কুমিল্লার শ্রীকাইল গ্যাস ফিল্ডের চারটি কূপে কম্প্রেসর বসানো-সংক্রান্ত চলমান প্রকল্পটি বাতিল করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল-গ্যাস কোম্পানি বাপেক্স। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করার কারণ দেখিয়ে কোনো ধরনের কারিগরি ও আর্থিক ব্যাখ্যা ছাড়াই শুধু বিলম্ব ও প্রকল্পের ধীরগতির কথা জানিয়ে প্রকল্পটি বাতিল করা হয়। এতে একদিকে যেমন শ্রীকাইলের গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে, তেমনি এ প্রকল্পে চুক্তিবদ্ধ হওয়া রোমানিয়ান কোম্পানি এসসি ইউরো গ্যাস সিস্টেমস এসআরএলকে ১৫ দশমিক ৯২ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
গত ৮ জানুয়ারি ‘ইউরো গ্যাস সিস্টেমস’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বরাবর চিঠি পাঠিয়ে চুক্তি বাতিলের বিষয়টি জানিয়ে দেয় বাপেক্স। সংস্থাটির কোম্পানি সেক্রেটারি ও জেনারেল ম্যানেজার মনজুরুল হকের সই করা ওই চিঠিতে ইউরো গ্যাসের বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গ ও চুক্তির যথাযথ শর্ত প্রতিপালন না করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। চুক্তি বাতিলের ওই চিঠিতে ইউরো গ্যাসকে দেয়া বাপেক্সের গত বছরের ২৩ নভেম্বর চিঠির চুক্তিভঙ্গের বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়।
গত বছরের ২৩ নভেম্বর বাপেক্স এসসি ইউরো গ্যাস সিস্টেমস এসআরএলকে একটি চিঠি দেয়, ওই চিঠিতে বাপেক্স ইউরো গ্যাসকে জানায়, কম্প্রেসর স্থাপন প্রকল্পে চুক্তি অনুযায়ী গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর শ্রীকাইলে কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাজ বন্ধ থাকা ও প্রকল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয় ইউরো গ্যাস। চিঠিতে বাপেক্স আরো উল্লেখ করে, বাংলাদেশে ইউরো গ্যাসের প্রতিনিধিরা গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে শ্রীকাইল প্রকল্পে কার্যক্রম পূর্বঘোষণা ছাড়াই বন্ধ করে দেয়। সেই সঙ্গে দুটি লটে প্রকল্পের মালামাল দেয়া হলেও বাকি মালামাল কবে সরবরাহ করা হবে, তা ইউরো গ্যাসের কাছে জানতে চেয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
তবে ভিন্ন একটি সূত্র থেকে জানা যায়, প্রকল্পে কী কারণে বিলম্বিত হচ্ছে এবং প্রকল্পের বাকি কাজ কোন পর্যায়ে রয়েছে তা বাপেক্সের চিঠি দেয়ার পর গত ১৯ ডিসেম্বর ইউরো গ্যাস চিঠি দিয়ে বাপেক্সকে অবহিত করে।
বাপেক্সকে দেয়া ইউরো গ্যাসের ওই চিঠিতে বলা হয়, প্রকল্পের সিভিল কাজ ৭০ শতাংশ শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট কাজ শেষ করার জন্য বাপেক্সের কাছে মৌখিক ও লিখিত অনুমতি চেয়েও পায়নি ইউরো গ্যাস। সেই সঙ্গে প্রকল্পে ইউরো গ্যাস ১০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে সেই বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। প্রকল্পের ডিজাইন-সংক্রান্ত ৮১টি ট্রান্সমিটার জমা দেয়া হয়েছে। বহু নথিপত্র বাপেক্সের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাখিল করা যায়নি। সেই সঙ্গে দেশে প্রকল্পের মালামাল সাইটে পৌঁছনোর পর ঋণপত্রের শর্ত অনুযায়ী, ৮০ শতাংশ অর্থ পরিশোধের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ৭০ শতাংশ অর্থ পাওয়া গেছে। বাকি ১০ শতাংশ এখনো পাওয়া যায়নি বলে ইউরো গ্যাস চিঠিতে উল্লেখ করে। ওই চিঠিতে ইউরো গ্যাস প্রকল্পের সময়সীমা ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ জানায় বাপেক্সকে। সেই সঙ্গে প্রকল্পের জন্য কেনা মালামালে বিদেশী কোম্পানিগুলোর কাছে বিনিয়োগ, স্থানীয় প্রকল্পে বিনিয়োগ ও নকশায় বিনিয়োগের বিষয়টি চিঠিতে তুলে ধরে। সেই সঙ্গে এলসি লঙ্ঘনের প্রবণতা, স্থানীয় বিল পরিশোধে বিলম্বের বিষয়টি প্রকল্প বিলম্বিত হওয়ার কারণ হিসেবে তুলে ধরে ইউরো গ্যাস।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বাপেক্সের শ্রীকাইল গ্যাস ফিল্ডের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান শিকদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা প্রকল্পটি বাতিলের বিষয়টি জানিয়ে তাদেরকে একটা চিঠি দিয়েছি। তারা আমাদের একটা উকিল নোটিস পাঠিয়েছে। চুক্তি বাতিলের আগে কাজের অগ্রগতিসহ নানা বিষয় নিয়ে তাদের আমরা চিঠি দিয়েছিলাম, কিন্তু সেই চিঠির উত্তর মেলেনি।’
শ্রীকাইল প্রকল্পে স্থানীয় কাজের সিংহভাগ শেষ হয়েছে, প্রকল্পের প্রয়োজনীয় মালামালেরও ক্রয়াদেশ দেয়া হয়েছে। এ মুহূর্তে প্রকল্পটি কেন বাতিল করা হলো এবং পুনরায় কোম্পানির কাজ পাওয়ার সুযোগ কতটুকু—এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘আমরা চাই কাজটা হোক। কিন্তু উনাদের নিজেদের থেকে আমরা (বাপেক্স) দীর্ঘ সময় জোরালো কোনো রেসপন্স পাইনি। যদি তারা কাজ করতে চায় তাহলে তাদেরকে চিঠিপত্রের মাধ্যমে আসতে হবে। আমরা বিষয়টি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বোর্ডে তুলব। এরপর যে সিদ্ধান্ত আসবে তা বাস্তবায়ন করা হবে।’
অভিযোগ রয়েছে, কারিগরি ও আর্থিক ব্যাখ্যা ছাড়া প্রকল্পটি বাতিল করে তৃতীয় কোনো পক্ষকে কাজ দেয়া হতে পারে। এজন্য তড়িঘড়ি করে প্রকল্পটি বাতিল করে দ্রুত টেন্ডারের মাধ্যমে নতুন করে কোনো পছন্দের কোম্পানিকে কাজ দেয়ার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে এসসি ইউরো গ্যাস সিস্টেমস এসআরএলকের স্থানীয় প্রতিনিধি মুনিরুল হুদা ভূঞা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাপেক্সের কম্প্রেসর-সংক্রান্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলাম এবং আমাদের প্রিন্সিপালও (ইউরো গ্যাস সিস্টেমস) কাজটি করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। স্থানীয় পর্যায়ে প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এ প্রকল্পে আমরা আনুমানিক ৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো বাপেক্স চুক্তিতে নির্ধারিত এমিকেবল সলিউশন বা আরবিট্রেশন প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সরাসরি প্রকল্পটি টার্মিনেট (বাতিল) করেছে। ফলে আমাদের বিনিয়োগকৃত বিপুল অর্থ বর্তমানে তীব্র ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছে। এ আকস্মিক টার্মিনেশনের কারণে আমাদের চলমান ক্রয় প্রক্রিয়া, আর্থিক বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক কার্যক্রম এবং প্রিন্সিপালের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
শ্রীকাইল গ্যাস ক্ষেত্রের চারটি কূপ ২, ৩, ৪ এবং ইস্ট-১ থেকে গ্যাস উত্তোলন বাড়াতে ২০২৩ সালের মার্চে টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হয়। ২০২৪ সালের মার্চে পারচেজ অর্ডার দেয়া হয়। এ প্রকল্পটির কাজ শেষ করার কথা ছিল ১৪ মাসের মধ্যে। প্রকল্পের মাধ্যমে শ্রীকাইল গ্যাস ফিল্ডের উৎপাদন ধরে রাখা, প্রক্রিয়াজাত প্লান্ট ও ট্রান্সমিশন লাইনে প্রয়োজনীয় ইনলেট চাপ বজায় রাখার জন্য প্রকল্পটির আওতায় ১০ এমএমএসসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন তিনটি ন্যাচারাল গ্যাস ওয়েলহেড কম্প্রেসর বসানোর কথা ছিল ইউরো গ্যাসের।
জানা গেছে, প্রকল্পটির জন্য নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করা হলে ব্যয় আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হবে। পাশাপাশি এটি বাস্তবায়নে অতিরিক্ত অন্তত আড়াই বছর সময় লাগতে পারে। বিকল্প হিসেবে নতুন কূপ খননের পথ আরো দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল, যা সম্পন্ন করতে তিন-চার বছর সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে বর্তমান চুক্তিটি ফাস্ট-ট্র্যাক ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হলে এক বছরের মধ্যেই দেশীয় গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিষয়টি নিয়ে জানতে বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ফজলুল হকের সঙ্গে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।










