দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে বেহাল অবস্থায় রয়েছে লালমনিরহাট-বুড়িমারী স্থলবন্দর জাতীয় মহাসড়কটি। ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে মহাসড়কটি ব্যবহার করতে চান না চালকরা। তাই বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকায় ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ভাড়া করে পণ্য পরিবহন করতে হয় ব্যবসায়ীদের। এর প্রভাব পড়ছে পণ্যের ওপর। পরিবহনে বাড়তি অর্থ খরচ হওয়ায় পণ্যও বেশি দামে বিক্রি করতে হয় ব্যবসায়ীদের। তাছাড়া রাস্তাজুড়ে থাকা খানাখন্দে পণ্যবাহী যানবাহন উল্টে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। এ অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কটি দ্রুত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন পণ্যবাহী ট্রাকের চালক ও ব্যবসায়ীরা।

লালমনিরহাট সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়বাড়ী থেকে পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী স্থলবন্দর পর্যন্ত জাতীয় মহাসড়কটি চার ভাগে সংস্কার করা হয়। এছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিপত্র অনুযায়ী সংস্কারের এক বছরের মধ্যে যেসব খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছিল, তা মেরামত করা হয়। এরপর থেকে সড়কে ইট বিছিয়ে সাময়িক সংস্কার কাজ করে লালমনিরহাট সওজ বিভাগ। তার পরও সড়কে বেহাল অবস্থা কাটছেই না।

চালকরা বলছেন, ভাঙাচোরা সড়ক দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে প্রায়ই যানবাহনের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যায়। মেরামতে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ হয়, যা পণ্য পরিবহন করে মেটানো সম্ভব হয় না। তাই বাধ্য হয়েই এ মহাসড়ক দিয়ে পণ্য পরিবহন বন্ধ রেখেছেন তারা। তবে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে কয়েকজন চালক এখনো পণ্য পরিবহন অব্যাহত রেখেছেন।

ট্রাকমালিকরা জানান, ১০ চাকার একটি ট্রাক ৩৫-৪০ টন পাথর নিয়ে ঢাকায় যেতে ভাড়া আদায় করা হয় ৫৪-৫৬ হাজার টাকা। একটি ট্রিপে খরচ বাদ দিয়ে মালিক ৫-৭ হাজার টাকা পায়। কিন্তু বেহাল রাস্তার কারণে যদি কোনো যান্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে এ টাকাও ঘরে তোলা যায় না। তাই বাধ্য হয়ে এ স্থলবন্দর থেকে পণ্য পরিবহন বন্ধ রাখা হয়েছে। যে দুয়েকজন মালিক এখনো পণ্য পরিবহন করছেন তারা বেশি ভাড়া আদায় করছেন।

মেসার্স নিপা স্টোরের মালিক আব্দুল হাকিম নয়ন বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন না হলে পণ্য পরিবহন সহজ হয় না। এ অঞ্চলের রংপুর-লালমনিরহাট-বুড়িমারী জাতীয় মহাসড়কটি কর্তৃপক্ষের অবহেলায় চলাচলের অনুপযোগী। তাই বাইরে থেকে মালপত্র পরিবহনের জন্য গাড়ি ভাড়া পাওয়া যায় না। এজন্য অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে পণ্য আনা-নেয়া করতে হয়। এতে বেশি ভাড়া দিয়ে পণ্য এনে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে। আমরা দ্রুত সড়কের সংস্কার কাজ করার দাবি জানাচ্ছি।

বুড়িমারী স্থলবন্দর ব্যবহারকারী আমদানি-রফতানিকারক তারেক ইসলাম রাশেদ বলেন, রংপুর সাতমাথা থেকে লালমনিরহাট-বুড়িমারী স্থলবন্দর পর্যন্ত প্রায় ১৩৮ কিলোমিটার সড়ক ব্যবহারের অনুপযোগী। এতে বেশি দামে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে। ফলে আমাদের তেমন লাভ হচ্ছে না। আসন্ন বর্ষার আগেই যদি সড়কটি মেরামত করা না হয়, তাহলে পণ্য পরিবহন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে। এ সমস্যা দ্রুত সমাধানের জন্য সড়ক বিভাগকে উদ্যোগ নিতে হবে।

রংপুর-লালমনিরহাট-বুড়িমারী স্থলবন্দর পর্যন্ত মহাসড়কের সংস্কার কাজ দ্রুত করার দাবি জানিয়ে একই কথা বলেন বন্দরের রফতানিকারক ব্যবসায়ী শামীম আহমেদ। তিনি বলেন, প্রত্যেক মাসে ২ থেকে ৩০০ ট্রাক পণ্য রফতানি করে সরকারকে বৈদেশিক মুদ্রা এনে দেয়। আর আমরা বুড়িমারীর ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবে পণ্য পরিবহনের জন্য জেলার একমাত্র সড়কটি ভালো পাই না।

লালমনিরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি সিরাজুল হক বলেন, জেলার উন্নয়ন মাসিক সমন্বয় সভায় পণ্য পরিবহন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে রংপুর-লালমনিরহাট-বুড়িমারী স্থলবন্দর পর্যন্ত বেহাল সড়ক সংস্কার করার দাবি জানিয়েছি। এর আগে ব্যবসায়ীদের মানববন্ধন করার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। আশা করছি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সড়ক মেরামত করবেন।

লালমনিরহাট সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুব রহমান বলেন, বড়বাড়ী-লালমনিরহাট-বুড়িমারী এবং লালমনিরহাট-মোস্তফী মহাসড়ক সংস্কারের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এ বিষয়ে নির্দেশনা পেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, ‘বুড়িমারী-লালমনিরহাট জাতীয় মহাসড়ক দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে সওজের নির্বাহী প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’