আইন অনুযায়ী একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হলেন উপাচার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তত্ত্বাবধানের কাজটি তিনিই করেন। নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও বোর্ড অব ট্রাস্টির (বিওটি) সঙ্গে বড় ভূমিকা রাখেন উপাচার্য। যদিও বেসরকারি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিওটি সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব ধরে রাখতে গিয়ে উপাচার্যদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিচ্ছেন না তারা। এমনকি পছন্দসই লোককে ‘ডামি’ উপাচার্য বানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণেরও অভিযোগ রয়েছে ট্রাস্টিদের বিরুদ্ধে।

এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপাচার্য ড. শাহজাহান খান। অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ডের এ অধ্যাপক বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য পদে নিয়োগ পান গত বছরের নভেম্বরে। যদিও গত কয় মাসে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা কিংবা নীতিনির্ধারণে ড. শাহজাহানের দৃশ্যমান কোনো উপস্থিতি দেখা যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, নিজেদের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে অস্ট্রেলিয়ায় পূর্ণকালীন কর্মরত এ অধ্যাপককে ‘ডামি’ উপাচার্য হিসেবে ব্যবহার করছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির বিওটি সদস্যরা।

একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা যায় বেসরকারি আরো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিরা একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ধরে রাখতে নিজেরাই উপাচার্য হতে চান। উপাচার্য প্যানেলে তিনটি নাম দেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এজন্য নিজেদের নামের সঙ্গে অনেক সময় ‘ডামি’ প্রার্থী হিসেবে আরো দুটি নাম দেয়া হয়। অনেক ট্রাস্টিকে নিজের নাম অনুমোদন করিয়ে আনতে বেশ দৌড়ঝাঁপ করতেও দেখা যায়। শেষমেশ নিজের নাম অনুমোদন করিয়ে আনতে ব্যর্থ হলে অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যের কাছ থেকে নিয়োগের আগেই পদত্যাগপত্র গ্রহণের ঘটনাও ঘটেছে। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রপতির নিয়োগ দেয়া ব্যক্তিকে যোগদান করতে দিলেও দৈনন্দিন প্রায় সব বিষয়েই উপাচার্যদের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন ট্রাস্টিরা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বণিক বার্তাকে বলেন, আইন অনুযায়ী প্যানেল প্রস্তাবের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদিও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিরা তাদের একক নিয়ন্ত্রণ রাখতে সে প্রক্রিয়ায় যেতে চান না। কমিশনের পক্ষ থেকে চাপ থাকায় অনেক সময় নামমাত্র প্যানেল বা নামমাত্র উপাচার্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা হচ্ছে। সব ধরনের নিয়ন্ত্রণ থাকছে ট্রাস্টিদের হাতেই।

তিনি আরো বলেন, বেসরকারি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যই স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ না পেয়ে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। ট্রাস্টিরা যদি উপাচার্যের সব কাজে খবরদারি করেন, তাহলে তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয় সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় উপাচার্যকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।

এশিয়ান ইউনিভার্সিটির ঘটনা অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত বছরের নভেম্বরে নিয়োগ পাওয়ার পর দেশে এসে সশরীরে উপাচার্য পদে যোগ দেন ড. শাহজাহান খান। যদিও এ সময় অস্ট্রেলিয়ায় যে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন, সেখান থেকে তিনি পদত্যাগ করেননি। যোগ দেয়ার কিছুদিন পরই দেশ ছাড়েন ড. শাহজাহান। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ফেরেননি তিনি। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ডে পড়াচ্ছেন। অর্থাৎ একই সঙ্গে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণকালীন চাকরি করছেন তিনি। ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ডের ওয়েবসাইটে গিয়েও এর প্রমাণ মেলে। সেখানে বর্তমানে ডাটা অ্যানালাইসিস ও পরিসংখ্যানবিষয়ক বেশ কয়েকটি কোর্স পড়াচ্ছেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষের দাবি, অধ্যাপক শাহজাহান খান ও বিওটির মধ্যে করা চুক্তি অনুযায়ী, তিনি বছরে দু-একবার বাংলাদেশে এসে শুধু একাডেমিক সনদে স্বাক্ষর করে যাবেন। আর সমাবর্তন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলে তিনি সেখানে অংশ নেবেন। বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য ড. শাহজাহানের অস্ট্রেলিয়ার মোবাইল নম্বরে ফোন করা হলেও তা রিসিভ করা হয়নি।

তবে এশিয়ান ইউনিভার্সিটির একজন কর্মকর্তা নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, উপাচার্য স্যার বিওটির কাছ থেকে ছুটি নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন। ছুটি শেষে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করবেন।

কাগজে-কলমে উপাচার্যের দায়িত্ব পালনের আরেকটি নজির মেলে রাজধানীর ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটিতে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক মো. আলীম দাদ। যে প্যানেল প্রস্তাবনায় তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়টির বিওটির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মকবুল আহমেদেরও নাম ছিল। তবে উপাচার্য পদে অধ্যাপক মো. আলীম দাদ নিয়োগ পেলেও এখনো সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণের কাজটি অধ্যাপক ড. মকবুল আহমেদই করছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ড. মকবুল আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, আমি প্রতিষ্ঠাকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির পেছনে শ্রম, সময় ও অর্থ দিয়ে আসছি। এখন বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি পর্যায়ে চলে এসেছে। রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক আলীম দাদকে নিয়োগ দিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত ভালো মানুষ। তিনি তার দায়িত্ব পালন করছেন। ট্রাস্টি বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় দেখভালের দায়িত্ব রয়েছে। আমি সেটি পালন করছি।

আইন অনুযায়ী, বেসরকারি বিওটি উপাচার্য নিয়োগের জন্য আচার্য (রাষ্ট্রপতি) বরাবর তিনজনের নাম প্রস্তাব করে একটি প্যানেল পাঠায়। এরপর আচার্য এ পদে নিয়োগ দেন। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে।

অভিযোগ রয়েছে, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উপাচার্য নিয়োগের প্যানেল পাঠানোর সময় পছন্দের ব্যক্তির পাশাপাশি ‘ডামি ক্যান্ডিডেটের’ নামও প্রস্তাব করা হয়। যদি বিওটির পছন্দের বাইরের কাউকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেন, তখন ওই ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে গড়িমসি করা হয়। এমনকি রাষ্ট্রপতির নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যকে যোগদান করতে না দিয়ে পদত্যাগেও বাধ্য করা হয়। ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি খুলনায় (এনইউবিটিকে)। গত বছর প্যানেল প্রস্তাবনার ভিত্তিতে এ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। যদিও নিয়োগ পাওয়া উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়টিতে যোগদান না করে উল্টো পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগ দেয়া উপাচার্যকে যোগদান করতে না দিয়ে উল্টো তার কাছ থেকে পদত্যাগপত্র নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তার পদত্যাগের পর সেখানকার প্রতিষ্ঠাকালীন একজন ট্রাস্টি বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ বণিক বার্তাকে বলেন, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগ দেয়ার পরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে তা আইন অনুযায়ী বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ রয়েছে। কমিশন এ ধরনের অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্য কী উপায়ে ও কতদিন বিদেশে অবস্থান করতে পারবেন, সেটি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তাই এ ধরনের সমস্যা সমাধানে কমিশনের কিছু নীতিপ্রণয়নের কাজও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

অনেক সময় উপাচার্যদের পক্ষ থেকে কাজের স্বাধীনতা না থাকার অভিযোগও তোলা হয়। বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ড. বিশ্বজিৎ চন্দ বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য, উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারারের কাজের ক্ষেত্র আলাদা করে দেয়া আছে। তাই স্বাধীনতার বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যের ব্যক্তিত্বের ওপর নির্ভর করে। তবে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রাস্টি বোর্ড অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, এ ধরনের অভিযোগ আমাদের কাছেও আসে।