দীর্ঘদিন পর দখলমুক্ত হচ্ছে বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) উদ্যোগে চলতি বছরের ২৯ জুন উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছিল। এখন তা বেশ জোরেশোরে চলছে। অভিযানে ছাড় দেয়া হচ্ছে না প্রভাবশালীদেরও। ফলে চলমান উচ্ছেদ কার্যক্রম বিভিন্ন মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দখলদারদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না। নদী ও খাল দূষণের দায়ে এখনো কোনো প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা ও শাস্তির নজির দেখাতে পারেনি দেশের কোনো সিটি করপোরেশন। চলমান উদ্ধার অভিযানে ডিএসসিসির এ নজির সৃষ্টি করার সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগানো হচ্ছে না।

ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান উচ্ছেদ কার্যক্রমের আওতায় বুড়িগঙ্গা আদি চ্যানেলে ২০০ দখলদার রয়েছে। তাদের অনেকেই বেশ প্রভাবশালী। ৮-১০ তলা ভবনও রয়েছে বেশকিছু। এসব ভবন করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নেই উচ্ছেদ করা হচ্ছে।

ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. রাসেল সাবরিন বলেন, ‘অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করাটা আমাদের জন্য বেশ চ্যলেঞ্জিং ছিল। সেটা আমরা করতে পারছি। তবে উচ্ছেদ কার্যক্রমে করপোরেশনের প্রচুর অর্থ ব্যয় হচ্ছে।’

আগে উচ্ছেদের নোটিস দেয়া হচ্ছে জানিয়ে ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা বলেন, ‘এর ফলে অনেকে স্বেচ্ছায় ভবন ভেঙে ফেলছেন। নয়তো আমরা গিয়ে ভেঙে ফেলছি। এখনো কেউ অসহযোগিতা করেনি। এ পর্যন্ত দখলের দায়ে আমরা কাউকে মামলা দিইনি। ভবিষ্যতে কেউ যদি উচ্ছেদ নোটিস দেয়ার পরও না সরতে চায় বা উচ্ছেদ কার্যক্রমে বাধা দেয় তাহলে আরো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হব।’

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৯-এ বলা হয়েছে, বুড়িগঙ্গা আদি চ্যানেল দখল করে পার্ক, কারখানা, মেডিকেল কলেজ, মার্কেট এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সীমানা পিলার স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া আদি চ্যানেল এলাকায় নামে-বেনামে অসংখ্য দখলদার রয়েছে।

দীর্ঘদিন পর প্রভাবশালীদের দখল থেকে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্ধিতাংশ উচ্ছেদ করেছে সিটি করপোরেশন।

সরেজমিনে দেখা যায়, কামরাঙ্গীরচর এলাকার একটি পার্ক ও ব্যাটারি কারখানার বর্ধিতাংশ ডিএসসিসি ভেঙে দিয়েছে। এছাড়া অনেকগুলো বহুতল ভবন ভাঙার কাজ করছেন শ্রমিকরা।

আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল উদ্ধার প্রকল্পের পরিচালক খায়রুল বাকের বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উচ্ছেদ অভিযানে দিন-রাত শ্রমিকরা কাজ করছেন। আমরা এখন পর্যন্ত ২১ কোটি টাকা ব্যয় করে ফেলেছি।’

সিটি করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে অবৈধ উচ্ছেদের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগর গবেষণা কেন্দ্রের সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘জনগণের অর্থ ব্যয় করে অবৈধ উচ্ছেদ প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। বিজিএমইএ ভবন যখন ভাঙা হয়েছে তখন সেটার খরচ কিন্তু সরকার দেয়নি। আইনও এটাই বলে দখলদাররা নিজের খরচে দখল সরিয়ে নেবে। তার পরও সিটি করপোরেশন যে এতটুকু করতে পারছে এজন্য আমরা বাহবা দেব।’

দখলদারদের আইনের আওতায় আনার বিষয়ে জানতে চাইলে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বণিক বার্তাকে বলেন, আইন অনুযায়ী দখলদারদের শাস্তির আওতায় আনা জরুরি। যেহেতু আদালত উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন, সিটি করপোরেশনের উচিত ছিল দখলদারদের আইনের আওতায় আনা। পাশাপাশি দখলদারদের টাকাতেই উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা। এটা করতে পারলে ভবিষ্যতে দখলদাররা সতর্ক হয়ে যেত।

বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছে রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি)। সংস্থাটির চেয়ারম্যান মোহাম্মাদ এজাজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যারা দীর্ঘদিন বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল দখল করে রেখেছে, আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে, তাদের জরিমানা করা দরকার ছিল। তাছাড়া নদী-খাল দখল করা তো ফৌজদারি অপরাধ। দুঃখজনক সত্য হলো, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের কোথাও আজ পর্যন্ত নদী বা খাল বেদখলের দায়ে কেউ শাস্তি পায়নি, যা দখলদারদের জন্য বড় অনুপ্রেরণার জায়গা। নদী ও খাল দখলদারদের শাস্তির আওতায় এনে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করার এখনই সময়।’

ডিএসসিসির ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ নং ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত কামরাঙ্গীরচর, যা মূলত বুড়িগঙ্গার বুকে জেগে ওঠা একটি চর। শহীদনগর থেকে হাজারীবাগ পর্যন্ত বিস্তৃত এ চর ও বেড়িবাঁধের মাঝখানের জায়গায় বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল ছিল। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেলে নব্বইয়ের দশকেও পানি প্রবহমান ছিল। ’৮৮ সালের আগ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল হয়ে টঙ্গী পর্যন্ত স্থানীয়রা যাতায়াত করত।

করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট তিনটি প্যাকেজের আওতায় প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলবে বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল খননকাজ। তিনটি প্যাকেজ বাস্তবায়ন হলে ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, লালবাগ ও কামরাঙ্গীরচরের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে। বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেলের প্রায় সাত কিলোমিটার জায়গায় দৃষ্টিনন্দন করে সাজানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পুরান ঢাকার মুসলিমবাগে আদি চ্যানেলটির শুরু থেকে রায়েরবাজার বেড়িবাঁধ সড়কের পশ্চিম পাশের খাল দিয়ে বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত সংযুক্ত করা হবে। চ্যানেলের দুপাশে সবুজ উন্মুক্ত স্থান ও বিনোদন স্পট তৈরি করা হবে। দুপাশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে পর্যাপ্তসংখ্যক ব্রিজ ও ওভারপাস নির্মাণ করা হবে।