রংপুর ও রাজশাহী অঞ্চলের কৃষকদের ঋণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে গঠন করা হয়েছিল রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)। প্রান্তিক কৃষকদের চাষাবাদেই ছোট ছোট ঋণ দেয়ার কথা ব্যাংকটির। কিন্তু লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে কৃষিভিত্তিক শিল্পে বড় বিনিয়োগ করেছে রাকাব। অনিয়মের মাধ্যমে দেয়া এ ঋণই বিপদ বাড়িয়েছে উত্তরাঞ্চলের কৃষকের বন্ধু খ্যাত রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির।
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের শীর্ষ ছয় খেলাপির পাঁচটি প্রতিষ্ঠানই কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার। শীর্ষ এ ছয় ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান হলো রংপুর পীরগঞ্জের শাহ ইসমাইল গাজী কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেড, গাইবান্ধা সুন্দরগঞ্জের আশরাফ সিডস স্টোর লিমিটেড, রাজশাহী দুর্গাপুরের নিগার কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেড, বগুড়া শেরপুরের এগ্রো আর্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, রংপুরের শাহ আমানত কোল্ড স্টোরেজ এবং দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেড। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেই আটকা পড়েছে ব্যাংকটির ১৭২ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেয়া চলতি বছরের জুনভিত্তিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য দিয়েছে রাকাব।
শুধু শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় থাকা এ প্রতিষ্ঠানগুলো নয়, এ রকম আরো এক ডজন হিমাগার প্রতিষ্ঠানকে দেয়া ঋণের অর্থও আদায় করতে পারছে না ব্যাংকটি। পুনঃতফসিল করে খেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত রাখার চেষ্টা করছে রাকাব। ব্যবসা ভালো আছে, এমন কোল্ড স্টোরেজ ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে দেয়া ঋণও আদায় সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির কর্মকর্তারা । এ পরিস্থিতিতে প্রতিনিয়ত লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে রাকাবের। সেই সঙ্গে বাড়ছে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি ও খেলাপি ঋণ।
রাকাবের মতো ছোট ব্যাংক প্রান্তিক কৃষকদের না দিয়ে কৃষিভিত্তিক শিল্পে কেন ঋণ দিতে গেল? এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম সাজেদুর রহমান খান বণিক বার্তাকে বলেন, রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চল হলো দেশের শস্যভাণ্ডার। আলুসহ অন্যান্য শস্য সংরক্ষণের কথা বিবেচনা করেই কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণে এসব ঋণ দেয়া হয়েছিল। এক্ষেত্রে কিছু গ্রাহক নির্বাচনে ভুল হতে পারে। আমরা দীর্ঘমেয়াদে পুনঃতফসিল করে হলেও বড় ঋণগুলো আদায় করার চেষ্টা করছি। এক্ষেত্রে কিছু ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের আন্তরিকতার যথেষ্ট ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। রাকাবের অর্থায়ন করা কোল্ড স্টোরেজগুলোর কিছু লোকসানের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েকটি চালু আছে। খেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে টাকা আদায়ে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি।
রাকাবের শীর্ষ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান হলো রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার শাহ ইসমাইল গাজী কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেড। চলতি বছরের জুন শেষে এ প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকটির ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। ২০১১ সালে শাহ ইসমাইল গাজী কোল্ড স্টোরেজকে ঋণ দিয়েছিল রাকাব। কিন্তু সে ঋণ আদায় করতে পারছে না ব্যাংকটি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৪ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আছে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের আশরাফ সিডস স্টোর লিমিটেডের। রাজশাহীর দুর্গাপুরের প্রতিষ্ঠান নিগার কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডের কাছে ৩১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আছে ব্যাংকটির। বগুড়ার শেরপুরের প্রতিষ্ঠান এগ্রো আর্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কাছে রাকাবের খেলাপি ঋণ আছে ২২ কোটি টাকা। এছাড়া রংপুরের শাহ আমানত কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডের কাছে প্রায় ২২ কোটি এবং দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডের কাছে ২০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে ব্যাংকটির।
কোল্ড স্টোরেজ প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে পারছে না কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএসএ) পরিচালক ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বণিক বার্তাকে বলেন, আলুর বাম্পার ফলনের পর বাছবিচার না করেই ২০০৯ সাল পরবর্তী সময়ে কোল্ড স্টোরেজের লাইসেন্স দেয়া হয়। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে ব্যাংকঋণে চাহিদার বেশি কোল্ড স্টোরেজ গড়ে ওঠে। এরপর আলুর দাম পড়ে যাওয়ায় চার দফায় কোল্ড স্টোরেজ মালিকদের লোকসান দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে ধারাবাহিক লোকসানে অনেক হিমাগার ব্যবসায়ীই পথে বসেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কোল্ড স্টোরেজ মালিকদের অনেকেরই ব্যাংকঋণ পরিশোধের সামর্থ্য নেই। এজন্য ব্যাংকগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করে দিতে হবে। বর্তমানে দেশে ৪০০-এর বেশি কোল্ড স্টোরেজ আছে বলে জানিয়েছেন এ ব্যবসায়ী।
১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়। কৃষি ব্যাংকের রাজশাহী বিভাগের শাখাগুলো নিয়েই ব্যাংকটি যাত্রা করেছিল। রাজশাহী বিভাগ ভেঙে রংপুর বিভাগ হওয়ায় এখন দুই বিভাগেই ব্যাংকটির কার্যক্রম চলছে। চলতি বছরের জুন শেষে রাকাবের আমানতের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। একই সময়ে ৫ হাজার ৭০২ কোটি টাকা ছিল ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণ। এ ঋণের মধ্যে ১ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা নাম লিখিয়েছে খেলাপির খাতায়। জুন শেষে রাকাবের খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩১ শতাংশের বেশি।
৩৮৩ শাখা নিয়ে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে কার্যক্রম পরিচালনা করা রাকাবের ১৯৫টি শাখাই এখন লোকসানি। চলতি বছরের জুন শেষে ৬০২ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে রাকাব। ধারাবাহিকভাবে লোকসানের কারণে ব্যাংকটির পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ ১ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। জুন শেষে রাকাবের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা।
সামগ্রিক বিষয়ে রাকাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম সাজেদুর রহমান খান বলেন, রাকাবের কর্মীরা প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে ঋণ পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করছে। করোনার মধ্যেও কৃষকরা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করছেন। সোনালী ব্যাংকে দীর্ঘ ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এদেশের বড় শিল্পপতিদের তুলনায় কৃষকরা ঋণ পরিশোধে বেশি আগ্রহী। সবচেয়ে বড় কথা হলো, প্রান্তিক কৃষকরা দেশ থেকে টাকা পাচার করেন না। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত প্রণোদনার অর্থ কৃষকদের হাতে পৌঁছে দেয়াকে আমরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। এরই মধ্যে রাকাব লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি কৃষিঋণ বিতরণ করেছে।










