ট্রেনের ভেতরে-ছাদে মানুষের গাদাগাদি। শিডিউল বিপর্যয়। সড়কে মাইলের পর মাইল যানজট। যাত্রীবাহী যানের সংকট। ঘাটে ঘাটে অনিশ্চিত অপেক্ষা। লঞ্চ-স্টিমারের ডেক-বারান্দা-ছাদ ভর্তি মানুষ। বাংলাদেশে ‘ঈদযাত্রা’র সঙ্গে সমার্থক হয়ে উঠেছিল এসব বিষয়। গত ঈদুল ফিতরে ছুটি আগেভাগে শুরু হওয়ায় ‘ঈদযাত্রা’ থেকে ভোগান্তি শব্দটি বলতে গেলে হারিয়েই গিয়েছিল। রোজার ঈদ পার করে কোরবানির ঈদ আসতে না আসতেই আবার স্বরূপে ফিরেছে ‘ঈদযাত্রা’। রেলপথে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ শিডিউল বিপর্যয়। যাত্রীর চাপে ভেঙেছে ট্রেনের আসন আর চাকার স্প্রিং। যানজটে লণ্ডভণ্ড বাসের সূচি। একেকটি বাস রাজধানী ছাড়ছে ১০-১২ ঘণ্টা দেরিতে। যানজটে ৬-৭ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে ১৫-২০ ঘণ্টা। সদরঘাট থেকে ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী নিয়ে ছাড়ছে লঞ্চ। শেষ সময়ে এসে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ঘরমুখী মানুষের ভোগান্তি।
ট্রেনে শিডিউল বিপর্যয়: পঞ্চগড়গামী দ্রুতযান এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়ার নির্ধারিত সময় রাত ৮টায়। গতকাল ঠিক রাত ৮টায় ট্রেনটির অবস্থান জানতে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে দেখা যায়, ট্রেনটি ৮ ঘণ্টা ২৮ মিনিট বিলম্বে চলাচল করছে। অর্থাৎ রাত ৩টার আগে ট্রেনটির কমলাপুর স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এ প্রতিবেদন লেখার সময় দ্রুতযান এক্সপ্রেসের অবস্থান ছিল দিনাজপুরের ফুলবাড়িতে। সেখান থেকে ঢাকায় আসার পর পঞ্চগড়ের উদ্দেশে রওনা হবে।
পঞ্চগড়গামী আরেক ট্রেন পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ঢাকার কমলাপুর থেকে ছেড়ে যাওয়ার নির্ধারিত সময় রাত ১০টা ৪৫ মিনিট। ৪ ঘণ্টা ৯ মিনিট বিলম্বে ট্রেনটি পঞ্চগড় থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছে বিকাল ৪টা ৪৫ মিনিটে। এ প্রতিবেদন লেখার সময় ট্রেনটি অবস্থান করছিল দিনাজপুর রেলওয়ে স্টেশনে। ট্রেনটি যে শিডিউলে চলছে, তাতে ভোর ৪টার আগে কমলাপুর থেকে পঞ্চগড়ের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
গতকাল ঢাকার কমলাপুর ছেড়ে যাওয়া প্রতিটি ট্রেনই ছেড়েছে নির্ধারিত সময়ের এক থেকে কমপক্ষে পাঁচ ঘণ্টা পরে। এর মধ্যে পঞ্চগড়গামী একতা এক্সপ্রেস, রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস ও সিল্কসিটি এক্সপ্রেস, রাজশাহী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বনলতা এক্সপ্রেস, খুলনার সুন্দরবন এক্সপ্রেস, চিলাহাটির নীলসাগর এক্সপ্রেস, রংপুরগামী রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনগুলো নির্ধারিত সময়ের তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা পর ছেড়েছে।
একদিকে শিডিউল বিপর্যয়, আরেকদিকে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে নাজেহাল ঘরমুখী মানুষ। গতকাল প্রতিটি ট্রেনই ছাদবোঝাই যাত্রী নিয়ে কমলাপুর ছেড়েছে। যাত্রীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন রেলের কর্মীরা। যাত্রীর এ চাপ সামাল দেয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন কমলাপুর রেলস্টেশনের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মাসুদ সারওয়ার। তিনি বলেন, গতকাল থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ৬০-৭০ হাজার মানুষ ট্রেনে রওনা করেছে। এত বেশি যাত্রীর চাপ এবং মানুষের যে স্রোত, সেটা ঠেকানো যাচ্ছে না। আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জিআরপি পুলিশ সবাই যাত্রী চাপের কাছে ব্যর্থ হয়েছে। ট্রেনের ছাদ থেকে যাত্রী নামানো যাচ্ছে না।
এদিকে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে বৃহস্পতিবারের পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেনটির পাঁচটি কোচ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গতকাল ভোরে ট্রেনটি বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব স্টেশনে পৌঁছালে কয়েকটি কোচের চাকার স্প্রিং ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি নজরে আসে। স্প্রিংগুলো মেরামত করতে সময় লাগে প্রায় ৫ ঘণ্টা। অন্যদিকে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একাধিক ট্রেনের সিট ভেঙে গেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সড়কে যানজট, পরিবহন সংকট: যানবাহনের চাপ বেড়ে যাওয়ায় ভয়াবহ যানজট তৈরি হয়েছে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে। গতকাল রাত সাড়ে ৮টার দিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব প্রান্ত থেকে করোটিয়া পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজট বিস্তৃত হয়েছে। যানজটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে ঘরমুখী মানুষ। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট না থাকলেও গাড়ি চলছে থেমে থেমে। দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাসড়কের ধলেশ্বরী টোল প্লাজাতে দেখা দিয়েছে কয়েক কিলোমিটার যানজট।
সড়কপথে যানজটের পাশাপাশি ঘরমুখী মানুষকে বিপদে ফেলেছে বাসের ভয়াবহ শিডিউল বিপর্যয়। কোনো কোনো কোম্পানির বাস ছাড়ছে নির্ধারিত সময়ের ১০-১২ ঘণ্টা পর। বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানির কাউন্টারের কর্মীরা জানিয়েছেন, যানজটের কারণে ট্রিপ শেষ করে নির্ধারিত সময়ে টার্মিনালে বাস ফিরতে না পারায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ করে তুলেছে পরিবহন সংকট। গতকাল কল্যাণপুর, গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদসহ রাজধানীর আশপাশের কাউন্টারগুলোতে প্রচুর যাত্রীর চাপ দেখা গেছে। কিন্তু ছিল না পর্যাপ্ত বাস। শেষ সময়ে আসা যাত্রীদের বেশির ভাগই অগ্রিম টিকিট কেনেননি। যে যেভাবে পারছেন বাড়ি ফেরার চেষ্টা করছেন। কেউ কোরবানির পশুবাহী ফিরতি যানবাহনে, কেউ কাভার্ড ভ্যানে, কেউ মুরগির বাচ্চা পরিবহনের ভ্যানে গন্তব্যে যাচ্ছেন। এসব পরিবহনে মানবেতরভাবে যাতায়াত করলেও যাত্রীদের ভাড়া গুনতে হচ্ছে যাত্রীবাহী বাসের মতোই। আবার পরিবহন না পেয়ে অনেককেই হেঁটেই গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে।
ঈদের আগে গণপরিবহন সংকট দেখা দিয়েছে রাজধানীর অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে। রাজধানীতে চলাচল করা বেশির ভাগ বাস চুক্তিতে বিভিন্ন দূরপাল্লার গন্তব্যে চলে যাওয়ায় এ পরিবহন সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। পরিবহন সংকটের কারণে বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতে দিনভর দুর্ভোগে পড়ে মানুষ। গুনতে হয় বাড়তি ভাড়া। আবার পরিবহন না পেয়ে অনেকে হেঁটেই বিভিন্ন গন্তব্যে যান।
পুরনো চেহারায় সদরঘাট: গত ২৬ জুন পদ্মা সেতুতে যান চলাচল শুরুর পর থেকেই যাত্রী সংকটে পড়ে সদরঘাট থেকে দক্ষিণের বিভিন্ন রুটে চলাচল করা লঞ্চগুলো। প্রতি ঈদের সময় সদরঘাটে মানুষের উপচে পড়া ভিড় থাকলেও গতকালের আগ পর্যন্ত চিত্রটি ছিল একেবারে উল্টো। তবে গতকাল সকাল থেকেই ঘাটে বাড়তে শুরু করে যাত্রীর চাপ। বিকালের পর থেকে জনারণ্যে পরিণত হয় ঢাকার সদরঘাট। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) তথ্য বলছে, বৃহস্পতিবার সারা দিন ১১৬টি লঞ্চ সদরঘাট ছেড়ে যায়। আর শুক্রবার ছেড়ে যায় ১৩৩টি লঞ্চ। গতকাল সদরঘাট ছেড়ে যাওয়া প্রতিটি লঞ্চে মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। বেশির ভাগ লঞ্চই ছেড়ে গেছে ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী নিয়ে।
পটুয়াখালীগামী এমভি পূবালী-৫, এমভি সুন্দরবন, এমভি জামাল-৫, এমভি কুয়াকাটা-১, বরগুনাগামী এমভি শাহরুখ-২, চরফ্যাশনগামী এমভি ফারহান-৬, ফারহান-৩, হাতিয়াগামী এমভি সাব্বির-১ লঞ্চের ছাদে পরিবহন করতে দেখা গেছে। দুপুরের পর থেকে পটুয়াখালীগামী লঞ্চের সংকট দেখা যায়।










