নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর অন্যান্য শিল্পের মতো ইস্পাত খাতেও নেমে এসেছিল বড় ধাক্কা। হঠাৎ করে অবকাঠামো নির্মাণকাজ থমকে যাওয়ায় চাহিদার সংকটে পড়েছিল এ শিল্প। তবে জুন থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে থাকে ইস্পাত শিল্প। কিন্তু করোনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই নতুন করে কাঁচামালের ধাক্কা এসে পড়েছে এ খাতে।

কভিড পরিস্থিতিতে কিছুদিন কড়াকড়ি থাকার পর বিধিনিষেধ শিথিল হতে শুরু করলে ইস্পাত খাতের উদ্যোক্তারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল মেল্টিং স্ক্র্যাপ (পুরনো লোহার টুকরো) আমদানি বাড়িয়ে দেন। কিন্তু এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়ে যায় ইস্পাতের কাঁচামালের দাম।

রড তৈরিতে প্রাথমিক কাঁচামাল হিসেবে অপরিহার্য উপাদান মেল্টিং স্ক্র্যাপের বেশির ভাগই উন্নত দেশ থেকে আমদানি করা হয়। কাস্টমসের আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বছরে গড়ে ৪৫ লাখ টন মেল্টিং স্ক্র্যাপ আমদানি হচ্ছে। এর বাইরে সর্বোচ্চ আট-নয় লাখ টন জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ড ও স্থানীয়ভাবে মেল্টিং স্ক্র্যাপের সরবরাহ পাওয়া যায়। অর্থাৎ চাহিদার সিংহভাগই আমদানিনির্ভর।

বিশ্বব্যাপী চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দামও বেড়ে গেছে ইস্পাতের কাঁচামালের। আবার চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহও পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় ইস্পাত খাতে নেতৃত্ব দেয়া বিএসআরএম, আবুল খায়ের গ্রুপ, কেএসআরএম, রহিম স্টিল, জিপিএইচ, আনোয়ার ইস্পাত, আরএসআরএমসহ প্রথম সারির সব কোম্পানি এ সংকটে পড়েছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে একটা সময়ে কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম সীমিত করে আনতে হতে পারে এসব প্রতিষ্ঠানের।

ইস্পাত শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, কভিড-১৯ সময় ও তার আগে আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম ছিল টনপ্রতি ২৬০-৩০০ ডলার। কিন্তু বর্তমানে দাম বেড়ে প্রতি টন ৩৮০-৪০০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। তবে আরো বড় সংকট হচ্ছে, এলসি খুললেও অনেক ক্ষেত্রেই এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না কাঁচামালটির। বাতিল করে দেয়া হচ্ছে আগে থেকেই দেয়া বুকিং। এক্ষেত্রে রফতানিকারকরা ভিন্ন কোনো অজুহাত দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালন তথ্য অনুযায়ী, বন্দরের জেটিতে খালাসের হার সবচেয়ে বেশি গত তিন মাসে (আগস্ট-অক্টোবর)। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি হ্যান্ডলিং হয়েছে বিএসআরএমের চালান। দেশের শীর্ষস্থানীয় এ ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের আনা মোট ২ লাখ ৩৩ হাজার ১৩৩ টন মেল্টিং স্ক্র্যাপ হ্যান্ডলিং হয়েছে।

বিএসআরএম গ্রুপের অধীনে আট কারখানা মিলে বছরে রড উৎপাদনক্ষমতা ১৬ লাখ টন। আর বিলেট উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ২০ লাখ টন। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এ বিলেট তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহে সংকটে পড়েছে দেশের ইস্পাত খাতের নেতৃত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানটি।

বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে মেল্টিং স্ক্র্যাপের উৎপাদন, সরবরাহ কম হয়েছে। চীনে হঠাৎ করে প্রস্তুত ইস্পাতের চাহিদা বড় পরিসরে বেড়েছে। আজকের বাজারে মেল্টিং স্ক্র্যাপের যে দাম ছিল তাতে আমরা কিনতে ব্যর্থ হয়েছি। ৩৯০ ডলার ছাড়িয়েছে মেল্টিং স্ক্র্যাপের দাম। কভিড-১৯ সময় ও তার আগে এর দাম ছিল ২৬০-৩০০ ডলার। করোনার সময় স্থানীয় বাজারে যেখানে মেল্টিং স্ক্র্যাপের দাম প্রতি টন ২৬ হাজার টাকা ছিল, সেটা এখন ইয়ার্ডে প্রায় ৩৬ হাজার টাকা দরে বিক্রি করছে। বলতে হবে খুবই খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছি আমরা।’

বিএসআরএমের পর পরই আবুল খায়ের গ্রুপের ৯৪ হাজার ৩০৭ টন, জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের ১৫ হাজার ৫১৮ টন ও কেএসআরএমের আমদানি হওয়া ৭ হাজার ৪৬৪ টন পুরনো লোহা হ্যান্ডলিং হয়েছে গত তিন মাসে।

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইস্পাত পণ্যের উৎপাদন ও চাহিদা বছরে প্রায় ৫৫ লাখ টন। তবে জিপিএইচসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কারখানা সম্প্রসারণ পদক্ষেপে সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা এখন ৯০ লাখ টন। আগামী দুই বছরের সম্ভাব্য চাহিদা হিসাব করে আগে থেকেই সক্ষমতা তৈরি করে রেখেছেন উদ্যেক্তরা। করোনা পরিস্থিতিতে জুন ও জুলাই মাসে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। সেই সঙ্গে কাঁচামাল আমদানি কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়ে। পরে আগস্ট, সেপ্টেম্বর থেকে ভালো পরিসরে ইস্পাত কাঁচামাল আমদানি হতে থাকে। উৎপাদন ব্যবস্থা উন্নতি হতে থাকলে অক্টোবরে ৭০ শতাংশ ও নভেম্বরে ৮০ শতাংশে উৎপাদন ফিরে আসে। তবে বাংলাদেশের মতো বিশ্বব্যাপী চাহিদা হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে ইস্পাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক কাঁচামাল মেল্টিং স্ক্র্যাপের মূল্য বৃদ্ধি পেতে থাকে।

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও মেগনাম স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহিরুল হক চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, কভিড পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছি। দেশে ভারী এ শিল্প খাতে এখনো সক্ষমতা অনুযায়ী ৩০ শতাংশের বেশি অব্যবহূত রয়েছে। করোনার সময়ে কারখানা চালু হতে থাকলে চলতি মাস পর্যন্ত উৎপাদন ৮০ শতাংশ ওভারকাম করতে পেরেছে দেশের ইস্পাত খাত। কাঁচামাল আমদানিতেও এ ইতিবাচক চিত্র উঠে এসেছে। তবে সম্প্রতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সংকটে পড়েছে ইস্পাত খাত।

ইস্পাত খাতের অন্যতম শীর্ষ উৎপাদকারী কেএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার জাহান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন স্ক্র্যাপের দাম ১০০ ডলারের বেশি বেড়েছে। এর থেকে বড় বিপদ হলো কাঁচামালই তো পাচ্ছি না। কঠিন একটি পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছি। সহসা এর থেকে বেরিয়ে আসারও কোনো পথ খোলা দেখছি না। কারখানা কার্যক্রম সীমিত এমনকি বন্ধ রাখার পদক্ষেপও নিতে হতে পারে সামনে।’

একই ধরনের সংকটের কথা জানিয়েছেন আবুল খায়ের গ্রুপ ও আনোয়ার ইস্পাত সংশ্লিষ্টরাও। আনোয়ার ইস্পাতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মানোয়ার হোসেন এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের কাছে এখন যে স্টিল আছে এর কস্টিং প্রতি টনে গড়ে ৬০ হাজার টাকা। আনোয়ার ইস্পাত (টিএমটি গ্রেড) এখন টনপ্রতি ৫৮ হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে। লং স্টিল দ্রুত বাড়ার মূল কারণ হলো আন্তর্জাতিক বাজারে মেল্টিং স্ক্র্যাপ ১২০ ডলার বেড়েছে। করোনা পরিস্থিতি থেকে যখন রিকভারি করতে থাকব তখন থেকে এ সংকট তৈরি হয়েছে। সামনে ডিমান্ড যাই থাকুক সাপ্লাই ৫০ শতাংশ কমে যেতে পারে।

উদ্যোক্তাদের শঙ্কা, কতজন কারখানা চালাতে সক্ষম হবে সামনে সেটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতি এখন এলসি দিয়ে রেখেছি। এর বিপরীতে কাঁচামাল পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা। অনেক কারখানায়ই এখন এক মাসের বেশি রিজার্ভ নেই। পাইপলাইনে যেখানে তিন-চার মাসের কাঁচামাল থাকার কথা সেখানে অর্ধেকও মিলবে কিনা তা নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েছে।

জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) মোহাম্মদ আলমাস শিমুল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের এখন বছরে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় পাঁচ লাখ টনের চেয়ে কিছুটা কম। ধারাবাহিকভাবে এটা ১০ লাখ টনে উন্নীত হবে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আমরা ভালো একটা অবস্থান তৈরি করতে যাচ্ছি। কাঁচামাল পাওয়ার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সংকট উদ্বেগ তৈরি করেছে।’