বর্ষার আগে চাঁদপুরে দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। সদর উপজেলার বাগাদী ইউনিয়নের উত্তর নানুপুর এলাকায় ডাকাতিয়া নদীর ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙনের তীব্রতা ক্রমেই বাড়ছে। এছাড়া ধনাগোদা নদীর প্রায় ছয় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দীর্ঘদিন ধরেই বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। ৩৫টি ড্রেজার দিয়ে বালি উত্তোলনের ফলে ভাঙন দেখা দিয়েছে নদীর তীরে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বসতবাড়িসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
নদীপাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, চাঁদপুর বড় স্টেশন মোলহেড দিয়ে মেঘনায় মিলিত হয়েছে ডাকাতিয়া নদী। হঠাৎ করেই নদীর তীরে ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙনের কবলে পড়েছে নানুপুরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রাম। এরই মধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকার বেশকিছু বাড়িঘর ও ফসলি জমি। ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়ে সদর উপজেলার উত্তর নানুপুর গ্রামে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো মানববন্ধন করেছে।
ভাঙনের শিকার শাহজাহান পাটোয়ারী বলেন, ‘নদীর পাশে ফসলি জমি ছিল। কৃষক সেখানে ফসল আবাদ করতেন। নদীভাঙনে জমিগুলোর এমন অবস্থা হয়েছে, আগামী বছর আর জমি থাকবে না। জমিগুলো বিলীন হয়ে গেলে কৃষকের সংসার চলবে কীভাবে?’
নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত রওশন আরা বেগম বলেন, ‘দুই দশক ধরে আমাদের ঘরবাড়ি ডাকাতিয়া নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কাছে গেলেও ভাঙন প্রতিরোধে তারা এগিয়ে আসেন না। এখন সন্তানদের নিয়ে আমরা কোথায় যাব, কী করব বুঝতে পারছি না। সরকার যদি নদীভাঙন প্রতিরোধে এগিয়ে আসে, তাহলে আমাদের ভিটে রক্ষা পাবে।’
এ ব্যাপারে চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সদর উপজেলার ডাকাতিয়া নদীর বেশ কয়েকটি স্থান ভাঙনপ্রবণ। ভাঙন রোধে স্থায়ী কাজ বাস্তবায়নে একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, যা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এটি অনুমোদন হলেই ভাঙন রোধে কাজ করা হবে।’
অন্যদিকে চাঁদপুরের ষাটনল অঞ্চল দিয়ে মতলব উত্তর ও গজারিয়ার মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে ধনাগোদা নদী। প্রায় ছয় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দীর্ঘদিন ধরেই বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। ৩৫টি ড্রেজার দিয়ে বালি উত্তোলনের ফলে ভাঙন দেখা দিয়েছে নদীর তীরে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বসতবাড়িসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
নদীপাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল, কালীপুর, চান্দ্রাকান্দি, বেলতলী, কালির বাজার, নবীপুর, হাঁপানিয়ার বেশ কয়েকটি স্থানে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ভাঙন বাড়ছে।
খাগুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মিয়া মঞ্জুর আমীন স্বপন বলেন, ‘ধনাগোদা নদীর ভাঙনে খাগুরিয়া, হাঁপানিয়া ও নবীপুর এলাকার অনেক পরিবার এরই মধ্যে জমি হারিয়ে পথে বসেছে। কখন যে ঘরবাড়ি, স্কুল, মসজিদ, হাটবাজার, ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে যায়, এ নিয়ে আমরা আতঙ্কে রয়েছি। মেঘনা-ধনাগোদা বেড়িবাঁধও ঝুঁকিতে রয়েছে।’
নদীতে গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ২৫ মার্চ চারটি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এতে ১৭টি ড্রেজার, ১১টি বাল্কহেড, দুটি স্পিডবোট, দুটি ইঞ্জিনচালিত নৌকাসহ ৪০ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। প্রশাসনিক তৎপরতা থাকলে দিনের বেলায় বন্ধ রাখা হয় বালি তোলার কাজ। তবে রাতে প্রভাবশালীরা বালি উত্তোলন করছে। বালি উত্তোলন নিয়ে গত বছরের ২২ অক্টোবর বাবলা বাহিনীর প্রধান বাবলা খুন হন।
এ বিষয়ে মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা কুলসুম মনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ধনাগোদা নদীর বালি উত্তোলন বন্ধে আমরা অভিযান পরিচালনা করছি। সেচ প্রকল্প ও এর তীর রক্ষায় অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
নতুন করে ষাটনলসংলগ্ন মেঘনা নদী থেকে ধনাগোদার প্রবেশমুখে চরকালিপুরা ও চর ষোলআনী এলাকায় বালুমহাল ইজারা দেয়া হচ্ছে, যা মতলবের সীমানা ঘেঁষা হওয়ায় ষাটনল, কালীপুর, বেলতলীসহ বেশকিছু অঞ্চল ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়বে বলে জানান ষাটনল ও কালীপুর এলাকার বাসিন্দারা।
কালীপুর বাজারসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘হঠাৎ নদীভাঙনের ফলে এ অঞ্চলের মানুষ আতঙ্কে রয়েছে। ভাঙন এত তীব্র আকার ধারণ করবে আমরা ভাবতেও পারিনি।’
ষাটনল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ফেরদাউস আলম জানান, বালি উত্তোলন বন্ধসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় বালুমহাল ইজারা দেয়া মতলবের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে মেঘনা-ধনাগোদা পানি ফেডারেশনের সভাপতি রাসেল ফয়েজ আহমেদ চৌধুরী শাহীন বলেন, ‘বালি উত্তোলনের কারণে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ সেচ প্রকল্প হুমকির মুখে। এছাড়া নদীর তীরবর্তী কয়েকটি অঞ্চলে বিলীন হচ্ছে বাড়িঘর ও ফসলি জমি।’
ধনাগোদা নদীর কালীপুর, খাগুরিয়া, হাঁপানিয়া, নবীপুরসহ কয়েকটি অঞ্চলে ভাঙন দেখা দিলেও প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেই। তবে নদীর তীর ও সেচ প্রকল্প রক্ষায় বালি উত্তোলন বন্ধের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে বলে জানিয়েছেন সেচ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সেলিম শাহেদ।










