আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য ৭৩টি স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থার তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গত ২৮ সেপ্টেম্বর কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশিত তালিকায় ঝিনাইদহ সদর উপজেলার তিনটি সংস্থার নাম রয়েছে। তবে এসব সংস্থার মধ্যে কোনোটির অস্তিত্বই মেলেনি। কোনোটি আবার দুই কক্ষের অফিসের একটি বিউটি পার্লার হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে।
কমিশনের তালিকায় থাকা এসব সংস্থার একটি সদর উপজেলার বিষয়খালী এলাকার আলোকিত সমাজ কল্যাণ সংস্থা। সরজমিনে দেখা গেছে, ২০০১ সালে একটি আবাসিক ভবনে সংস্থাটির যাত্রা শুরু হয়। পরে লোকসানে পড়ে ২০০৯ সালের দিকে মালিকানা বিক্রি করে দেয়া হয় কালীগঞ্জের এক আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতার কাছে। এরপর আর বাজারটিতে সংস্থার কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি। বিষয়খালী, খড়িখালী, ছোট খড়িখালী কোনো গ্রামে গিয়ে পাওয়া যায়নি সংস্থার অফিস। সংস্থার নির্বাহী প্রধান রোখসানা খাতুনের এলাকাতেও খোঁজ মেলেনি কোনো কার্যালয়ের।
বিষয়খালী বাজারের ব্যবসায়ী দবির আলী ও খড়িখালী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল্লাহ বলেন, বাজারের একটি আবাসিক ভবনে আলোকিত সমাজ কল্যাণ সংস্থার কার্যালয় ছিল, যা প্রায় ১৭ বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রামেও এইসংস্থার কাজ আছে বলে শুনিনি, তাদের সংস্থাও দেখিনি।
আলোকিত সমাজ কল্যাণ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ইমদাদুল হক পিন্টু বলেন, ‘লোকসানে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দিয়েছিলাম। এরপর আর কোনো কার্যক্রম আছে বলে আমার জানা নেই।’
মহারাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খুরশিদ আলম বলেন, ‘অনেক আগে আলোকিত সমাজ কল্যাণ সংস্থার কার্যক্রম ছিল। ঋণদানের কাজ হতো। বহু বছর তাদের কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ে না। নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষক তালিকায় এমন নামসর্বস্ব সংস্থার নাম আসা দুঃখজনক। তারা নিজেরাই কখনো নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেনি। তাহলে তাদের দিয়ে কতটুকু কাজ আশা করা যায়।’
জেলা শহরের চাকলাপাড়া এলাকার অ্যাসোসিয়েশন ফর সোসিওইকোনোমিক অ্যাডভান্সমেন্টও (এসিয়া) রয়েছে কমিশনের তালিকায়। তবে চাকলাপাড়ায় গিয়ে দেখা গেছে, একটি আবাসিক ভবনের নিচতলায় ঝুলছে সংস্থাটির সাইনবোর্ড। অন্য পাশে বিউটি পার্লারের সাইনবোর্ড। নিচতলার দুটি কক্ষের একটিতে বসে ছিলেন সংস্থার নির্বাহী প্রধান আনোয়ার হোসেন। এ দুটি কক্ষকেই তারা অফিস বলে দাবি করলেও গত এক বছর একটি কক্ষ ব্যবহার হচ্ছে বিউটি পার্লার হিসেবে।
একই এলাকার হ্যাভেন সামাজিক উন্নয়ন সংস্থাও রয়েছে নির্বাচন পর্যবেক্ষকের তালিকায়। সংস্থার নির্বাহী প্রধানের নিজ মালিকানাধীন ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষ অফিস হিসেবে ব্যবহার হয়। এ সংস্থারও নির্বাহী প্রধান ও সভাপতি আনোয়ার হোসেন নিজেই। কক্ষটি বন্ধ ছিল। দুটি অফিসের মধ্যে শুধু এসিয়া অফিসের একটি কক্ষে আনোয়ার হোসেনকে বসে থাকতে দেখা গেছে। তবে তার পরিচালিত দুটি অফিসের একটিতেও অন্য কোনো সদস্যকে পাওয়া যায়নি।
আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি নিজেই দুটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছি। আমাদের সদস্য ২৮ জন। তবে আমি ছাড়া কারো নির্বাচন পর্যবেক্ষণের কোনো অভিজ্ঞতা নেই।’
অভিজ্ঞতা ছাড়া তারা কীভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন আর নিজের মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠান পর্যবেক্ষকের তালিকায় স্থান পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে কমিশন থেকে প্রশিক্ষণ দেবে, তাতেই চলবে। সদস্যরা শিখে নিবেন। কমিশন তালিকা চেয়েছিল, আমরা আবেদন করে সেই তালিকায় স্থান পেয়েছি। সময় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।’
নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন পর্যবেক্ষক নীতিমালায় বলা হয়েছে, গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে কাজ করছে এবং নিবন্ধিত গঠনতন্ত্রের মধ্যে এ বিষয়সহ সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে নাগরিকদের মধ্যে তথ্য প্রচার ও উদ্বুদ্ধকরণের অঙ্গীকার রয়েছে, কেবল সেসব বেসরকারি সংস্থা নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা হিসেবে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে পারবে।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহ সদর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জুয়েল আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন ঢাকা থেকে পর্যবেক্ষক সংস্থার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়। সেভাবেই সংস্থাগুলো আবেদন করে। এখানে জেলা অফিসের কোনো ভূমিকা নেই।’










