বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রকৌশল শাখার বিরুদ্ধে জনবসতিশূন্য এলাকায় পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। দুই পাড়ার সংযোগ স্থাপনের নামে রাস্তাটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জানা গেছে, কতিপয় ব্যক্তির স্বার্থেই জনবসতিশূন্য এলাকায় রাস্তাটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এজন্য প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। লাঙ্গ্যেপাড়াবাসীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কানাপাড়া-লাঙ্গ্যেপাড়া রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে বলে দাবি জেলা পরিষদের নির্বাহী প্রকৌশলীর। তবে রাস্তাটির জন্য পাড়াবাসীর পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়নি বলে জানিয়েছেন লাঙ্গ্যেপাড়ার কারবারি (পাড়াপ্রধান) চিংহ্লা মারমা। পরিবেশ অধিদপ্তর বান্দরবান কার্যালয় জানিয়েছে, পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। জনশূন্য এলাকায় রাস্তার বিষয়টি তদন্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (পরিষদ অধিশাখা) মো. জাহাঙ্গীর আলম।
স্থানীয়রা জানান, বান্দরবান-কোরনীহাট সড়ক হয়ে কানাপাড়া যাওয়ার রাস্তার শুরুতে প্রায় ২০০ মিটার পাহাড় এক্সক্যাভেটর দিয়ে কাটা হচ্ছে। রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া এলাকাটিতে কোনো জনবসতি নেই। বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের কাজটি সেন্টু নামের এক ঠিকাদারকে দেয়া হয়েছে।
শনিবার সরজমিনে দেখা গেছে, কানাপাড়া সড়কঘেঁষে পূর্ব দিকে ২০০ মিটার পাহাড় কেটে কাঁচা রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। কানাপাড়া সড়ক হতে কাঁচা রাস্তা দিয়ে হেঁটে গিয়ে আনুমানিক ১৫০ মিটার ভেতরে সৃজিত নানা প্রজাতির বৃক্ষরাজিতে ভরা পাহাড় কাটা হচ্ছে। তবে পাহাড় কাটা শুরুর অংশে কানাপাড়া সড়কঘেঁষা একটি ছোট টিনশেডের ঘর রয়েছে। ঘরটির সামনে একটি গাছে টাঙানো সাইন বোর্ডে লেখা রয়েছে, ক্রয় সূত্রে এ জায়গার মালিক রাশেদ, মো. আরিফ হাসনাইন, হাবিব উল্লাহ খান ও আশিকুর রহমান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই ব্যক্তিরা স্থানীয় নয়। স্থানীয় ভূমির দালালদের মাধ্যমে জায়গাগুলোর মালিক দেখাচ্ছেন তারা। ওই ব্যক্তিদের মালিকানাভুক্ত পাহাড়ের ওপরের অংশও এক্সক্যাভেটর দিয়ে কেটে সমান করা হয়েছে। এছাড়া লুম্বিনী গার্মেন্টসের মফিজুল ইসলাম মামুনসহ আরো কতিপয় প্রভাবশালীর দখলেও ভূমি রয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। তবে সেলফোন নম্বর না পাওয়ায় ওই ব্যক্তিদের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। দেখা গেছে, চলাচলের অনুপযুক্ত উঁচু-নিচু, ঢালবেষ্টিত বিশাল এলাকাটি জনবসতিশূন্য।
সে সময় কথা হলে এক্সক্যাভেটরচালক শহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নয়দিন ধরে পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করছি। এটি জেলা পরিষদের কাজ। ঠিকাদার সেন্টু। এক্সক্যাভেটরের মালিক একজন আইনজীবী। এখানে মাটি কাটার কাজ করতে আমাকে পাঠিয়েছেন। ’
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রকৌশল শাখা সূত্র জানায়, কানাপাড়া-লাঙ্গ্যেপাড়া রাস্তা নির্মাণে পাহাড় কাটা হচ্ছে। স্কিমটির প্রাক্কলন মূল্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা। চুক্তি মূল্য ৪৫ লাখ ২ হাজার ৪০০ টাকা। কাজটি দেয়া হয়েছে সিয়াম এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে, যার স্বত্বাধিকারী আবুল কালাম সেন্টু। রাস্তাটি কানাপাড়া সড়ক দিয়ে শুরু হয়ে প্রায় ৬০০ মিটার পর্যন্ত করা হবে। শিডিউলে এইচবিবি, এল ড্রেন, রিটেইনিং ওয়াল, ড্রেন ধরা রয়েছে।
জানতে চাইলে ঠিকাদার আবুল কালাম সেন্টু সেলফোনে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কাজটি আমি করছি না। আমার লাইসেন্সের নামে কাজ দেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করছে আইনজীবী কাজী মহতুল হোসাইন যত্ন।’ তবে সরকারি কাজ হওয়ায় তার এক্সক্যাভেটরটি চুক্তিতে দিয়েছেন বলে জানান আইনজীবী কাজী মহতুল হোসাইন যত্ন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চুক্তিতে এক্সক্যাভেটর দিয়ে কাজ করার কারণে নিয়মানুযায়ী আমি সাব কন্ট্রাক্টর। মূল ঠিকাদার সেন্টু।’
পাহাড় বা মাটি কাটার পর রাস্তাটির প্রাক্কলন তৈরি করা হবে বলে জানিয়েছেন বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জিয়াউর রহমান। জেলা পরিষদ ভবনে তার কক্ষে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকৌশল শাখা কোনো স্কিম তৈরি করে না। নির্দেশ অনুযায়ী স্কিম বাস্তবায়ন করে। লাঙ্গ্যেপাড়াবাসীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কানাপাড়া-লাঙ্গ্যেপাড়া রাস্তাটি নির্মাণ করা হচ্ছে।’
অন্যদিকে দাপ্তরিকভাবে সমন্বয় না করে সড়কের নামে অবৈধভাবে পাহাড় কাটা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তর বান্দরবানের সহকারী পরিচালক মো. ফখর উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পাহাড় কাটা স্থানটি পরিদর্শন করেছি। যারা পাহাড় কাটছেন তাদের বিরুদ্ধে এনফোর্সমেন্ট মামলা করা হবে।’










