নিরীক্ষা প্রতিবেদনের সঠিকতা ও গুণগতমান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নজির রয়েছে একাধিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরিরও। এ অবস্থায় প্রযুক্তির মাধ্যমে একাধিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন ঠেকাতে ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেম (ডিভিএস) তৈরি করে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি)। কিন্তু প্রযুক্তির ফাঁকফোকর গলিয়ে এখনো অনিয়ম করে যাচ্ছেন বেশকিছু নিরীক্ষক। বিশেষ করে ডিভিএস চালুর পরও ব্যাক ডেটে (পুরনো তারিখে) আর্থিক প্রতিবেদন প্রণয়নের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি খোদ আইসিএবির বিরুদ্ধে ব্যাক ডেটে নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রণয়নে নিরীক্ষকদের উৎসাহিত করার অভিযোগ উঠেছে।

এ বছরের ১২ মে আইসিএবির প্রেসিডেন্টের কাছে নিরীক্ষকের নিরীক্ষা কাজের গুণগত মানের বিষয়ে একটি চিঠি পাঠায় ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মো. সাঈদ আহমেদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, এফআরসির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে ৪৫ জন নিরীক্ষকের নিরীক্ষা কাজের গুণগতমানের বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ে আইসিএবির প্রেসিডেন্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ ও এফআরসিকে তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপি পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছিল। ৪৫ নিরীক্ষকের বিরুদ্ধে এফআরসির পক্ষ থেকে বেশকিছু বিষয়ে আইসিএবির দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিরীক্ষকদের সক্ষমতার সঙ্গে নিরীক্ষা কাজের পরিমাণের কোনো অসংগতি রয়েছে কিনা, আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা মান অনুসারে নিরীক্ষা করা হয়েছে কিনা ও নিরীক্ষা ফি থেকে সরকারি রাজস্ব যথাযথভাবে প্রদান করা হয়েছে কিনা।

এফআরসির চিঠিতে আরো বলা হয়, কোনো কোনো নিরীক্ষক ব্যাক ডেটে অনেক নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রদান করেছেন। ব্যাক ডেটে নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রদান করার ব্যবস্থা রদ করে এফআরসির চেয়ারম্যান এ বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি চিঠির মাধ্যমে নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু আইসিএবির পক্ষ থেকে অদ্যাবধি এ অনিয়ম বন্ধ করার ব্যাপারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি, যা ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন (এফআরএ) ২০১৫-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এসব বিষয়ে বারবার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও আইসিএবির পক্ষ থেকে এফআরসিকে ৪৫টি তদন্ত প্রতিবেদনের একটিও সরবরাহ করা হয়নি, যা এফআরসির কাজকে বাধাগ্রস্ত করছে। এফআরসির কাছে থাকা তথ্যানুসারে আইসিএবির নিরীক্ষা চর্চা সনদধারী (সিওপি) নিরীক্ষকরা নিরীক্ষা না করেই কয়েক হাজার নিরীক্ষা প্রতিবেদন ব্যাকডেটে প্রদান করেছেন, যা এফআরএ আইন ২০১৫ ও কোম্পানি আইন ১৯৯৪-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। চিঠিতে সংযুক্ত তালিকা অনুসারে ৪৫ জন নিরীক্ষকের নিরীক্ষা কাজের তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপি জরুরি ভিত্তিতে এফআরসির কাছে পাঠানোর জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এফআরসি সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৩০ জুন যেসব কোম্পানির হিসাব বছর শেষ হয়েছে তাদের ক্ষেত্রে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যেই বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদিও দেখা যাচ্ছে যে বেশকিছু নিরীক্ষক গত বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন এ বছরে ডিভিএসে জমা দিয়েছেন। অথচ নিরীক্ষার তারিখ দেয়া হয়েছে গত বছরের। নিয়মানুসারে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যেই ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন কোডসহ (ডিভিসি) এসব আর্থিক প্রতিবেদন ডিভিএসে জমা দেয়ার কথা ছিল।

আইসিএবির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সদস্যদের বরাতে গত ১২ মে এফআরসির চেয়ারম্যানের কাছে একটি অভিযোগ পাঠানো হয়। এ অভিযোগের অনুলিপি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান এবং যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) নিবন্ধকের কাছেও পাঠানো হয়। অভিযোগে বলা হয়, আইসিএবির প্রেসিডেন্ট শাহাদাত হোসেন ও সাতজন কাউন্সিল সদস্য সংস্থাটির নিরীক্ষা চর্চাকারী সব সদস্যের সঙ্গে এ বছরের ২০ এপ্রিল একটি সভার আয়োজন করেন। ‘সাম্প্রতিক পেশাগত ইস্যু নিয়ে আলোচনা’ শীর্ষক এ সভায় আইসিএবির নিরীক্ষা চর্চাকারী সব সদস্যকে ২০২১ সালের নিরীক্ষা প্রতিবেদন যেকোনো তারিখে দেয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়। এ সময় বলা হয় ২০২১ সালের কোনো নিরীক্ষা প্রতিবেদন যদি ২০২২ সালের তারিখে দেয়া হয় তাহলে কোম্পানিগুলোকে হাইকোর্টের কাছে মার্জনার জন্য যেতে হবে। তাই তারা দায়িত্ব নিয়ে ব্যাক ডেটে নিরীক্ষা প্রতিবেদন স্বাক্ষরের জন্য সবাইকে উদ্বুদ্ধ করেন। কাউন্সিল সদস্যদের এ আহ্বানের পর থেকে বেশকিছু নিরীক্ষক প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৮টি পর্যন্ত নিরীক্ষা প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেছেন, যার অধিকাংশই কোনো ধরনের নিরীক্ষা না করেই প্রদান করা হচ্ছে। আইসিএবির ডিভিএসে থাকা তথ্য পর্যালোচনা করলেই এসব নিরীক্ষা কাজের সত্যতা পাওয়া যাবে। আরো অভিযোগ করা হয়, কিছু কিছু নিরীক্ষক দুটি আর্থিক বিবরণী তৈরি করে ডিভিএসের জন্য বর্তমান তারিখ ও আরজেএসসিতে জমা দেয়ার জন্য ব্যাক ডেটে স্বাক্ষর করছে। এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আহ্বান জানান তারা।

এফআরসির পক্ষ থেকে যেসব নিরীক্ষক ব্যাক ডেটে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেছেন তাদের কাছে এজন্য ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে গত ১৯ মে এস আর ইসলাম অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের ম্যানেজিং পার্টনার সাইফুল আলমের কাছে এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠানো হয়। এর জবাবে গত ২৬ মে তিনি এফআরসির কাছে একটি চিঠি পাঠান। এতে বলা হয়, আইসিএবিতে গত ২০ এপ্রিল এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় নিরীক্ষা চর্চাকারী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় আইসিবির প্রতিনিধিরা মৌখিকভাবে জানান যে ৩০ জুন ২০২২ পর্যন্ত ব্যাক ডেটে নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রদান করা যাবে। এ বিষয়ে এফআরসির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার জন্যও অনুরোধ জানানো হয় চিঠিতে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইসিএবির প্রেসিডেন্ট শাহাদাত হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, এফআরএসির পক্ষ থেকে যে ৪৫ জন নিরীক্ষকের বিষয়ে তদন্ত করতে বলা হয়েছিল সেগুলো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকজন নিরীক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করে শাস্তি প্রদান পর্যন্ত বেশকিছু প্রক্রিয়া ও ধাপ পার হতে হয়। এজন্য কিছুটা সময় লাগছে। এ বিষয়ে এফআরসিকে বিস্তারিত জানানো হয়েছে।

ব্যাক ডেটে নিরীক্ষা প্রতিবেদন স্বাক্ষর করার বিষয়ে তিনি বলেন, একাধিক আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করা ঠেকাতে আমরা ডিভিএস চালু করেছি। এজন্য নিরীক্ষা শেষে প্রতিবেদনে একটি ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন কোড (ডিভিসি) দিতে হয়। ধরেন কোনো নিরীক্ষক ভুলবশত হোক কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবেই হোক ডিভিসি ছাড়াই আর্থিক প্রতিবেদন দিয়ে দিলেন। ইস্যুয়ার প্রতিষ্ঠান সেই প্রতিবেদন জমা দিয়ে দিল। পরবর্তী সময়ে যদি কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয় যে ডিভিসি ছাড়া প্রতিবেদন গ্রহণ করা হবে না তখন যদি নিরীক্ষক ডিভিসি দিতে চান এতে তো সমস্যার কিছু নেই। ডিভিসি থাকলেই হলো। এফআরসির কাছ থেকে এ-সংক্রান্ত চিঠি পাওয়ার পর আমরা বিষয়টি তাদের কাছে স্পষ্টীকরণ করেছি। তারাও বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন বলে জানান তিনি।

যে ৪৫ জন নিরীক্ষকের বিরুদ্ধে এফআরসির পক্ষ থেকে আইসিএবিকে তদন্ত করতে বলা হয়েছিল তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিএসইসির নিরীক্ষক প্যানেলভুক্ত। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ জড়িত থাকায় তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর নিরীক্ষার ক্ষেত্রে গুণগত মানের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইসিএবির বিরুদ্ধে ব্যাক ডেটে নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রণয়নে নিরীক্ষকদের উদ্বুদ্ধ করার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির কমিশনার অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, এ-সংক্রান্ত একটি অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।