প্রথমে জাপানি নাগরিক হত্যা ও পরে বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে রংপুরে নতুন রাডার স্থাপনের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। প্রথম ঘটনার পর নিরাপত্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে যখন কাজ শুরুর প্রস্তুতি চলছিল, তখন করোনার হানায় আবার পিছিয়ে যায় রাডার স্থাপনের কাজ। এতে অনিশ্চয়তায় পড়েছে নতুন রাডার স্থাপন কাজ। ফলে যথাসময়ে আবহাওয়ার তথ্য না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি ব্যবস্থা।
জানা যায়, রংপুরে আবহাওয়া, রাডার ও ভূকম্পন পর্যবেক্ষণাগারের একমাত্র রাডারটি দীর্ঘ এক যুগ ধরে অকেজো হয়ে পড়ে থাকায় প্রায় ৪০০ কিলোমিটার এলাকার মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাচ্ছেন না। এতে তারা দুর্যোগের আগাম প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রংপুর ও এর আশপাশের কৃষিকাজ। ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একমাত্র রাডারটি অকেজো হওয়ায় কালবৈশাখী ঝড়সহ আবহাওয়ায় আগাম বার্তা না পেয়ে নিরুপায় এলাকাবাসীকে ঢাকাসহ অন্যান্য আবহাওয়া অফিসের বিলম্ব তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
রংপুরের আলম নগর এলাকায় ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে ২ দশমিক ৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করে স্থাপন করা হয় বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের অধীন আবহাওয়া, রাডার ও ভূকম্পন পর্যবেক্ষণাগার। প্রতিদিনের আবহাওয়া, ভূমিকম্পন পরিমাপসহ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার জন্য ঢাকা প্রধান অফিসকে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে এর যাত্রা শুরু হয়।
স্থানীয় আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৯ সালে জাপান সরকারের অর্থায়নে এবং তাদের কারিগরি সহায়তায় প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে রাডার স্থাপন করা হয়। ১০ বছর মেয়াদের রাডারটি ২০০৯ সাল পর্যন্ত চালু থাকার পর ত্রুটি দেখা দেয়। স্থানীয় ইঞ্জিনিয়াররা ২০১২ সাল পর্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে রাডারটি চালু রাখতে সক্ষম হলেও পরবর্তী সময়ে পুরনো রাডারের যন্ত্রাংশ তৈরি না হওয়ায় এটি পুরোপুরি বিকল হয়ে যায়। স্থানীয় আবহাওয়া অফিসের একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকার একনেকে রংপুরের জন্য একটি আধুনিক রাডার স্থাপনের বিল পাস করেছে। জাপানি সরকারের প্রায় ২০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ অনুদানে রাডার স্থাপন করা হবে। কিন্তু কার্যক্রম প্রথমে বাধাগ্রস্ত হয় ২০১৫ সালের ৩ অক্টোবর রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার আলুটারি গ্রামে জাপানি নাগরিক হোশিও কোনি দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হওয়ার পর। রংপুর আবহাওয়া, রাডার ও ভূকম্পন পর্যবেক্ষণাগারের দেড় বছর আগে অবসরে যাওয়া সাবেক ইনচার্জ প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাপানি প্রকৌশলীরা নিরাপত্তার অভাব বোধ করায় বেশকিছু নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। তিনি বলেন, তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রংপুর আবহাওয়া অফিসে পুলিশ ব্যারাক এবং তাদের থাকার জন্য ডরমিটরি নির্মাণের এবং সীমানা প্রাচীরের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার কাজ হয়েছে। এমনকি তিনি থাকাকালীন যে জাপানি প্রকৌশলীরা এখানে কাজ করবেন, তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একটি টিম সাইট পরিদর্শন করে গেছেন। এ সময় তারা নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাগুলো সচক্ষে দেখেছেন এবং সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু পরে করোনার কারণে আবার বাধাগ্রস্ত হয় নতুন রাডার স্থাপনের কাজ।
রংপুর আবহাওয়া, রাডার ও ভূকম্পন পর্যবেক্ষণাগারের বর্তমান ইনচার্জ প্রকৌশলী মোস্তাফিজার রহমান বলেন, প্রথমে জাপানি নাগরিক হত্যা এবং পরে করোনার কারণে নতুন রাডার স্থাপনের কাজ বিলম্বিত হয়েছে। বর্তমান অগ্রগতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাত মাস আগে রাডার স্থাপনের টেন্ডার হয়ে গেছে। বর্তমানে গাজীপুরে রাডার স্থাপনের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। এখানে কাজ শেষ হলে আশা করা যাচ্ছে আট থেকে নয় মাসের মধ্যে রংপুরের রাডার স্থাপনের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। আগের রাডারটি ছিল ম্যানুয়াল। আগামীতে যে রাডার স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেটি হচ্ছে ডপলার রাডার (আধুনিক)। এটি চালু হলে এ কেন্দ্র থেকে আবহাওয়ার তথ্য পর্যবেক্ষণ দ্রুততার সঙ্গে করা সম্ভব হবে।










