বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশের মেট্রোপলিটন এলাকায় ভূগর্ভস্থ কেবল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে মাটির নিচে বিদ্যমান ইউটিলিটি লাইনের অপ্রতুল নকশা ও অন্যান্য সেবা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের অভাবে এ কাজে সে রকম কোনো অগ্রগতি নেই। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। সেই প্রতিবেদনে ভূগর্ভস্থ কেবল স্থাপনে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করা হয়।
সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সুষ্ঠু ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন উন্নয়নকাজের অংশ হিসেবে দেশের মেট্রোপলিটন এলাকায় ভূগর্ভস্থ কেবল ও সাবস্টেশন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ঢাকা শহরের মতো জনবহুল এলাকায় বিদ্যুতের নিরাপত্তা বিধান এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সৃষ্ট বিপর্যয় মোকাবেলায় ভূগর্ভস্থ কেবল স্থাপন অত্যন্ত নিরাপদ ও সহায়ক। এতে সিস্টেম লসও কম হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) ১ হাজার ২৮৭ কিলোমিটার, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) ১ হাজার ৩৬৬ কিলোমিটারসহ বিভিন্ন সংস্থা বা কোম্পানির প্রায় ২ হাজার ৬৯২ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ লাইন নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (পবিবো) ৮ হাজার ৮৪৮ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ বিতরণ লাইন স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ করছে। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) খুলনা, বরিশাল ও যশোরে ২ হাজার ৬১ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড লাইন স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে শহরকেন্দ্রিক এলাকায়ই ভূগর্ভস্থ লাইন নির্মাণে কাজ করা হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ কেবল স্থাপনে বিদ্যমান অবস্থা বজায় রেখে আন্ডারগ্রাউন্ড লাইন নির্মাণ, মাটির নিচে বিদ্যমান বিভিন্ন ইউটিলিটি লাইনের বিষয় সুরাহা করা, রাস্তার সংকীর্ণতা, সময়ের সীমাবদ্ধতা, বায়ু ও শব্দদূষণ, বর্ষা মৌসুমের সময় বেড়ে যাওয়া, সমন্বয় সভা দ্রুত না করা, চূড়ান্ত অনুমোদন প্রাপ্তিতে সময়ক্ষেপণ এবং উভয় সিটি করপোরেশনের কাজের ভিন্নতাসহ বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এসব কারণে কেবল স্থাপনে অনেক অন্তরায় সৃষ্টি হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে যেসব প্রতিবন্ধকতার বিষয় উঠে এসেছে তার মধ্যে রয়েছে শহর এলাকায় অপ্রশস্ত ও জনবহুল রাস্তার পাশে ট্রান্সফরমার, রিং মেইন ইউনিট (আরএমইউ) ইত্যাদি স্থাপনে পর্যাপ্ত স্থানের অপ্রতুলতা। প্রত্যেকটি বিভাগীয় শহরের রাস্তায় বিভিন্ন ইউটিলিটির ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন ও কেবল বিদ্যমান থাকায় বৈদ্যুতিক কেবল স্থাপনের জন্য রুট নির্ধারণ একটি দুরূহ কাজ। সব ইউটিলিটি একটি নির্দিষ্ট লাইন নির্মাণ করে কেবল স্থাপন করতে পারে। আন্ডারগ্রাউন্ড কেবল স্থাপনের খরচ ওভারহেড লাইন নির্মাণের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। এজন্য সব বিভাগীয় শহরের লাইন আন্ডারগ্রাউন্ডে স্থাপনে অর্থায়ন করা একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। ভূগর্ভস্থ কেবল স্থাপনে সিটি করপোরেশন থেকে সড়ক খননের প্রয়োজনীয় অনুমোদন প্রাপ্তি সময়সাপেক্ষ। তাছাড়া সড়ক খননের অনুমতি পাওয়ার পর কাজ বাস্তবায়নে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন সময় ভূগর্ভস্থ বিভিন্ন ইউটিলিটির লাইন যেভাবে স্থাপন করা হয়েছে তার নকশা সংরক্ষণ নেই। অপরিকল্পিভাবে ইউটিলিটি লাইন নির্দিষ্ট লেয়ার মেইনটেইন না করে স্থাপন করার ঘটনাও ঘটেছে। ইউটিলিটি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সড়ক খননে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা এবং অদক্ষ শ্রমিক দিয়ে সড়ক খননকাজ করা হয়েছে। খননকাজে অপরিকল্পিতভাবে ব্যবহারও করা হয়েছে এক্সক্যাভেটর। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ বৈদ্যুতিক লাইন স্থাপনের জন্য জায়গা নির্ধারণের সময় বন্যা ও জলাবদ্ধতার বিষয়টি একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। আন্ডারগ্রাউন্ড সিস্টেমের ওপর দক্ষ জনবল ও ভূগর্ভস্থ লাইন পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিসহ সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়নি। প্রকল্প গ্রহণের আগে বিস্তৃত ঘনবসতিপূর্ণ নগরীর অংশ, সরু রাস্তা দিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড কেবল, অন্যান্য যন্ত্রপাতি স্থাপনের জন্য বিস্তারিত সমীক্ষা এবং ড্রইং ও ডিজাইন প্রণয়নেও ঘাটতি দেখা গেছে।
ভূগর্ভস্থ কেবল স্থাপনের বিষয়টি নিয়ে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়। আলোচনায় ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের যেসব মাপকাঠি রয়েছে, তার মধ্যে নিরাপত্তা একটি বড় বিষয়। ঢাকা শহরের মতো ঘিঞ্জি এলাকায় বিদ্যুতের নিরাপত্তা বিধান এবং ঝড়-বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট ব্যাঘাত মোকাবেলায় ভূগর্ভস্থ লাইন স্থাপন অত্যন্ত নিরাপদ ও সহায়ক। এতে সিস্টেম লসও কম হয়। প্রাথমিকভাবে শহরকেন্দ্রিক এলাকায়ই ভূগর্ভস্থ লাইন নির্মাণের কাজ হচ্ছে।
বৈঠকে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানান, প্রধানমন্ত্রী চার-পাঁচ বছর আগে শহরগুলোয় ভূগর্ভস্থ কেবল স্থাপনের জন্য অনুশাসন দিয়েছেন। ঢাকা শহরে হাইভোল্টেজ লাইনগুলো ভূগর্ভস্থ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে নকশা অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় বিভিন্ন সংস্থা অনেক সময় তার কেটে ফেলে, যা ভবিষ্যতে একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দেবে। তিনি আরো জানান, ডিপিডিসি ২০১৬ সালে প্রকল্প নিলেও কাজ শুরু হয় ২০২১ সালে। ডেসকো ২০১৬ সালে নকশা তৈরির জন্য পরামর্শক নিয়োগ দিলেও এখনো নকশা হয়নি। আরইবি ২০১৭ সালে কেরানীগঞ্জের একটি অংশের জন্য পরামর্শক নিয়োগ করে প্রকল্প প্রস্তাব সম্পন্ন করেছে, আরো চারটি উপজেলায় তারা কাজ শুরু করেছে। পিডিবি দুই বছর আগে কনসালট্যান্ট নিয়োগ করলেও করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে নকশা তৈরি হয়নি। নকশা তৈরির পর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বাজেট অনুমোদন, প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি ও টেন্ডার সম্পন্ন হতে পাঁচ-সাত বছর সময় লাগবে। ওজোপাডিকো কনসালট্যান্ট নিয়োগ করে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করেছে। নেসকো কেবল কাজ শুরু করেছে। এভাবে কাজ শেষ করতে আট-দশ বছর সময় অতিক্রান্ত হবে।










