বাজারে মাল্টা ও খেজুরসহ আমদানিনির্ভর ফলের সরবরাহ বাড়িয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমদানিকারকদের দ্রুত ঋণপত্র (এলসি) খুলে আমদানি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। একই সঙ্গে খেজুর আমদানিতে শুল্ক ও কর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত চলতি সপ্তাহেই জানানো হবে বলে নিশ্চিত করেছেন তিনি।
শনিবার (৩ অক্টোবর) সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ফলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত ও বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী এসব কথা জানান।
সভায় মাল্টার বর্তমান বাজারদর নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। আমদানি মূল্য, শুল্ক, কর ও অন্যান্য খরচ বিবেচনার পরও খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মাল্টার দাম কীভাবে ৫২০ টাকায় পৌঁছে যায়, ব্যবসায়ীদের কাছে তার কারণ জানতে চান তিনি।
অস্বাভাবিক দামে মাল্টা বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট জানান, বাজারে অসংগত মূল্যবৃদ্ধির কোনো সুযোগ দেয়া হবে না।
সভায় ব্যবসায়ীরা বলেন, মাল্টার বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ সরবরাহের মারাত্মক ঘাটতি। তাদের তথ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো সপ্তাহে দেশে মাত্র ১২ থেকে ২৯ কনটেইনার মাল্টা এসেছে। অথচ স্বাভাবিক চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন প্রায় ১৫ কনটেইনার মাল্টার প্রয়োজন হয়।
উচ্চ শুল্ক, পরিবহন খরচ, জাহাজ ও বন্দরের জটিলতা এবং আগের চালানে আর্থিক ক্ষতির কারণে অনেক ব্যবসায়ী মাল্টা আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন বলে জানান আমদানিকারকেরা। এটি পচনশীল পণ্য হওয়ায় পরিবহন ও সংরক্ষণ পর্যায়ে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি রয়েছে বলেও তারা উল্লেখ করেন।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য শুনে মাল্টার শুল্ক সংক্রান্ত বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত ঋণপত্র খুলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর নির্দেশনা দেন।
আসন্ন চাহিদা বিবেচনায় ব্যবসায়ীদের এখন থেকেই খেজুর আমদানির প্রস্তুতি নেয়ার তাগিদ দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, খেজুরের শুল্কের বিষয়ে চলতি সপ্তাহেই সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
খেজুরের মূল্য নির্ধারণের দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনেও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আমদানিকারকদের সঙ্গে বিশেষ বৈঠকে বসবে।
বৈঠকে দেশে আসা বিভিন্ন মান ও গ্রেডের খেজুরের আন্তর্জাতিক উৎসমূল্য যাচাই করে একটি যৌক্তিক নির্দেশক মূল্য নির্ধারণের চেষ্টা করা হবে। পরে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে পাঠানো হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, শুল্কায়নের ব্যবস্থা এমন হতে হবে যাতে ব্যবসায়ীরা অসংগত মূল্য নির্ধারণের শিকার না হন। একই সঙ্গে পণ্যের দাম কম দেখিয়ে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার সুযোগও রাখা যাবে না।
সরকার ও ব্যবসায়ী উভয় পক্ষকে স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, কোনো পক্ষ কারসাজির চেষ্টা করলে পুরো ব্যবস্থার ওপরই আস্থার সংকট তৈরি হয়।
সভায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রতিনিধি বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন মানের খেজুরের প্রকৃত ক্রয়মূল্য আলাদা হলেও শুল্কায়নের ক্ষেত্রে তা সবসময় সঠিকভাবে দেখানো হয় না। এ কারণে বাস্তবসম্মত দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারদর ও উৎসমূল্য বিবেচনায় নেয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।
খেজুর আমদানিকারকরা জানান, আন্তর্জাতিক পরিবহন ও বন্দরের জটিলতার কারণে খেজুর বাংলাদেশে পৌঁছাতে আগের চেয়ে বেশি সময় লাগছে। তাই সময়মতো পর্যাপ্ত খেজুর আমদানি নিশ্চিত করতে শুল্ক সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত দ্রুত নেয়া প্রয়োজন।
সভায় ব্যবসায়ীরা বিকল্প উৎস থেকে মাল্টাসহ বিভিন্ন বিদেশি ফলের আমদানি বাড়ানোর নিশ্চয়তা দেন। সরকারের পক্ষ থেকেও শুল্ক, কর ও আমদানি প্রক্রিয়ার যৌক্তিক সমস্যাগুলো পর্যালোচনার আশ্বাস দেয়া হয়।
মতবিনিময় সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির উদ দৌলা, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রতিনিধি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।










