বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনে তার পদত্যাগ দাবি করেছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। একই সঙ্গে প্রো-ভিসি, রেজিস্ট্রার ও ট্রেজারারের পদত্যাগও দাবি তাদের। পদত্যাগ ইস্যুতে ৬ আগস্ট থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে চলছে লাগাতার আন্দোলন। চলমান পরিস্থিতিতে ভিসি, প্রো-ভিসি ও শীর্ষ কর্মকর্তারা অফিসে না আসায় সব ধরনের কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ূন আখতারকে ২০২১ সালের ৩০ জুন উপাচার্য পদে নিয়োগ দেয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে নিয়োগ লাভের পরই তিনি জড়িয়ে পড়েন অনিয়ম ও দুর্নীতিতে। বিভিন্ন পদে অনুগত লোকদের নিয়োগ দেয়া শুরু করেন টাকার বিনিময়ে। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে তখন থেকেই তার বিরুদ্ধে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। তবে চাকরি হারানোর ভয়ে কেউই তখন মুখ খোলেননি। ৬ আগস্ট থেকে তারা লাগাতার বিক্ষোভ-কর্মসূচি পালন করছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ব্যানারে সাত দফা দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়।
এ ব্যাপারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বাউবি শাখার সমন্বয়ক মো. মিরাজ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের সাত দফা দাবি এখন এক দফায় পরিণত হয়েছে। সেটা হচ্ছে, ভিসি, প্রো-ভিসি, রেজিস্ট্রার, ট্রেজারার, ডিন ও আঞ্চলিক প্রধানদের পদত্যাগ। এ প্রশাসন আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত। তাদের প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল ওই সরকারকে টিকিয়ে রাখা। ভিসি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিগত সংসদ নির্বাচনে বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে ২০০ কোটি টাকা আওয়ামী লীগ সরকারের তহবিলে পাচার করেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ভিসি আমাদের রাজাকার বলে আখ্যায়িত করেন। আমরা আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছি বলে তারা আমাদের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেন। আইন বিভাগের অনার্স সার্টিফিকেট ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ক্ষুণ্ন করেন ভিসি। টাকার বিনিময়ে দলীয় লোকদের নিয়োগ দিয়েছেন। এজন্য তাদের পদত্যাগ দাবি করছি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শ্রেণীর শিক্ষার্থী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আমাদের দাবি নিয়ে ভিসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করার চেষ্টা করলে, তিনি দেখা করেননি। বুধ ও বৃহস্পতিবার আমরা বিক্ষোভ করেছি। ভিসির রুমের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছি। এ সময় ভিসির অনুগতরা আমাদের হয়রানি করে এবং হুমকিও দেয়। আমরা অবিলম্বে ভিসি, প্রো-ভিসি ও তার অনুগত সবার পদত্যাগ দাবি করছি। অন্যথায় উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য ওনারাই দায়ী থাকবেন।’
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস বিভাগের ডিন অধ্যাপক ড. মো. মইনুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা ৬ আগস্ট ভিসির সঙ্গে দেখা করে পদত্যাগের জন্য অনুরোধ করেছিলাম। অথচ তিনি ছাত্র ও শিক্ষকদের বিভিন্ন দাবি পাশ কাটিয়ে তার অনিয়ম-দুর্নীতি আড়াল করতে বিপুল পরিমাণ ফাইল সরিয়ে নিয়েছেন। গত শুক্রবারও তার অনুগত লোকদের দিয়ে বিভিন্ন ফাইল ও কাগজপত্র সরিয়ে নেন। ভিসি অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন। বর্তমানে সুবিধাবাদী কিছু কর্মকর্তা ভিসির পক্ষ নিয়ে আন্দোলনকারীদের হয়রানি করছেন। শিক্ষকদের সঙ্গে ট্রেজারার অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন। আজকের মধ্যে ভিসি ও তার অনুগতরা পদত্যাগ না করলে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া হবে।’
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন আঞ্চলিক প্রধান জানান, ভিসি তার পদে বহাল থাকার জন্য কৌশল অবলম্বন করছেন। কিছু শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বাউবির এফডিআর ভেঙে ১৪১ কোটি টাকা হাউজ লোন দেবেন বলে লোভ দেখিয়েছেন। লোভে পড়ে কিছু শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী ভিসির পক্ষ নিয়েছেন। ৭ আগস্ট থেকে বিশ্ববিদ্যালয় অচল হয়ে পড়েছে। তার পরও ভিসি আত্মগোপনে থেকে বিভিন্ন পদে অনলাইনে ভাইভার মাধ্যমে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের চেষ্টা করছেন।
এসব বিষয় জানতে প্রোভিসি মাহবুবা নাসরিনকে একাধিকবার তার মুঠোফোনে কল করলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। পরে ভিসি ড. সৈয়দ হুমায়ূন আখতারের মোবাইল ও হোয়াটস অ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।
তবে যোগাযোগ করা হলে ট্রেজারার অধ্যাপক মোস্তফা আজাদ কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আন্দোলন শুরু হলে ভিসি, প্রো-ভিসিসহ অন্যরা দুদিন অফিস করেছিলেন। আমি নিয়মিত অফিসে আসছি। ভিসি ও প্রো-ভিসি না আসায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজকর্মে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।’










