চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাত্র ৪৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে, টাকার অংকে যা ১ লাখ ২ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। গত এক দশকে কখনই অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এত কম এডিপি বাস্তবায়ন হয়নি। আবার করোনাভাইরাস মোকাবেলাসহ দুর্যোগের এ সময়েও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ব্যয় বাড়েনি। প্রথম ১০ মাসে তারা বরাদ্দের মাত্র ২৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

চলতি অর্থবছরে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (আরএডিপি) বরাদ্দ ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর সঙ্গে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা করপোরেশন নিজস্ব অর্থায়নে ১১ হাজার ৬২৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে এডিপি বাস্তবায়ন করবে। ফলে সংশোধিত এডিপির মোট আকার ২ লাখ ৯ হাজার ২৭১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এ বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৪৯ শতাংশ, যা গত অর্থবছরের করোনাকালের চেয়ে কম। গত অর্থবছরের একই সময়ে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল ৯৮ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের হার ছিল ৪৯ দশমিক ১৩ শতাংশ।

করোনাকালে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নেয়ার কথা ছিল স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের। সেজন্য বরাদ্দও বাড়ানো হয়। কিন্তু তারা সেটি বাস্তবায়নে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। চলতি অর্থবছর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অধীন বরাদ্দ ছিল ১১ হাজার ৯৭৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, যা মোট এডিপি বরাদ্দের প্রায় ৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। তবে গত এপ্রিল পর্যন্ত তারা ব্যয় করতে পেরেছে ৩ হাজার ৪৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। ফলে অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ব্যয় হয়েছে মোট বরাদ্দের মাত্র ২৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় প্রকাশিত এ তথ্যের বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) মো. হেলাল উদ্দিনকে ফোন করা হলে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। মন্ত্রণালয়ের এডিপির মাসিক বৈঠকে এ নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বাস্তবায়নহীনতার বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি লিখিত আকারে প্রশ্ন দিতে বলেন। এরপর সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় মতামত দেবে বলে জানান।

তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অধীন ৩০টির বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এক্সপানশন অব ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতাল, এস্টাবলিশমেন্ট অব ৫০০ বেডেড হসপিটাল অ্যান্ড অ্যানসিলারি ভবন ইন যশোর, কক্সবাজার, পাবনা। নোয়াখালীতে আব্দুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজ ও জননেতা নুরুল হক আধুনিক হাসপাতাল, সুনামগঞ্জে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন। এছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ ও পুনর্নির্মাণের জন্য ব্যয় প্রাক্কলনসহ মহাপরিকল্পনা ও ডিজাইন প্রণয়ন, বিভাগীয় শহরে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার চিকিৎসা ইউনিট স্থাপন, সিরাজগঞ্জে শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ ও ৫০০ শয্যার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থাপন।

এছাড়া চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর উন্নয়ন কর্মসূচি (এইচপিএনএসডিপি), ম্যাটারনাল, নিওনেটাল, চাইল্ড অ্যান্ড এডোলেসেন্ট হেলথ কেয়ার (এমএনসিএএইচ) প্রকল্পটি ৭১৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন হচ্ছে। ৪০৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ব্যয়ে কভিড-১৯ ইমারজেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস প্রকল্প, ৪৪১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয়ে কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ ও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল স্থাপন, মানিকগঞ্জ প্রকল্প। ১ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে এইচপিএনএসডিপি (কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ার) প্রকল্প ও ৮১০ কোটি টাকা ব্যয়ে এইচপিএনএসডিপি (হসপিটাল সার্ভিস ম্যানেজমেন্ট) প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

এর পরও কেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ব্যয় বাড়েনি তা জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বণিক বার্তাকে বলেন, কভিডের কারণে মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রমে কিছুটা বাধা এসেছে। তবে সব বাধা জয় করে আমরা প্রকল্পগুলোকে এগিয়ে নেয়ার সব ধরনের চেষ্টা করছি। বছর শেষে সফলতা আসবে বলেও প্রত্যাশা করেন তিনি।

কেবল স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ নয়, বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অর্থ ব্যয়ে অদক্ষতায় শতভাগ এডিপি বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কেননা চলতি অর্থবছরে শতভাগ এডিপি বাস্তবায়নের লক্ষ্য অর্জনে আগামী দুই মাসে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করতে হবে।

এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বণিক বার্তাকে বলেন, গত কয়েক বছর আমরা ৯৫ শতাংশের কাছাকাছি এডিপি বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছি। করোনা মহামারীর কারণে গত অর্থবছর ও চলতি অর্থবছরে কাজ কিছুটা কম হয়েছে। এডিপিভুক্ত প্রকল্পগুলোর গতি বাড়াতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে আমরা চিঠি পাঠিয়েছিলাম। এডিপির অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। সব প্রকল্পের কাজই চলমান থাকায় অর্থবছর শেষে বাস্তবায়নের হার ৯০ শতাংশের বেশি হবে এমনটা আশা করছি।

শেষ সময়ে এসে এডিপি বাস্তবায়নে মানহীনতার প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু সংস্কার করা প্রয়োজন। তদারকিতে আরো বেশকিছু প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। তবে এডিপি বাস্তবায়ন এখন কম দেখানোর কারণ হলো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সব বিল এখনো পরিশোধ না করা। শেষ সময়ে এসে কিছুটা তাড়াহুড়ো করা হয়। কিন্তু সেটি শুধুই অর্থ ছাড়ে। কাজের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের মানহীনতা নেই। আমরা সংশ্লিষ্টদের কাজের মান কঠোরভাবে তদারক করি। মানসম্মতভাবেই প্রকল্পের ভৌতকাজ সম্পন্ন করা হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্যমতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপিতে মোট ১ হাজার ৭৮৫টি প্রকল্প। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ১ হাজার ৬৪০টি, কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ১৪৫টি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা করপোরেশনের ১০১টি প্রকল্পসহ ২০২০-২১ অর্থবছরে এডিপির মোট প্রকল্প ১ হাজার ৮৮৬টি। বাস্তবায়নে পিছিয়ে থাকা মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের বাস্তবায়নের হার ৫ দশমিক ৭১ শতাংশ, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ১৫ দশমিক ৬৪, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের ১৯ দশমিক ২৩, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ২২ দশমিক ৬২, আইন ও বিচার বিভাগ ২৩ দশমিক ৯৪, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ২৬ দশমিক ৫৫, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ২৯ দশমিক ১৫ এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় ২৯ দশমিক ৯০ শতাংশ।

এছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ৩০ দশমিক ১৪ শতাংশ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৩০ দশমিক ৫৬, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের ৩১ দশমিক ৩২, বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন ৩৩ দশমিক শূন্য ৫, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ৩৩ দশমিক ৯০, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ৩৪ দশমিক ৬৪, খাদ্য মন্ত্রণালয় ৩৬ দশমিক ২০, সুরক্ষা সেবা বিভাগ ৩৭ দশমিক ১৬, জননিরাপত্তা বিভাগ ৩৭ দশমিক ৫৬ ও অর্থ বিভাগের ৩৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়নে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। তাদের এডিপি বাস্তবায়নের হার ৭৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ। আইএমইডি ৭০ দশমিক ৫৭ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ৬৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে। এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ৬৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ ৬৯ দশমিক শূন্য ৯, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুুক্তি (আইসিটি) বিভাগ ৬৬ দশমিক ৬২, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ৬৩ দশমিক ৬৬ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন ৬৩ দশমিক ১২ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে।