতিরা দুবাইয়ে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনছেন। আবাসন খাতে বিনিয়োগের পাশাপাশি বাংলাদেশী ধনাঢ্যরা স্বর্ণ, পোশাক, রেস্টুরেন্ট ও বেকারি খাতেও বেশ বিনিয়োগ করছেন বলে জানান তারা। আরব আমিরাতে দুই দশকের বেশি সময় ধরে বাস করছেন এমন একজন বাংলাদেশীর ভাষ্যমতে, ‘দুবাইয়ে নিয়মিত আসা-যাওয়া করেন, আর এখানে ফ্ল্যাট নেই এমন ধনাঢ্য ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন। বরং দেশে যেমন বড় অট্টালিকা গড়ার এক ধরনের প্রতিযোগিতা রয়েছে, এখানেও এখন সেটি শুরু হয়েছে। সামনে নির্বাচনকে সামনে রেখে এ হার আরো বাড়তে পারে। এজন্য অর্থ স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে এমন ব্যক্তি ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো আগের চেয়ে বেশি সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।’










