দেশের বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে ২০১৬ সালে একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে সরকার। ওই পরিকল্পনায় ২০৪১ সাল পর্যন্ত বছরভিত্তিক বিদ্যুৎ চাহিদার একটি প্রক্ষেপণ করা হয়। সেখানে চলতি বছর বিদ্যুৎ চাহিদার (পিক ডিমান্ডের ভিত্তিতে) যে প্রক্ষেপণ করা হয় তার প্রায় ২১ শতাংশের কম বিদ্যুতের চাহিদা তৈরি হয়েছে। বিগত বছরগুলোয়ও বিদ্যুৎ চাহিদার প্রক্ষেপণ ও প্রকৃত চাহিদার মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা গেছে। 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনায় দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধির কথা বলা বলেও সেটি বাড়েনি। ব্যাপক হারে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার সম্ভাবনা থেকেও চাহিদা বৃদ্ধির কথা বলা হয় মহাপরিকল্পনায়। তবে এর বাস্তবায়ন হয়নি। যে কারণে বিদ্যুতের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী চাহিদা বাড়ানো যায়নি। পাশাপাশি বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনার সঙ্গে জিডিপির বিষয়টিও জড়িত। যে হারে দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল, সেই হারে বাড়েনি।

যদিও বিদ্যুৎ খাতের এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন করে এবং 

বিদ্যুতের পাশাপাশি জ্বালানির পরিকল্পনাকে সংযুক্ত করে নতুন করে ‘ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টার (আইইপিএমপি)-২০২৩’ প্রণয়ন করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা থেকে জানা গেছে, ২০২৩ সালে বিদ্যুৎ চাহিদার প্রক্ষেপণ করা হয় ১৭ হাজার ৭৯ মেগাওয়াট। সেখানে গত ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদ্যুতের সর্বোচ্চ গড় সরবরাহ ১৩ হাজার ৫৫৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ প্রক্ষেপণের চেয়ে প্রকৃত চাহিদা প্রায় ২১ শতাংশ কম হয়েছে। ২০২২ সালে বিদ্যুৎ চাহিদার প্রাক্কলন ছিল ১৫ হাজার ৭৪৬ মেগাওয়াট, এর বিপরীতে প্রকৃত চাহিদা ছিল ১২ হাজার ৭৯১ মেগাওয়াট। ২০২১ সালে চাহিদার প্রক্ষেপণ ছিল ১৪ হাজার ৪৬০ মেগাওয়াট, সেখানে প্রকৃত চাহিদা দাঁড়িয়েছিল ১৩ হাজার ৫৫৪ মেগাওয়াটে। বিদ্যুতের এ চাহিদা জিডিপির প্রবৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হলেও আদৌ তা প্রক্ষেপণ অনুযায়ী মেলাতে পারেনি বিদ্যুৎ বিভাগ।

দেশে বিদ্যুতের চাহিদা তৈরির পেছনে সবচেয়ে বড় পরিকল্পনা ছিল শিল্প খাতের উন্নয়ন ও বিস্তৃতি। কিন্তু গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন হলেও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি। যে কারণে গ্রিডে বিদ্যুতের সরবরাহ ও ক্যাপাসিটি সক্ষমতা তৈরির পরও শিল্প মালিকরা এ বিদ্যুৎ ব্যবহার করেনি। সরকারের কাছ থেকে গ্যাস নিয়ে নিজস্ব ক্যাপটিভ চালিয়ে কারখানা সচল রেখেছে। অন্যদিকে সরকার দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। কিন্তু এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে লক্ষ্যমাত্রা ও চাহিদা অনুযায়ী বিনিয়োগ আসেনি। যে কারণে বাড়েনি শিল্পায়ন। কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় যথাসময়ে বিদ্যুৎ চাহিদা তৈরি করা যায়নি।

দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রক্ষেপণ অনুযায়ী তৈরি না হওয়ার পেছনে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়াকে মূল কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে ভোক্তাদের মাঝে ব্যবহারের প্রবণতা কমে গিয়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রক্ষেপণ অনুযায়ী না হওয়ায় বড় সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। বিশেষ করে সার্বক্ষণিক চালু রাখতে হয় (বেইজ লোডভিত্তিক) এমন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অর্ধেক সক্ষমতাও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশে বাণিজ্যিক উৎপাদনে থাকা বৃহৎ সক্ষমতার (১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের ওপরে) বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর অধিকাংশই বর্তমানে অর্ধেক সক্ষমতায়ও চলছে না। চট্টগ্রামের এসএস পাওয়ার, মহেশখালীর মাতারবাড়ী, রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। দেশে বর্তমানে ৭ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বেইজ লোডভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে।

বিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়বে এমন পরিকল্পনাকে সামনে রেখে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা ২৬ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হয়েছে। এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগকে। দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বেরিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় বড় বড় শিল্প খাত হুমকিতে রয়েছে। 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিদ্যুৎ খাতের প্রক্ষেপণ যথাযথ ছিল না। এ প্রক্ষেপণ অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুতের ব্যাপক হারে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি এসব কেন্দ্র চালানোর মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি কোথা থেকে আসবে তার সংস্থানের কথা চিন্তা করা হয়নি। জিডিপিকে সামনে রেখে বিদ্যুতের এসব পরিকল্পনা দাঁড় করানো হয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিটাকে বরাবরই বেশি দেখানো হয়েছে। আর এটার ওপর নির্ভর করেই আমরা বিদ্যুৎ খাতের সক্ষমতা ব্যাপক হারে তৈরি করেছি, আমদানিনির্ভরতা বাড়িয়েছি। বিদ্যুৎ খাতের এ মহাপরিকল্পনাগুলো ঠিকমতো কাজ করেছে কিনা তা মাঝপথে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেগুলো করা হয়নি।’

সরকারের বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ‘পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যান-২০১৬’-এর প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৩০ সালে দেশে ৪০ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রায় বছরভিত্তিক বিদ্যুতের পিক ডিমান্ডে কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা তৈরি হবে, তা নিরূপণ করা হয়। 

বিদ্যুৎ চাহিদার প্রক্ষেপণ অনুযায়ী প্রকৃত চাহিদা বাড়েনি এ বিষয়টি মানতে নারাজ বিদ্যুতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেল। সংস্থাটির দাবি, প্রক্ষেপণ অনুযায়ী বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে, হয়তো কিছু কম। তবে আনুপাতিক হারে বেড়েছে।

পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌বিদ্যুতের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী চাহিদা বাড়েনি বিষয়টি এমন নয়। বেড়েছে, তবে তা প্রক্ষেপণের চেয়ে কিছুটা কম। তবে রেশিও (উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে চাহিদা) অনুযায়ী হিসাব করলে আবার ঠিক আছে। আর যেটি হয়নি, তা হলো শিল্পের গ্রাহকরা গ্রিড লাইনের বিদ্যুৎ নেয়ার কথা ছিল, কিছু গ্রিডের বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন নয় বলে তারা ক্যাপটিভ পাওয়ার ব্যবহার করেছে। এ কারণে শিল্পে বিদ্যুতের যে চাহিদা ছিল, সেটি যদি তারা গ্রহণ করত তবে ঠিক ছিল। নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনে কিন্তু তারা গ্যাস নিচ্ছে, ফলে সেটিকেও এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।’