দেশের বিভিন্ন খাতে ব্যবসায়িকভাবে সফল ব্র্যান্ড হিসেবে এপেক্স, নাভানা, র্যাংগস, আরএকে, সানম্যান, আদ-দ্বীন, শামসুল আলামিন ইত্যাদি নাম বেশ সুনাম অর্জন করেছে। পাদুকা থেকে শুরু করে রিয়েল এস্টেট পর্যন্ত নানা খাতে এসব ব্র্যান্ডসংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সাফল্যের ছাপ রয়েছে। তবে কেবল ওষুধ খাতেই ব্যবসা চালাতে গিয়ে প্রত্যাশামাফিক সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠান। এমনকি চলমান মহামারী পরিস্থিতিতেও ওষুধ ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি প্রতিষ্ঠানগুলো।
কভিড-১৯ চলাকালে দেশের ওষুধ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ ভালো ব্যবসা করেছে। বিশেষ করে চলতি বছরের শুরুতে মহামারীর প্রাদুর্ভাব জোরালো হয়ে ওঠার পর এ শিল্পের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর ব্যবসা বেশ চাঙ্গা হয়ে ওঠে। কিন্তু এর মধ্যেও অনেক কোম্পানি রয়েছে, যারা মহামারী পরিস্থিতিতেও ওষুধের বর্ধিত চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে বিক্রি বাড়াতে পারেনি।
দেশের পাদুকা বাজারে অন্যতম শীর্ষ ব্র্যান্ড এপেক্স ফুটওয়্যার। পাদুকা ব্যবসার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারে ব্র্যান্ড হিসেবে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে নিতে পারলেও ওষুধ শিল্পের ব্যবসায় ভালো করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। এরই প্রতিফলন এপেক্স ফার্মার বার্ষিক ওষুধ বিক্রির পরিসংখ্যানে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট তথ্যপ্রযুক্তি ও ক্লিনিক্যাল গবেষণার বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান আইকিউভিআইএর তথ্যমতে, ২০২০ সালের জুনে শেষ হওয়া এক বছরে এপেক্স ফার্মার ওষুধ বিক্রির পরিমাণ ছিল ৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা। এর আগে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে প্রতিষ্ঠানটির ওষুধ বিক্রি হয়েছিল ৭ কোটি ২৩ লাখ টাকার। সে হিসাবে এক বছরে প্রতিষ্ঠানটির ওষুধ বিক্রি কমেছে সাড়ে ১৪ শতাংশেরও বেশি। চলতি বছর জুন পর্যন্ত দেশের মোট ওষুধ বিক্রিতে এপেক্স ফার্মার অংশ ছিল মাত্র দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
অথচ দেশের পাদুকা শিল্পে বড় ব্র্যান্ড এপেক্স। ওয়ার্ল্ড ফুটওয়্যার ইয়ারবুকের সর্বশেষ সংস্করণের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরও দেশের প্রধান পাদুকা প্রস্তুতকারকদের মধ্যে শীর্ষে ছিল এপেক্স ফুটওয়্যারের নাম।
ওষুধ শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু এপেক্স নয়, এমন আরো অনেক কোম্পানি রয়েছে, যারা অন্যান্য পণ্যের ব্যবসায় স্বীকৃত জায়ান্ট হলেও ওষুধের ব্যবসা চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। এরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আইকিউভিআইএর পরিসংখ্যানে।
প্রতি প্রান্তিকেই বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওষুধ বিক্রির তথ্য সংকলন ও পর্যালোচনা করে আইকিউভিআইএ। চলতি বছর জুন পর্যন্ত সংস্থাটির হিসাব বলছে, দেশের ওষুধ শিল্পে মোট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান আছে আড়াই শতাধিক। এর মধ্যে পণ্য বিক্রিতে আধিপত্য রয়েছে শীর্ষ ১০ কোম্পানির। গত এক বছরে বাংলাদেশে স্থানীয় বাজারে মোট ওষুধ বিক্রির পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে শীর্ষ ১০টিরই অংশ রয়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ।
আইকিউভিআইএর পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, ওষুধ বিক্রির বাজারে দেশের বড় করপোরেট গ্রুপগুলোর অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। যদিও প্রতিষ্ঠানগুলো অন্যান্য ব্যবসায় বেশ ভালো করছে।
মোটরগাড়ি, ইলেকট্রনিকস, আবাসন ও শিপিং ব্যবসায় দেশের অন্যতম বৃহৎ গ্রুপ র্যাংগস। ২০০৩ সালে গ্রুপটি ওষুধ শিল্পে পদার্পণ করে র্যাংগস ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড নামে। পরিসংখ্যান বলছে, জুনে শেষ হওয়া বছরে ওষুধ বিক্রির দিক থেকে শীর্ষ ৩০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও স্থান করে নিতে পারেনি র্যাংগস। এ সময় প্রতিষ্ঠানটি ওষুধ বিক্রি করেছে ১৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকার। এ এক বছরে কোম্পানির বিক্রি কমেছে ৩৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এ সময় বিক্রির বাজারে প্রতিষ্ঠানটির অংশ ছিল মাত্র দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।
অন্যান্য খাতে ভালো করেও ওষুধের বাজারে পিছিয়ে পড়া এমন আরেকটি প্রতিষ্ঠান নাভানা। জুনে শেষ হওয়া বছরে প্রতিষ্ঠানটির ওষুধ বিক্রি কমেছে ১২ দশমিক ২৭ শতাংশ।
একই অবস্থা বস্ত্র ও পোশাক এবং টেলিযোগাযোগ খাতের অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান সানম্যান গ্রুপেরও। সানম্যান গ্রুপের ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সানম্যান বারডেম জুনে শেষ হওয়া বছরে বিক্রি করতে পেরেছে ৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকার পণ্য। মোট বিক্রির বাজারে প্রতিষ্ঠানটির অংশ ছিল দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। জুন পর্যন্ত এক বছরে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি কমেছে ৩ দশমিক ৮০ শতাংশ।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্যান্য ব্যবসার সঙ্গে ওষুধের ব্যবসার ধরনে অনেক পার্থক্য আছে। সার্বিকভাবে বলতে গেলে মূলত ওষুধের বিপণন কৌশলের ঘাটতির কারণে অন্য ব্যবসার বড় ও ভালো কোম্পানিগুলো ওষুধের ব্যবসায় ভালো করতে পারছে না।
দেশের চিকিৎসা সেবা খাতে প্রতিষ্ঠিত একটি নাম আদ-দ্বীন। স্বল্প ব্যয়ে মানসম্পন্ন চিকিৎসা সেবা দিয়ে এরই মধ্যে বেশ সুনাম অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু ওষুধের ব্যবসায় নেমে খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারছে না আদ-দ্বীন। আইকিউভিআইএ জানিয়েছে, গত জুন পর্যন্ত এক বছরে প্রতিষ্ঠানটি ওষুধ বিক্রি করেছে ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকার। ওষুধের বাজারে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির অংশ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ।
অন্য ব্যবসায় ভালো করলেও ওষুধ শিল্পে এসব প্রতিষ্ঠানের ভালো করতে না পারার কারণ জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ওষুধের ব্যবসা দেশের অন্য সব ব্যবসা থেকে অনেকটাই আলাদা। এ ব্যবসার উৎপাদনসংক্রান্ত বিষয়গুলো মূলত কারিগরি। আর বাজারজাত পর্যায় পর্যন্ত আসনে ভিন্ন ধরনের বিপণন কৌশল অবলম্বন করতে হয়, যার অনেক ক্ষেত্রেই অনৈতিক চর্চার প্রদর্শনও ঘটে থাকে। এ পরিবেশে টিকে থাকার লড়াইটাও তাই অন্যান্য ব্যবসা থেকে ভিন্ন। অনেক সফল উদ্যোক্তাই তাই এ ব্যবসায় প্রবেশ করলেও একটা পর্যায়ে বেরিয়ে এসেছে।
ওষুধ শিল্পে ভালো করতে না পেরে ব্যবসা আংশিকভাবে গুটিয়ে নিয়েছে শামসুল আলামিন গ্রুপ। আইকিউভিআইএর পরিসংখ্যান বলছে, সর্বশেষ জুন পর্যন্ত এক বছরে গ্রুপটির প্রতিষ্ঠিত ওষুধের ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রি কমেছে ৮৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
এ বিষয়ে শামসুল আলামিন গ্রুপের অন্যতম কর্ণধার ও আবাসন খাতের মালিক সংগঠন রিহ্যাব সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন বণিক বার্তাকে বলেন, ওষুধের ব্যবসার খাতটি অনেকটাই টেকনিক্যাল। উৎপাদন থেকে শুরু করে পণ্য বিপণনের ক্ষেত্রেও সে টেকনিক্যাল বিষয়গুলোর প্রভাব দেখা যায়। এসবের অভিজ্ঞতার ঘাটতি থেকেই ওষুধের ব্যবসার বড় একটি অংশ ছেড়ে দিয়েছি আমরা।
ওষুধ শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিষ্ঠানের পারদর্শিতা তিনটি আঙ্গিকে বিবেচনা করা হয়। ব্যবস্থাপনা, পণ্য ও নীতি—এ তিন ক্ষেত্রে পারদর্শিতার সমন্বয়ে যে প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে যেতে পারে তারাই বাজারে টিকে থাকে। কারিগরি দিকসম্পন্ন খাতটিতে টিকে থাকতে প্রয়োজন হয় কেন্দ্রীভূত মনোযোগ ও সহনশীলতার। এ খাতে রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্টও (আরওআই) খুব দ্রুত যেমন আসে না, তেমনি এলেও তা খুব একটা বেশি হয় না। সার্বিক প্রেক্ষাপটেই অন্য ব্যবসায় ভালো করছে, এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক মানসিকতাই ওষুধের ব্যবসায়ে টিকে থাকা বা না থাকার নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএপিআই) সেক্রেটারি জেনারেল এসএম শফিউজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, অন্য ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত বড় গ্রুপ হলেও ওষুধের ব্যবসায় ভালো করছে না এমন অনেক প্রতিষ্ঠানই আছে ওষুধ শিল্পে। অনেকে টিকতে না পেরে ব্যবসা বিক্রি করে দিয়েছে এমন ঘটনাও আছে। মূলত ওষুধের ব্যবসার ধরনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারার কারণে অনেক বড় গ্রুপ ভালো করতে পারেনি। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই সঠিক বিপণন কৌশল অবলম্বনে ব্যর্থ হয়েছে।










