রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় গতকাল শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। সোমবার মধ্যরাতে শিক্ষার্থী ও খাবার ব্যবসায়ীদের মধ্যে কথাকাটাকাটি দিয়ে ঘটনার সূত্রপাত হয়। পরে তা রূপ নেয় হাতাহাতি ও সংঘর্ষে। দিনভর সংঘর্ষে গতকাল নিউমার্কেট-ঢাকা কলেজ এলাকা রণক্ষেত্রে রূপ নেয়। সংঘর্ষের ঘটনায় নাহিদ হাসান (১৮) নামে এক পথচারীর মৃত্যু হয়েছে।
নিহত নাহিদ হাসান এলিফ্যান্ট রোড বাটা সিগন্যাল এলাকার একটি কুরিয়ার সার্ভিসে ডেলিভারিম্যান হিসেবে চাকরি করতেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. তৌফিক এলাহী জানান, সংঘর্ষের ঘটনায় এক শিক্ষার্থীসহ চারজন আইসিইউতে ভর্তি ছিল। এর মধ্য একজন মারা গেছে। প্রথম থেকেই তার অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল।
জানা যায়, নিউমার্কেট এলাকায় সংঘর্ষের সময় নাহিদ আহত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে ছিল। পরে শুভ নামে একজন দুপুরের দিকে তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসে।
নিহত যুবকের বাবা নাদিম হাসান জানান, নাহিদ সকালে কামরাঙ্গীরচর দেওয়ান বাড়ি এলাকার বাসা থেকে কর্মক্ষেত্রের উদ্দেশে বেরিয়ে যায়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার হাসপাতালে ভর্তির সংবাদ জানতে পারে পরিবার।
এদিকে সংঘর্ষ ও শিক্ষার্থী-ব্যবসায়ীদের সড়কে অবস্থানের কারণে গতকাল ঢাকা কলেজ-নিউমার্কেট এলাকায় যান চলাচল বন্ধ ছিল। এ ঘটনায় আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ী। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
আগের রাতের আড়াই ঘণ্টার সংঘাতের পর গতকাল সকাল থেকেই ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। সকাল ১০টার দিকে ‘শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার’ প্রতিবাদে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল বের করে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভ মিছিল চন্দ্রিমা মার্কেটের সামনে এলে নিউমার্কেটের দোকান মালিক ও কর্মচারী ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করে। এতে শিক্ষার্থীরা পিছু হটে। পরে প্রস্তুতি নিয়ে এসে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এ সময় কলেজের সামনের সড়কে লাঠি, রড হাতে জড়ো হওয়া শিক্ষার্থীদের ঢিল ছুড়তে দেখা যায়। অন্যদিকে নিউমার্কেট ওভারব্রিজ এলাকায় অবস্থান নিয়ে থাকা দোকান কর্মচারীরা পাল্টা জবাব দেয়। অনেকের হাতে লাঠি ও মাথায় হেলমেট দেখা যায়। ঢিল ছোড়াছুড়িতে বেশ কয়েকজন আহত হয়। বেলা আড়াইটার দিকে ঘটনাস্থলে আসে পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পেরে একপর্যায়ে টিয়ার গ্যাস ছোড়ে। এ সময় কয়েকটি বিস্ফোরণের আওয়াজও পাওয়া যায়।
শিক্ষার্থী-ব্যবসায়ীদের এ সংঘর্ষে গতকাল রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত অন্তত ৭৫টি বিপণিবিতান বন্ধ ছিল বলে দোকান মালিকরা জানিয়েছে। ঈদের ভরা মৌসুমে সংঘর্ষ ও দোকানপাট বন্ধ থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তারা। নিউমার্কেট দোকান মালিক সমিতির সভাপতি শাহীন আহমেদ জানান, আগের রাতের সংঘর্ষের পর সব পক্ষকে শান্ত করে রাত ৪টার দিকে আমরা বাসায় ফিরেছিলাম। আমরা ছাত্রনেতাদের কথাও দিয়েছিলাম যে ব্যবসায়ীরা আর সংঘর্ষে জড়াবে না। কিন্তু সকালে ছাত্ররা আবার সড়ক অবরোধ করলে পাশে চাঁদনী চক, গাউছিয়া ও অন্যান্য মার্কেটের ব্যবসায়ীরা আবার একত্র হয়ে সংঘর্ষে জড়ায়। পরে বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে খারাপের দিকে যায়। দুপুরের দিকে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা নূরজাহান মার্কেট ও চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটে আগুন দেয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিটের প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।
আগের রাতের ঘটনার বিষয়ে নিউমার্কেট দোকান মালিক সমিতির নেতা শাহীন আহমেদ জানান, মার্কেটের ৪ নম্বর গেটের কাছে একটি খাবারের দোকান থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত।
তার দাবি, ওই খাবারের দোকানের লোকজনের সঙ্গে কয়েক শিক্ষার্থীর বাকবিতণ্ডার পর ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা দলবদ্ধ হয়ে এসে হামলা চালায়। পরে রাতে ছাত্ররা অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করে। কয়েকটি দোকানে লুটতরাজ চালায়। পুলিশ ঠিক সময়ে না এলে তারা মার্কেটে আগুন ধরিয়ে দিতে পারত।
অন্যদিকে তাহসান রাকিব নামে ঢাকা কলেজের এক শিক্ষার্থী বণিক বার্তাকে বলেন, চতুর্থ বর্ষ আর মাস্টার্সের তিনজন শিক্ষার্থী রাতে খেতে যায়। সে সময় দাম নিয়ে তাদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে দোকানিরা ধারালো ছুরি নিয়ে শিক্ষার্থীদের গুরুতর জখম করে। এ খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা গিয়ে ভাংচুর চালায়। এরপর ব্যবসায়ী ও পুলিশ ধাওয়া দিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে দেয়।
এদিকে মধ্যরাতে পুলিশ রাবার বুলেট নিক্ষেপ করতে করতে ঢাকা কলেজের ক্যাম্পাসের মধ্যে প্রবেশ করে। এতে সাত শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি ১৫ শিক্ষার্থী আহত হয় বলে জানা যায়। বিক্ষোভে অংশ নেয়া এক শিক্ষার্থী বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের সহপাঠীরা মারধরের শিকার হয়েছে। এর বিচার চাইতে গেলে বিচার তো পেলামই না, উল্টো পুলিশি হামলার শিকার হলাম। আমরা এ ঘটনার বিচার চাই।
এদিকে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের ওপর নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী-কর্মচারীদের হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে গতকাল রাস্তায় নেমে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা। দুপুরে নীলক্ষেত মোড়ে অবস্থান নেয়া এ দুই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন হল শাখার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকও অংশ নেন।
তাদের অভিযোগ, আজিমপুর, হাজারীবাগ এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মারধর করেছে নিউমার্কেটের ব্যবসায়ীরা। আজিমপুরে বিডিআর ৩ নম্বর গেটের সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি হলের আবাসিক ছাত্রীরা ক্লাস-পরীক্ষা দিতে ক্যাম্পাসে আসতে চাইলে তাদের উত্ত্যক্ত করা হয়। এছাড়া নিউমার্কেটের ব্যবসায়ীরা ইডেন কলেজের ছাত্রীদের সবসময় হয়রানি করেন। মার্কেটের ভেতরে দোকান কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নারী ক্রেতাদের উত্ত্যক্ত করারও অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিউমার্কেটের ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে আগামী ৫ মে পর্যন্ত ঢাকা কলেজ বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক এটিএম মইনুল হোসেন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বিকালের মধ্য শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়। যদিও প্রশাসনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কলেজ অধ্যক্ষকে দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ করে রাখে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
এদিকে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। সমন্বয়ক ইসমাইল হোসেন সম্রাট বণিক বার্তাকে বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ ও ব্যবসায়ীদের যৌথ হামলার প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে আগামীকাল বেলা ১১টায় নীলক্ষেত মোড় অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করেছি।










