বিপর্যয়ে দেশের জ্বালানি খাত। দেখা দিয়েছে তীব্র গ্যাস সংকট। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে শেল অয়েলের মালিকানায় থাকা পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র ক্রয়ের মাধ্যমে দেশের গ্যাস খাতের নিজস্ব ভিত্তি তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলনে দূরদর্শিতার অভাবে সংকট ঘনীভূত হয়েছে অনেক বেশি। দেশের গ্যাস খাত নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিকের আজ দ্বিতীয় পর্ব
বাংলাদেশ থেকে গ্যাস রফতানি করা নিয়ে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বড় ধরনের বিতর্ক শুরু হয় ২০০০ সালের দিকে। সে সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছিল, বাংলাদেশের গ্যাস রফতানি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। এমনকি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন রফতানি প্রক্রিয়ায় চাপ সৃষ্টি করতে বাংলাদেশ সফর করছেন বলেও নানা মহলে আলোচনা ওঠে। তবে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের ওই সফরে গ্যাস রফতানি-সংক্রান্ত প্রত্যক্ষ অনুরোধ কিংবা পরোক্ষভাবে চাপ প্রয়োগের বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়নি।
বিল ক্লিনটনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনের নথিতেও গ্যাস রফতানি প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের গণতন্ত্র, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি মিশনে কাজ করা বাংলাদেশী ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী নাগরিকদের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেছেন। তবে গ্যাস রফতানির প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্যাসের স্থানীয় চাহিদা পুরোপুরি মেটানোর পর এবং ভবিষ্যতে গ্যাসের ব্যবহার বিবেচনায় আগামী ৫০ বছরের মজুদ রাখার বিষয়টি তুলে ধরেন। এরপর উদ্বৃত্ত থাকলে গ্যাস রফতানির কথাও বলেন। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে একই ধরনের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার এবং সেগুলো উন্নয়নের মাধ্যমে গ্যাসের স্বচ্ছ ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলেন। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হলে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করার কথা ব্যক্ত করেন।
গ্যাস খাতে যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক দেশের বহুজাতিক কোম্পানি বরাবরই এ দেশে বিনিয়োগ করেছে। তবে সেই বিনিয়োগ দ্রুত উঠিয়ে নেয়ার জন্য তারা গ্যাস রফতানির বিষয়টি নিয়ে ওই সময় নীতিনির্ধারণী মহলে নানা প্রস্তাব দেয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের মুখপাত্র ও পাবলিক ডিপ্লোমেসি শাখার কাউন্সিলর শন ম্যাকিনটোশ বণিক বার্তাকে বলেন, জাতীয় স্বার্থ ঠিক রেখে অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য পরিচালনায় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে যুক্তরাষ্ট্র।
বাংলাদেশের গ্যাস মজুদ ও ব্যবহার নিয়ে নব্বইয়ের দশকে নানা ধরনের মতপার্থক্য তৈরি হয়। সে সময় বিভিন্ন তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানির জিওলজিক্যাল সার্ভে তুলে ধরে বক্তব্য দেয়া হয়। তৎকালীন শেল বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এন্ড্রুভন জানান, বাংলাদেশে প্রকৃত গ্যাসের মজুদ ৩৮ টিসিএফ। মার্কিন সরকারের অনুমান অনুসারে ৫৫ টিসিএফ। তবে এসব অনুমাননির্ভর বক্তব্যের মধ্যেই মার্কিন কোম্পানি অক্সিডেন্টাল সিলেটের কাফনায় বৃহৎ গ্যাসের মজুদ আবিষ্কারের একটি খবর প্রচার করে। এ কারণে সে সময় বাংলাদেশের গ্যাস মজুদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮০ টিসিএফের মতো। যদিও পরে খবরটি ভুয়া হিসেবে দেশের মূল ধারার গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ পায়।
বাংলাদেশের গ্যাস রফতানি নিয়ে ১৯৯৯ সালে রাজনৈতিক দলগুলোর নানা ধরনের সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়। সে সময় অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) সঙ্গে সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ দেশের চাহিদা না মিটিয়ে রফতানি করা যাবে না বলে মত দেন। তখন মার্কিন তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি শেল, ইউনোকল প্রতিনিধি থেকে শুরু করে বিদেশী রাষ্ট্রদূতরা বিভিন্ন সভা-সেমিনার করে দ্রুত গ্যাস রফতানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চাপ প্রয়োগ করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর হাতে দেশের তেল-গ্যাস সম্পদ তুলে দেয়ার প্রতিবাদে ২০০০ সালের ১ ও ৩ মার্চ তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি কর্মসূচি পালন করে। সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্টকে খুশি করতে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর স্ববিরোধী অবস্থানকে রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
২০০০ সালের ১৪ মার্চ ক্লিনটনের সফরের আগে মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে তিনটি পিএসসির (উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি) জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। সম্ভাব্য রাজনৈতিক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে গ্যাস ব্লক উৎপাদন বণ্টন চুক্তি হয়নি। এমনকি ক্লিনটনের সফরের সময় পিএসসি স্বাক্ষর না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ হন।
বিল ক্লিনটনের সফরে যৌথ সংবাদ সম্মেলনের নথিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের গ্যাস রফতানি প্রসঙ্গে স্থানীয় চাহিদা পূরণ এবং ৫০ বছরের মজুদ নিশ্চিত করার কথা তুলে ধরেন। এরপর উদ্বৃত্ত গ্যাস রফতানি করবে বাংলাদেশ। নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, আবিষ্কার ও উন্নয়নের কাজ চলছে। এ গ্যাসের যথাযথ ব্যবহার আগে নিশ্চিত করা হবে। এরপর গ্যাসভিত্তিক জ্বালানি রফতানি নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক কোনো প্রস্তাব এলে সেটিকে স্বাগত জানানো হবে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৮ সালে জ্বালানি খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ স্বাক্ষরের ফলে যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশের তেল-গ্যাস অন্বেষণে নিয়োজিত মার্কিন কোম্পানিগুলোকে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতার সুযোগ দেয়। এরই অংশ হিসেবে ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জির প্রিন্সিপ্যাল ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারির নেতৃত্বে সে সময় একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে। তখন বাংলাদেশের গ্যাস রফতানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে জোরালো প্রচেষ্টা ছিল মার্কিন কোম্পানি ইউনোকলের। বিশেষ করে দেশে বৃহৎ একটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে কীভাবে বিনিয়োগ তুলে নেয়া যায় সেই প্রচেষ্টা ছিল তাদের। এজন্য তারা গ্যাস রফতানির পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে গ্যাস রফতানির ব্যাপারে আন্তর্জাকিত চাপ ছিল। মার্কিন কোম্পানি ইউনোকল ১৯৯৭ সালে বিবিয়ানায় যখন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে তখন তারা চিন্তা করল বাংলাদেশে গ্যাসের চাহিদা কম, স্বল্প চাহিদা ও গ্যাসের মূল্য বিবেচনায় তাদের বিনিয়োগ তুলতে বহু সময় লাগবে। সেজন্য ইউনোকল দ্রুত তাদের বিনিয়োগ তুলে নেয়ার জন্য ভারতে গ্যাস রফতানির প্রস্তাব দেয়। এজন্য বাংলাদেশ থেকে দিল্লি পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ পরিকল্পনা করেছিল। একই সঙ্গে তারা রিপ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে প্রস্তাব দেয়।
একই ধরনের বক্তব্য দেন তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের গ্যাস রফতানির জন্য সে সময় মার্কিন বিভিন্ন কোম্পানি, দেশের মন্ত্রী, আমলা, বিভিন্ন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও দূতাবাসও জোরালো তত্পরতা চালিয়েছিল। বাংলাদেশে চাহিদার তুলনায় গ্যাসের ব্যবহার কম, এজন্য গ্যাস রফতানি করে আর্থিক সক্ষমতা তৈরি করতে হবে এমন প্রপাগান্ডা জোরালো হচ্ছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার কাজটি করতে পিছু হটেছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের পর দেশে গ্যাসের মজুদ ও ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক চলমান থাকে। পেট্রোবাংলার তথ্যানুসারে, নব্বইয়ের দশকে গ্যাসের মজুদ বৃদ্ধির সাফল্য পরবর্তী দশকগুলোয় রফতানি বিতর্ক ওঠার পরে আর ধরে রাখা যায়নি। গত দুই দশকে দেশে নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করে বা বিদেশী কোম্পানির অংশগ্রহণে গ্যাসের মজুদ বাড়ানো গিয়েছে সামান্যই। বিশেষজ্ঞরা অনেকেই মনে করেন, গ্যাস রফতানির বিতর্ক দেশের জ্বালানি নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।










