সার্ভিস চালুর ৫২ দিন পর গত ২৯ মে বন্ধ হয়ে যায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে চলা কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেন। ইঞ্জিন ও লোকবল সংকটের কারণ দেখিয়ে সার্ভিস বন্ধ করে দেয় রেলওয়ে। যদিও ১০ কোচের দ্বিতীয় শ্রেণীর ট্রেনটি পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেনের চেয়েও বেশি রাজস্ব আয় করেছে। পাশাপাশি পূর্বাঞ্চলে চলাচলরত ৪৫টি মেইল, এক্সপ্রেস ও কমিউটার ট্রেনের প্রায় সমান রাজস্ব আয় করেছে কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেনটি।

রেলওয়ের তথ্যমতে, চলতি বছরের ৮ এপ্রিল চালুর পর ২৯ মে হঠাৎ করেই ট্রেনটির সার্ভিস বন্ধ করে দেয় রেলওয়ে। রেলের যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগ থেকে ইঞ্জিন ও ক্রু সরবরাহে অপারগতা জানানোর পর জনপ্রিয় ট্রেনটি বন্ধ করে দিলে সমালোচনার মুখে পড়ে রেলওয়ে। রেলের ৮০টি আন্তঃনগর ট্রেনের মধ্যে মার্চে তিনটি আন্তঃনগরের বেশির ভাগ ট্রেনের চেয়েও বেশি আয় করেছিল কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেন। মাত্র ১০ কোচের (শেষের কয়েক দিন ১৫ কোচে যাত্রী পরিবহন করেছে) ১৫০ কিলোমিটার দূরত্বের যাত্রাপথে চলাচল করা ট্রেনটি বছরব্যাপী চলাচল করলে ৭-৮ কোটি টাকা আয়ের সুযোগ ছিল। 

কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেনের সঙ্গে তিনটি আন্তঃনগর ট্রেনের আয়ের তুলনামূলক চিত্রে দেখা গেছে, উদ্বোধনের পর ২৯ মে পর্যন্ত ৫২ দিনে কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেন উভয় পথে আয় করেছে ১ কোটি ৪ লাখ ৪১ হাজার ৩৫ টাকা। ট্রেনটি উভয় পথে প্রতিদিন ২ লাখ ৭৯০ টাকা হিসাবে প্রতি মাসে আয় করেছে গড়ে ৬০ লাখ ২৩ হাজার ৬৭৫ টাকা। যদিও ২০২৩ সালের মে মাসে পূর্বাঞ্চলের ৪৫টি মেইল, এক্সপ্রেস ও কমিউটার ট্রেন সব মিলিয়ে আয় করেছিল মাত্র ৬৯ লাখ ৬৭ হাজার ২৪৭ টাকা। আর জুনে আয় করেছিল ৬৫ লাখ ৪২ হাজার ৬৩৫ টাকা। বাড়তি দূরত্বের ভ্রমণ, বাড়তি কোচ সংযোজন ছাড়াও ভালো মানের কোচের সমন্বয়ে তৈরি রেক দিয়ে এসব ট্রেন চালানো হয়। তার পরও কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেনের চেয়ে কম আয় করে ট্রেনগুলো যাত্রী পরিবহন করছে বছরের পর বছর। কিন্তু নতুন চালু হওয়া রুটে মাত্র ১০টি কোচ দিয়ে স্বল্প দূরত্বে কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেন যাত্রী পরিবহন করে যে পরিমাণ রাজস্ব আয় করেছে, সেটি রেলের যাত্রী পরিবহন ইতিহাসে রেকর্ড।

রেলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ফুটে উঠেছে পূর্বাঞ্চলের আন্তঃনগর ট্রেনের মাসিক আয় পর্যালোচনায়। পূর্বাঞ্চলে চলাচলত ৪০টি আন্তঃনগর ট্রেনের (উভয় পথে) বেশ কয়েকটি কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেনের চেয়েও কম আয় করছে। অন্তত ১০টি ট্রেন কক্সবাজার স্পেশালের চেয়ে কিছু বেশি কিংবা দ্বিগুণেরও কম আয় করছে।

রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভালো মানের সেবা ও কোচ দেয়া হলে ট্রেনটি থেকে যাত্রী খাতের আয় দ্বিগুণ করা সম্ভব ছিল। তাছাড়া দূরত্ব কম হওয়ায় একটি মাত্র রেক দিয়ে প্রতিদিন দুই জোড়া ট্রেনও পরিচালনা করা সম্ভব। কিন্তু রেলের চিরায়ত লোকবল ও ইঞ্জিন সংকটের অজুহাতে ট্রেনটি হঠাৎ বন্ধ করে দেন রেলের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক সরদার শাহাদাত আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন লোকবল নিয়োগ বন্ধ থাকায় কক্সবাজার রুটে নতুন ট্রেন সার্ভিস চালু করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাছাড়া রেলের ইঞ্জিনগুলোর সিংহভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় কোনো রকমে ট্রেন সার্ভিস পরিচালনা করতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি ইঞ্জিন দুর্ঘটনার কারণে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সংকট আরো বেড়েছে। নতুন ইঞ্জিনের মধ্যে একটি বড় অংশই যন্ত্রাংশের অভাবে মেরামতে বিলম্ব হওয়ায় নতুন ট্রেন চালানো আপাতত সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেনটি সাময়িক সময়ের জন্য চালু করা হয়েছে। প্রকল্পটির কাজ সম্পূর্ণ শেষ হলে সার্বিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নতুন করে এ রুটে ট্রেন সার্ভিস শুরু করা হবে।’

রেলের বাণিজ্যিক ও পরিবহন বিভাগের পরিকল্পনা ছিল ৮ এপ্রিল চালুর পর ধারাবাহিকভাবে ট্রেনটির সার্ভিস চালিয়ে যাওয়া। এজন্য মাঠ পর্যায় থেকে চাহিদা বাড়তে থাকায় দুই দফায় বাড়িয়ে ট্রেনটির সার্ভিস ১০ জুন পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। এরপর ১২ জুন থেকে ঈদুল ফিতরের স্পেশাল সার্ভিস শুরু হলে ট্রেনটি আরো অন্তত দুই সপ্তাহ পরিচালনা করে একপর্যায়ে স্থায়ী ট্রেনে রূপ দেয়া হতো। এভাবে এক জোড়া ট্রেনকে একদিনে দুবার অর্থাৎ দুই জোড়া ট্রেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা ছিল রেলের। কিন্তু যান্ত্রিক বিভাগ ট্রেনটি চালাতে লোকবল ও ইঞ্জিন দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় সার্ভিসটি মাঝপথে বন্ধ করে দেয় বলে অভিযোগ রেলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের। কোরবানির ঈদ উপলক্ষে একই ট্রেন সাময়িকভাবে চালানোর কথা জানানো হলেও সেটি যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় স্থায়ীভাবে বরাদ্দের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়েসংশ্লিষ্টরা।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, পরিবহন ও বাণিজ্যিক বিভাগ যাত্রী চাহিদা মেটানো ও রাজস্ব আয় বাড়াতে নিয়মিত ট্রেন চালানোর পক্ষে থাকলেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগ। স্বাভাবিক নিয়মে রেলের কোচ ও ইঞ্জিন মেরামতে ব্যর্থতার কারণে প্রতিদিনই ট্রেনের স্বাভাবিক যাত্রা ও অতিরিক্ত কোচ সংযোজন বিঘ্নিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ওয়ার্কশপে থাকলেও কোচ ও ইঞ্জিন মেরামতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করছে যান্ত্রিক বিভাগ। তাছাড়া রেলের লোকবল সংকটের কথা বলা হলেও নিয়মিত বিরতিতে ইঞ্জিনের কারণে অনেক ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হচ্ছে। আগে নিয়মিত ১০টি পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করলেও বর্তমানে চলছে পাঁচ-ছয়টি। এসব ট্রেনের লোকোমাস্টারসহ অন্যান্য ক্রু অলস বসে থাকলেও কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেনটিকে ক্রু সংকটের কারণে বন্ধ করে দেয়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে দাবি করেন পরিচালন বিভাগের কর্মীরা।

তবে প্রকৌশল বিভাগসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজেটের কারণে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হওয়ায় রেলের কোচ ও ইঞ্জিনের নিয়মিত মেরামতকাজ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। নতুন ১৪৭টি কোচ আমদানি হওয়ায় সংকট কিছুটা কমলেও ইঞ্জিন সংকটে রয়েছে রেলওয়ে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে কোরবানি ঈদে রেলপথে যাত্রী পরিবহন নাজুক হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।