তীব্র শীতের মধ্যেও সেলের বড় বড় এসি হাই-স্পিডে চালিয়ে রাখত। শীতে শরীর জমে যেত। একটু কম্বল বা কাপড়ের জন্য মিনতি করতে গেলে পুলিশ উল্টো এসে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে যেত’—এভাবেই বন্দিজীবনে নিজের অসহায়ত্বের কথা বলছিলেন সৌদি আরবের জেলে ২৯ দিন কাটানো ২৭ বছর বয়সী তরুণ মহিবুল ইসলাম।

শুধু মহিবুল ইসলামই নন, অবৈধভাবে বিভিন্ন দেশে গিয়ে আটক বাংলাদেশীদের অনেকেরই জীবনের গল্পটা একই রকম। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ার আটক কেন্দ্রগুলোয় দৈনিক মাত্র দেড় লিটার পানি সরবরাহ, দুই-তিনদিনে একবার গোসল, খাবার ও চিকিৎসার তীব্র সংকটসহ চরম অবমাননার শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশীরা।

সৌদি আরব, ইরাক, মালয়েশিয়া, লিবিয়া ও ইতালিতে বন্দি অনিয়মিত বাংলাদেশী অভিবাসী শ্রমিকের ওপর চালানো গবেষণায় উঠে এসেছে প্রবাসীদের কারাজীবনের এমন চিত্র। আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘ডিসকভার সোশ্যাল সায়েন্স অ্যান্ড হেলথ’-এ প্রকাশিত ‘ভালনারেবিলিটি অব ইরেগুলার বাংলাদেশী মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কার্স ইন ফরেন ডিটেনশন সেটিংস’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বিদেশের মাটিতে ভাগ্য বদলের আশায় যাওয়া হাজারো বাংলাদেশী অনিয়মিত অভিবাসীর শেষ ঠিকানা হয় ডিটেনশন সেন্টার কিংবা কারাগার। ওয়ার্ক পারমিট না থাকা, স্পন্সর বা কফিলের অধীনে কাজ না করে অন্যত্র কর্মসংস্থান, কাগজপত্রের জটিলতা কিংবা অবৈধ অনুপ্রবেশের মতো কারণে তারা আটক হন। ইউরোপে অনিয়মিতভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশীর সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনিয়মিত অভিবাসনের এ প্রবণতা শুধু বাংলাদেশীদের কারাবন্দি হওয়ার ঝুঁকিই বাড়াচ্ছে না, আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করছে। একই সঙ্গে বৈধ ভিসা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশীরাও অনেক ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই-বাছাই, দীর্ঘসূত্রতা, অতিরিক্ত কাগজপত্রের চাহিদা এবং ভিসা প্রক্রিয়ায় নানা বিড়ম্বনার মুখে পড়ছেন।

গত বছরের এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি হিসাবে, বিদেশের কারাগারে বন্দি আছেন ১১ হাজার ৬২২ বাংলাদেশী। অবৈধ অভিবাসন, মাদক ও মারামারির মতো আইন ভঙ্গ করার অভিযোগে তারা কারাগারে। জানা গেছে, বিশ্বের ১৯টি দেশের কারাগারে বাংলাদেশীরা বন্দি আছেন। এর মধ্যে সৌদি আরবেই তাদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, প্রায় আট হাজার। মালয়েশিয়ায় আটক ১ হাজার ২৬ জন। এছাড়া দুবাইয়ে ৮৯৬ ও ওমানে ৪৪৪ জন কারাবাস করছেন।

গবেষণায় উঠে এসেছে বন্দিদের ওপর চলা তীব্র খাদ্য সংকট ও শারীরিক নির্যাতন। মালয়েশিয়ার কারাগারে খাবারের কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকায় তীব্র অপুষ্টিতে অভিবাসীর ওজন সাত কেজি পর্যন্ত কমে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ার কারাগারে দেয়া অপর্যাপ্ত খাবার আর নির্যাতন ছিল অভিবাসীদের প্রতিদিনকার বাস্তবতা।

সৌদি আরবের ডিটেনশন সেন্টারে দুই মাস বন্দি থাকা প্রবাসফেরত মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পুলিশ অফিসাররা আমাদের মানুষ মনে করত না। বিড়ালের খাবারের চেয়েও কম খাবার দিত। ২৪ ঘণ্টা ক্ষুধায় কাটাতাম। এটুকু খাবার খেয়ে কীভাবে দুই মাস জেলে থাকলাম সে কথা ভাবতেই গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়।’

মালয়েশিয়ার কারাগারে খাবারের কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি ছিল না। দেশটির কারাগার থেকে ফেরত আসা ভুক্তভোগী রাহাত হোসেন বলেন, ‘খাবারের কোনো ঠিকঠিকানা ছিল না। কোনো দিন সকালের নাশতাই দিত না, আবার কোনো দিন মাঝরাতে এনে খাবার দিত। খাবার বলতে শুধু এক দলা সেদ্ধ ভাত আর এক টুকরো গন্ধযুক্ত বাসি মাছ। মসলা বা লবণের কোনো বালাই ছিল না। ক্ষুধা মেটানোর জন্য বাধ্য হয়ে গিলে খেতাম।’

অন্যদিকে ইরাক ও লিবিয়ার কারাগারে মারধর ও মানসিক নির্যাতন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। ইরাকে জেল খাটা ৪২ বছর বয়সী মো. সোহরাব মিয়া (ছদ্মনাম) বলেন, ‘একদিন ফজরের নামাজ শেষে কোনো কারণ ছাড়াই একজন পুলিশ মোটা লাঠি দিয়ে সবাইকে ১০ মিনিট ধরে পেটায়। পরে জানা যায়, ওই পুলিশটি মাতাল ছিল।’

লিবিয়ার ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে বেঁচে ফেরা প্রবাসী সৈকত (ছদ্মনাম) তার অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের মানুষই মনে করত না, গালিগালাজ করত। সামান্য একটু নড়াচড়া বা কথা বলার আওয়াজ পেলেই চাবুক আর লাঠি দিয়ে সমানে মার শুরু করত। পিঠে চাবুকের সেই দাগগুলো এখনো মাঝে মাঝে রাতে ব্যথায় টনটন করে ওঠে।’

ভুক্তভোগীরা জানান, কারাগারগুলোর ভেতরের পরিবেশও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ। সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় অনিয়মিত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষকে একই কক্ষে গাদাগাদি করে ঠেলে দেয়া হতো, যেখানে ঘুমানোর জায়গা তো ছিলই না, উল্টো টয়লেটের দুর্গন্ধ ও দূষণে পুরো সেল ভরে থাকত। কারাগারে প্রবেশের প্রথম দিনেই চুল কামিয়ে দিয়ে শুধু একটি হাফপ্যান্ট পরতে বাধ্য করা হতো। শীতের দিনে কোনো গরম কাপড় দেয়া হতো না, উল্টো কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে হাই-স্পিডে এসি চালিয়ে রাখত এবং প্রতিবাদ করলে জুটত মারধর। তীব্র শীত থেকে বাঁচতে প্রবাসীরা পলিথিন ব্যাগ দিয়ে শরীর মুড়িয়ে রাখতেন এবং বালিশ না থাকায় প্লাস্টিকের পানির বোতল মাথার নিচে দিয়ে রাত পার করতেন।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অপুষ্টি ও পানির তীব্র সংকটে কারাবন্দিরা প্রায়ই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। লিবিয়া, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবে চিকিৎসার কোনো সুষ্ঠু ব্যবস্থা ছিল না। অন্তত ১১ জন ভুক্তভোগী জানান, কারাগারে তাদের ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয়নি। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের কারাগারগুলোয় দৈনিক মাত্র দেড় লিটার পানি সরবরাহ করা হতো, যা জাতিসংঘের ২০১০ সালের মৌলিক পানির অধিকারসংক্রান্ত রেজল্যুশনের পরিপন্থী। ফলে দুই-তিনদিনে একবার গোসল করার সুযোগ মেলায় বন্দিদের শরীরে ঘা ও ফোসকা তৈরি হতো।

উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে কিংবা জমি বিক্রি করে বিদেশে যাওয়া এসব মানুষ আটক হওয়ার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবের আটক কেন্দ্রে বন্দিরা যে মাত্রার খাদ্য সংকট, নির্যাতন ও মৌলিক সুবিধার অভাবের মুখোমুখি হন, সে তুলনায় ইতালির আটক কেন্দ্রগুলোয় অমানবিক পরিস্থিতির মাত্রা তুলনামূলক কম ছিল। ইরাক ও লিবিয়ায় নির্যাতনের অভিযোগ থাকলেও সামগ্রিক দিক থেকে পরিস্থিতি মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবের মতো এতটা নাজুক ছিল না।

জেলে বন্দি প্রবাসীদের মানবিক বিপর্যয় রোধে দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক চুক্তি সম্পাদন করা জরুরি বলে মনে করেন অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা তাসনিম সিদ্দিকী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে আইনি ও কনসুলার সহায়তা আরো জোরদার করতে হবে। প্রবাসীদের ওপর পৈশাচিক আচরণ মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অনিয়মিত অভিবাসনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে সচেতনতা তৈরি, ফেরত আসা কর্মীদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে ডিটেনশন সেন্টারগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণে আরো সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।’

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক মো. আসাদুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদেশে বাংলাদেশের লেবার উইংয়ের মাধ্যমে কারাবন্দি কর্মীদের বিষয়ে খোঁজখবর রাখা হয় এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনজীবী বা ল ফার্মের মাধ্যমে আইনি সহায়তাও দেয়া হয়। তবে এ সহায়তা মূলত বিএমইটিতে নিবন্ধিত কর্মীদের জন্য। অনিয়মিতভাবে বিদেশে যাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও বিশেষ পরিস্থিতিতে তাদেরও সহযোগিতা করা হয়। এছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থাও বিভিন্নভাবে সহায়তা দিয়ে থাকে।