তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলপিজি) দাম গত রোববার নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কিন্তু গত দুদিন ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কোথাও বেঁধে দেয়া দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হতে দেখা যায়নি। এলাকা ও কোম্পানিভেদে বেসরকারি খাতের ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হতে দেখা গেছে দেড় হাজার থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত দামে। অথচ এটি ১ হাজার ৪৩৯ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। খুচরা দোকানিরা বলছেন, দাম বেড়ে যাওয়ায় গ্রাহক পর্যায়ে চাহিদা কমে গেছে। তাই লাভ তুলতে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তবে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হলে ভোক্তাদের আইনি ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে এলপিজি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমে যাওয়ায় টানা তৃতীয় মাসে বাড়ানো হয় এলপিজির দাম। গত রোববার প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১১৬ দশমিক ৮৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৯ দশমিক ৯৪ টাকা করা হয়েছে। ফলে একটি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম পড়ছে ১ হাজার ৪৩৯ টাকা, যা আগে ছিল ১ হাজার ৩৯১ টাকা। চলতি বাজারে পাঁচ কেজি থেকে শুরু করে ৪৫ কেজি পর্যন্ত সব সিলিন্ডারের দামই বেড়েছে।

গতকাল ঢাকার মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, আজিমপুর, কারওয়ান বাজার, মানিকনগর, যাত্রাবাড়ী, পোস্তগোলা, জুরাইন, হাসনাবাদ ও ঢাকার বাইরের কয়েকটি জেলায় এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রির খুচরা দোকানে খোঁজ নেয়া হয়। দোকানিরা জানান, বসুন্ধরা, ওমেরা, টোটাল, লাফস, ইউনিক, বেক্সিমকো, বিএম, ফ্রেশ ও সেনাকল্যাণ গ্যাসের ১২ কেজি সিলিন্ডার তারা কিনেছেন ১ হাজার ৩৮০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায়। ফলে কোনোভাবেই তাদের পক্ষে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।

বিইআরসির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বেসরকারি এলপিজির ভোক্তা পর্যায়ে মূসকসহ সাড়ে পাঁচ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৬৬০ টাকা, ১২ কেজির ১ হাজার ৪৩৯, সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৪৯৯, ১৫ কেজির ১ হাজার ৭৯৯, ১৬ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৯১৯, ১৮ কেজির ২ হাজার ১৫৯, ২০ কেজির ২ হাজার ৩৯৯, ২২ কেজির ২ হাজার ৬৩৯, ২৫ কেজির ২ হাজার ৯৯৮, ৩০ কেজির ৩ হাজার ৫৯৮, ৩৩ কেজির ৩ হাজার ৯৫৮, ৩৫ কেজির ৪ হাজার ১৯৭ ও ৪৫ কেজির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ৩৯৭ টাকা।

কারওয়ান বাজারের খুচরা বিক্রেতা আকবর হোসেন জানান, বাজারে গ্যাসের সংকট রয়েছে। চাহিদার চেয়ে সিলিন্ডারের জোগান কম। প্রতিদিন চাহিদা থাকে ১০ থেকে ১৫টি সিলিন্ডারের। কিন্তু ডিলারদের কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে ১০টি করে। একে তো সিলিন্ডারের জোগান কম, তার ওপর বিক্রি কমে গেছে। তাই লাভ তুলতে বেশি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে।

একই কথা জানালেন জুরাইনের খুচরা বিক্রেতা রাসেল শিকদার। তিনি বলেন, যেহেতু বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, তাই বিক্রিও করতে হচ্ছে বেশি দামে।

এদিকে রোজার প্রথম দিন থেকেই রাজধানীজুড়ে চলছে গ্যাসের তীব্র সংকট। লাইনে ঠিকমতো গ্যাস না পাওয়ায় এলপিজি ব্যবহার করতে শুরু করেছেন অনেক গ্রাহক। ফলে তাদেরও গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ।

শনির আখড়ার মাতুয়াইল এলাকার বাসিন্দা ফরিদ আহম্মেদ জানালেন, সম্প্রতি তিনি এলপিজি ব্যবহার শুরু করেছেন। তিনি বলেন, লাইনে ঠিকমতো গ্যাস পাওয়া যায় না। কিন্তু এলপিজি ব্যবহার করেও শান্তি পাচ্ছি না। সরকার নির্ধারিত দামে দোকানিরা গ্যাস বিক্রি করছে না। ১২ কেজি সিলিন্ডার কিনেছি ১ হাজার ৬৫০ টাকায়।

একই দৃশ্য দেখা গেছে মানিকনগরও। ওই এলাকার কোনো কোনো দোকানে ১২ কেজি এলপি গ্যাস ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হতে দেখা গেছে। 

অন্যদিকে দাম বাড়ার কারণে কমে গেছে ক্রেতার সংখ্যাও। হাসনাবাদের গ্যাস বিক্রেতা আলম হোসেন বলেন, আগের চেয়ে গ্যাসের চাহিদা কমে গেছে। দাম বাড়ার পর কাঙ্ক্ষিত গ্রাহক পাচ্ছি না। আগে রোজায় অন্তত ৩০০ পিস সিলিন্ডার বিক্রি করতাম। কিন্তু এবার চারদিনে মাত্র ১০টি সিলিন্ডার বিক্রি করেছি। হাসনাবাদের অন্তত ১০টি দোকান ঘুরে দেখা গেছে নির্ধারিত দু-চারটি কোম্পানি ছাড়া অন্যান্য কোম্পানির এলপিজি নির্ধারিত মূল্যেই বিক্রি হচ্ছে।

রাজধানীর বাইরে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, নোয়াখালীর এলপিজির গ্রাহকরা জানিয়েছেন, বাড়তি দামে সিলিন্ডার কেনার কথা। বণিক বার্তার নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রাম প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, এসব জেলায় নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে।

চাঁদপুরের বাসিন্দা ইমরান শাকির ইমরু বলেন, বসুন্ধরা, টোটাল গ্যাস ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৫০০ এবং ১৫ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নোয়াখালীর বাসিন্দা হেলাল আহমেদও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকায় সিলিন্ডার কেনার কথা জানিয়েছেন।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সদস্য এবং বসুন্ধরা এলপি গ্যাস লিমিটেডের হেড অব সেলস জাকারিয়া জালাল বণিক বার্তাকে বলেন, বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ আমরাও শুনছি। এক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ হলো, বেশি দাম চাইলে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরে মামলা করা। কোনো ডিলার যদি বেশি দাম চায়, আমাদের জানালে আমরা তার ডিলারশিপ বাতিল করে দিতে পারি। কিন্তু খুচরা পর্যায়ে বিক্রেতারা বেশি দাম চাইলে তার দেখভাল আমাদের পক্ষে করা সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে ভোক্তাকেই আইনের আশ্রয় নিতে হবে। 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য (গ্যাস) মো. মকবুল ই-ইলাহি চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, প্রতি মাসে এলপি গ্যাসের মূল্য সমন্বয় করছে কমিশন। বাজারেও সেই দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে কেউ যদি কমিশন নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে। জেলা পর্যায়েও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, যাতে করে মাঠ পর্যায়ে গ্রাহককে পণ্যটি কিনতে বেশি দাম দিতে না হয়।