খাদ্যশস্য ও শিল্প খাতের কাঁচামালের জন্য অনেকাংশেই ভারতনির্ভর ছিল বাংলাদেশ। গত কয়েক বছরে তা অনেকটাই কমেছিল। বর্তমানে এসব পণ্যের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়তে দেখা যাচ্ছে আবারো। এজন্য মূলত চলমান ইউক্রেন সংকটকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, কভিডের অভিঘাত সামলে উঠতে না উঠতেই বৈশ্বিক বাণিজ্য খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে চলমান যুদ্ধ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়েছে। কয়েকটি দেশ থেকে পণ্য আমদানি করা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাহাজ ও কনটেইনার সংকটের পাশাপাশি পরিবহন ভাড়াও বেড়েছে অনেক। এ আপৎকালে প্রতিবেশী ভারতের দিকেই বেশি ঝুঁকতে হচ্ছে বাংলাদেশী আমদানিকারকদের।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে ভারত থেকে ৮৮৯ কোটি ৩৫ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে তুলা, খাদ্যশস্য, মোটরযান ও যানবাহনের যন্ত্রাংশ, মূলধনি যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ, খনিজ পণ্য ও জ্বালানি, অর্গানিক কেমিক্যাল, চা-কফি-মসলা, ট্যানিং ও ডায়িং, পিগমেন্ট, রঙ, পুটি, কালি, লৌহ ও ইস্পাত, খাদ্য শিল্পের উপজাত ও পশুখাদ্য এবং চিনি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে তুলা, খাদ্যশস্য, লৌহ ও ইস্পাত এবং চিনির মতো পণ্যে দেশটির ওপর আমদানিনির্ভরতা ব্যাপকভাবে বাড়তে দেখা গেছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এ নির্ভরতা এখন আরো অনেকাংশেই বেড়েছে বলে জানিয়েছেন আমদানিকারকরা। তাদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে আমদানীকৃত গমের ৭০-৮০ শতাংশ, চিনির ৯০ ও চালের ৭০-৮০ শতাংশ আসছে ভারত থেকে। আমদানীকৃত পেঁয়াজেরও শতভাগই আসছে ভারত থেকে।

একসময় চাল ও গমের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য আমদানির বাজার পুরোটাই ছিল ভারতনির্ভর। একক একটি দেশের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে দেশে পণ্যগুলোর বাজার প্রায়ই অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য এনেছিল বাংলাদেশ। চাল আমদানির উৎস দেশের তালিকায় ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও মিয়ানমারের মতো দেশ। যুদ্ধকালীন প্রেক্ষাপটে পরিবহন ব্যয় কমাতে গিয়ে পণ্যটির আমদানিকারকরা এখন আবারো ভারতনির্ভর হয়ে পড়ছেন। বর্তমানে দেশে আমদানীকৃত চালের সিংহভাগই ভারত থেকে আসছে।

দেশে বার্ষিক গমের চাহিদা ৭৫ লাখ টন। পণ্যটি আমদানিতে বাংলাদেশের নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি ছিল রাশিয়া, ইউক্রেন ও কানাডার ওপর। এর মধ্যে ৪৫ শতাংশই আসত রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। যুদ্ধের কারণে দুটি দেশ থেকেই আমদানি এক প্রকার বন্ধ। কানাডায়ও সর্বশেষ মৌসুমে খরার কারণে পণ্যটির উৎপাদন ভালো হয়নি। এ অবস্থায় দেশে গমের শীর্ষ সরবরাহকারী দেশ হয়ে উঠেছে ভারত। চিনি আমদানিতে অনেক আগে থেকেই ভারতনির্ভর বাংলাদেশ। বর্তমান পরিস্থিতি সে নির্ভরতা আরো বাড়িয়েছে।

বস্ত্র ও পোশাক খাতের অপরিহার্য একটি কাঁচামাল তুলা। প্রতি বছরই পণ্যটি ৮০-৮৫ লাখ বেল আমদানি করতে হয় বাংলাদেশকে। সাত-আট বছর আগেও দেশে আমদানীকৃত তুলার প্রধান উৎসদেশ ছিল ভারত। পণ্যটির মোট আমদানির প্রায় অর্ধেকই আসত ভারত থেকে। গত কয়েক বছরে সে স্থান নিয়েছিল আফ্রিকার দেশগুলো। পণ্যটির আমদানিতে ভারতের অবদান নেমে এসেছিল ২০ শতাংশের কাছাকাছি। কভিডকাল থেকেই জাহাজ ও কনটেইনার সংকটে ভুগছে বৈশ্বিক বাণিজ্য খাত। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এ পরিস্থিতি আরো সঙ্গীন হয়ে উঠেছে। সংকট মোকাবেলায় প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আবারো তুলার জন্য ভারতের দিকেই ঝুঁকতে হয়েছে বাংলাদেশী আমদানিকারকদের। যুদ্ধ শুরুর আগে ২০২১ সালেই দেশে ভারত থেকে তুলা আমদানি বাড়তে দেখা যায়। গত বছর দেশে আমদানীকৃত তুলার ২৯ শতাংশ এসেছিল ভারত থেকে। চলতি বছর এতে দেশটির অংশ আরো বাড়তে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। একই পরিস্থিতি সুতার ক্ষেত্রেও। গত বছর দেশে আমদানি হওয়া সুতার ৮৪ শতাংশ এসেছে ভারত থেকে। এ পণ্যেও ভারতনির্ভরতা আরো বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বণিক বার্তাকে বলেন, ভারত থেকে আমদানি বৃদ্ধির কারণ ছিল আমরা তাড়াতাড়ি পণ্যটি সড়কপথে নিয়ে আসতে পারতাম। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখতে পাচ্ছি, ভারত নিজেই তুলা সংকটে ভুগছে। দেশটির অনেক স্পিনিং মিল বন্ধও হয়ে পড়েছে।

চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলে সংকট, শিপিং চার্জের কারণে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে ভারত থেকে পণ্য আমদানি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন ভোগ্য ও শিল্পপণ্য আমদানিকারকরা। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী স্থলবন্দরগুলো দিয়ে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে পণ্য আসছে বলে তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে দেশের শীর্ষস্থানীয় ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, বন্ধুরাষ্ট্র ও প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বড় সুবিধা হচ্ছে পরিবহন খরচ কমে যাওয়া। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে পণ্য জাহাজীকরণে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। তাছাড়া ভারতের ভোগ্যপণ্য দামে কিছুটা বেশি হলেও পরিবহন খরচের কারণে তুলনামূলক বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়েও কম দামে বিপণন করার সুযোগ থাকছে। এ কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে কম মূল্যে পণ্য সংগ্রহ ও বিপণনের জন্য ভারত আদর্শ আমদানি উৎসে পরিণত হয়েছে।

সম্প্রতি ভারত বেসরকারি পর্যায়ে গম রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এ অবস্থায় সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) দেশটি থেকে পণ্যটি আমদানি করতে চাইছে বাংলাদেশ। আলোচনা চলছে জ্বালানি তেল আমদানি নিয়েও।

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারত থেকে যে পণ্যই আমদানি করা হোক, সেটা বাংলাদেশের স্বার্থেই করা হয়। কারণ যা দরকার তা সস্তায় ও প্রয়োজনমাফিক পাওয়া যায়। এছাড়া বাণিজ্যিক আলোচনার ক্ষেত্রে এক ধরনের ভাষাগত সুবিধাও পাওয়া যায়। সমস্যা হলো, দেশটি থেকে মাঝেমধ্যে কোনো কোনো পণ্যের সরবরাহ একেবারেই বন্ধ করে দেয়া হয়। এসব পণ্যের অনিশ্চিত উৎস হয়ে উঠেছিল ভারত। এখন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন ভেঙে গিয়েছে। জাহাজের ভাড়া প্রায় ছয় গুণ বেড়েছে। তুলা আমদানি করতে গেলে দেখা গেল পণ্যের দামের চেয়ে পরিবহন ব্যয় বেশি। সেজন্য আমদানিকারকরা এখন বাধ্য হয়েই ভারতের দিকে ঝুঁকেছেন।

ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (আইবিসিসিআই) সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ বণিক বার্তাকে বলেন, দেশটি সম্প্রতি গম রফতানি বন্ধ করেছে। এরপর চিনিও বন্ধ করেছে। আবার তুলার ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটতে পারে। কিন্তু এ মুহূর্তে যেকোনো পণ্য আমদানির জন্য ভারত সবচেয়ে ভালো বিকল্প দেশ। প্রচলিত উৎসগুলো থেকে আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ভারত সবচেয়ে নিরাপদ। কিন্তু নির্ভরশীল হয়ে গেলে তখন ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে অন্যান্য উৎস থেকে আমদানির পরিকল্পনাও রাখতে হবে। রাশিয়া এখন ভারতকে জ্বালানি তেল দিচ্ছে। আমরাও হয়তো আনতে পারব। ভারতের বিকল্প অবশ্যই রাখতে হবে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ভারত-বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্ভাবনা অনেক বেড়ে গিয়েছে। ভারতের সঙ্গে স্থল-নৌ-রেল অনেকগুলো মাধ্যম আছে বাণিজ্যের। আর বর্তমান বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটে দুই দেশের বাণিজ্য সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে গিয়েছে। তবে আগের খারাপ অভিজ্ঞতাও মনে রাখতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত থেকে প্রতিযোগিতা সক্ষম মূল্যে পণ্য পাওয়া গেলে সেটিকে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে বাজার বৈচিত্র্যকরণের গুরুত্ব রয়েছে। একক দেশের ওপর নির্ভরতার কিছু বিপদও রয়েছে। গম বা তুলার মতো অপরিহার্য পণ্য রফতানি আকস্মিক বন্ধ হয়ে গেলে তা নতুন সংকটের জন্ম দেয়।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য বাড়াতে হবে। দেখা যাচ্ছে ভারতে রফতানিও বাড়ছে। বিদ্যমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নতুন অর্থনীতির আবির্ভাব হয়েছে। এ সুযোগ অবশ্যই আমাদের নিতে হবে। তবে বাজারে বিভিন্ন ধরনের বিষয়, যেমন রফতানি নিষেধাজ্ঞার মতো ইস্যু দাঁড়ায়, এ কারণে কোনো দেশের সঙ্গে যোগাযোগ একেবারে ছিন্ন করা ঠিক হবে না। ব্যবসায়ী যোগাযোগ অব্যাহত রেখে যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। অর্থনীতির সূত্র ধরেই বিদ্যমান পরিস্থিতির সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।

সারা বিশ্বেই এখন বাণিজ্যের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোয় মন্দা দেখা দিয়েছে। সেখানকার বাসিন্দাদের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। এ অবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কারে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের কাছাকাছি উৎসের কথাই আমাদের ভাবতে হবে, সেটা ভারত বা চীন যে দেশই হোক না কেন। এর অর্থ হলো আগামী দিনের পৃথিবীটা যেহেতু অনেক বেশি বিভাজিত হয়ে যাচ্ছে, অনেক বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রবেশ করছে, ফলে এখন স্বল্প সময়ের সরবরাহ ব্যবস্থার কথা ভাবতে হবে। আমদানি-রফতানি দুই ক্ষেত্রেই এ ভাবনা রাখতে হবে। আমাদের আমদানি মূলত হয় চীন ও ভারত থেকে, কিন্তু রফতানির অধিকাংশই হয় পশ্চিমা দেশে। এক্ষেত্রে অন্যান্য রফতানি বাজারের দিকে যেতে হবে। ভারত-চীনসহ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোয় রফতানি বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিতে হবে।