চট্টগ্রামে একাধিক মেগা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। দক্ষিণ চট্টগ্রাম ঘিরে বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে। আগামী অক্টোবরে দুটি মেগা প্রকল্প উদ্বোধনের ঘোষণা দেয়া হলেও এখনো নিশ্চিত হয়নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রকল্প এলাকায় থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের কথা থাকলেও সেগুলো এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে ফাঁড়ির পাশাপাশি দুটি থানা নির্মাণের একাধিক প্রস্তাব দেয়া হলেও প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এতে সায় দেয়নি। ফলে প্রকল্পগুলো উদ্বোধনের পর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় বেগ পেতে হবে বলে দাবি পুলিশের।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২৮ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণের ঘোষণা এলেও ফাঁড়ির নির্মাণকাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। একই অবস্থা চট্টগ্রামের দোহাজারি থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০৩ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের। প্রকল্পটির একটি বড় অংশ পাহাড় ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে থাকায় রাত্রিকালীন কিংবা যেকোনো সময় যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলের সময় নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কা করছে পুলিশ প্রশাসন। রেলপথ প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুটি থানা ও পাঁচটি ফাঁড়ি নির্মাণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল পুলিশের পক্ষ থেকে। প্রকল্প পরিচালককে দেয়া ওই প্রস্তাবে দোহাজারী ও কক্সবাজারে থানা এবং পটিয়া, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, রামু ও চকরিয়ায় একটি করে ফাঁড়ি নির্মাণের প্রস্তাব ছিল। পাশাপাশি কক্সবাজারে রেলওয়ে পুলিশের জন্য একটি সার্কেল অফিসেরও প্রস্তাব দেয়া হয়। কিন্তু প্রকল্প এলাকায় থানা কিংবা পুলিশ ফাঁড়ির জন্য কোনো প্রস্তাব ও ভূমি বরাদ্দ না রাখায় উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা প্রকল্প দুটি নিয়ে চিন্তিত পুলিশসহ নিরাপত্তা সংস্থাগুলো।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম রেলওয়ে পুলিশ সুপার হাসান চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় আমরা এরই মধ্যে দুটি থানা ও পাঁচটি ফাঁড়ি নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছি। অথচ প্রকল্পে এসব স্থাপনা নির্মাণে কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। শেষ পর্যায়ে এসে আমরা প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যৌথভাবে কক্সবাজার পর্যন্ত ট্রেন চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৎপরতা শুরু করেছি। আপাতত রেলওয়ে পুলিশ সদস্যদের আবাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা প্রকল্পটির সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। আশা করি প্রকল্পটির সার্বিক নিরাপত্তা দিতে রেলওয়ে পুলিশ দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারবে।’
অন্যদিকে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিতব্য বহুলেন সড়ক টানেলের উভয় প্রান্তে দুটি থানার পাশাপাশি ফাঁড়ি ও ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণের একাধিক প্রস্তাব রাখা হলেও সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা থাকায় দুইতলার বেশি স্থাপনা নির্মাণ করা যাচ্ছে না। টানেলের উভয়মুখে পর্যাপ্ত ভূমি না রাখায় আপাতত থানা নির্মাণের সম্ভাবনা নেই। আগামী ২৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত থেকে টানেল উদ্বোধনের কথা থাকলেও এখনো ফাঁড়ি কিংবা ফায়ার স্টেশন নির্মাণকাজ শেষ করতে পারেনি প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্থায়ী অবস্থান ছাড়াই টানেলে যানবাহন চলাচল শুরু হতে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে টানেল উদ্বোধনসংক্রান্ত মতবিনিময় সভায় পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি নূরে আলম মিনা বলেন, ‘মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে এসে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্থায়ীভাবে বৃহৎ অবকাঠামোর নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকতে হয়। তাছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নের পর্যায়েও পুলিশের কাছ থেকে ক্যাম্প স্থাপনের চাহিদাপত্র আসে। কিন্তু স্বল্প জনবল দিয়ে নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব হয় না। প্রকল্পের শুরুতে সমীক্ষা কিংবা ডিপিপিতে পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা হলে শেষ দিকে এসে জটিলতা এড়ানো সম্ভব।’
বঙ্গবন্ধু টানেল ও দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ ছাড়াও মিরসরাইয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চল, দক্ষিণ চট্টগ্রামে চায়না ইপিজেড, কোরিয়ান ইপিজেড, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র-বন্দর, দক্ষিণ চট্টগ্রামের একাধিক মেগা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ প্রকল্প চলমান। এসব বৃহৎ স্থাপনা নির্মাণকাজ চলমান থাকলেও নিরাপত্তা ইস্যুজনিত সংকটগুলো এখনো নিরসন করা হয়নি। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে এসে নিরাপত্তাজনিত সংকট এড়াতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বেগ পেতে হবে বলে আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সাবেক কমিশনার ও শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) মো. মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেকোনো বড় প্রকল্পের শুরুতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পৃক্ততা জরুরি। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা দেশী-বিদেশী অর্থায়নে অবকাঠামো নির্মাণ করলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কিংবা সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে মাঠ প্রশাসনের সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞতা থাকে। চট্টগ্রামের চলমান ও শেষের পথে থাকা প্রকল্পগুলোয় শুরু থেকে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে সম্পৃক্ত রাখলে সৃষ্ট জটিলতা অনেকাংশে কমে যেত।’










