সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশে এ মুহূর্তে চালের যথেষ্ট মজুদ রয়েছে। তবু ভরা মৌসুমেও কমছে না চালের দাম। উল্টো মিলগেট, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দাম বেড়েই চলেছে। এমন পরিস্থিতিতে খাদ্যশস্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে চলতি অর্থবছরের পাশাপাশি আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং ওএমএস কার্যক্রম প্রায় ১৩ শতাংশ বাড়িয়ে নির্ধারণ করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। যার মাধ্যমে ১৬ লাখ টনেরও বেশি খাদ্যশস্য সাশ্রয়ী মূল্যে বিক্রি করা হবে। এছাড়া নতুন অর্থবছরে আমদানি ও অভ্যন্তরীণভাবে ৩৩ লাখ ৪০ হাজার টন খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা হবে বলেও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

সব মিলিয়ে যাবতীয় কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আগামী অর্থবছর বরাদ্দ বাড়িয়ে ২১ হাজার ৬২১ কোটি ২০ লাখ টাকা চেয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। চলতি অর্থবছরের বাজেটে তাদের বরাদ্দের পরিমাণ ১৯ হাজার ৮৯৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা। আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ দাবি ও বিভিন্ন কার্যক্রমের তথ্য উল্লেখ করে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে বিভিন্ন খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং ওএমএস কার্যক্রমের মাধ্যমে কম দামে মোট ১৪ লাখ ৩০ হাজার টন খাদ্যশস্য বিক্রি করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯ লাখ ১৩ হাজার টন চাল এবং ৫ লাখ ১৭ হাজার টন গম। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৯ লাখ ৬০ হাজার ৯৬৪ টন খাদ্যশস্য বিক্রি করা হয়েছে। যার মধ্যে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং ওএমএস কার্যক্রমের আওতায় বিক্রি করা হয়েছে ৬ লাখ ৫৯ হাজার ৯৫১ টন চাল এবং ৩ লাখ ১ হাজার ১৩ টন গম।

এদিকে চলতি বছরের চেয়ে ১ লাখ ৮০ হাজার টন অর্থাৎ প্রায় ১৩ শতাংশ বাড়িয়ে আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং ওএমএস কার্যক্রমের মাধ্যমে ১৬ লাখ ১০ হাজার টন খাদ্যশস্য বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গিয়েছে, এর মধ্যে ১০ লাখ ৬০ হাজার টন চাল এবং ৫ লাখ ৫০ হাজার টন গম বিক্রি করা হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের জন্য খাদ্যনিরাপত্তায় যথেষ্ট পরিমাণ মজুদ ধরে রাখার পাশাপাশি খাদ্যশস্যের বাজার যেন অস্থির না হয়ে যায়, সে বিষয়ে কাজ করে মন্ত্রণালয়। গত অর্থবছরে সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মজুদ বেশি ছিল না, কিন্তু এবার মজুদ ভালো। তাই এবার মজুদের বিষয়ে না ভেবে সংগৃহীত খাদ্যশস্য বিতরণের মাধ্যমে মূল্য যেন সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায়, তার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। খাদ্যশস্যের মজুদ ভালো থাকায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় আরো বেশি পরিবারকে নিয়ে আসতে চাই আমরা। সেজন্য ৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৬০ লাখ পরিবারকে খাদ্যসহায়তা দেয়ার প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া আগামী অর্থবছরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং ওএমএস কার্যক্রমের আওতায় খাদ্যশস্য বিক্রির পারিমাণ বাড়ানোর সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে।

সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও ভরা মৌসুমে চালের দাম কমছে না কেন, এমন প্রশ্নে সচিব বলেন, বাজারে মোটা চালের দাম বাড়েনি। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ার কারণে আমাদের সরু চাল খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। কিন্তু সে অনুযায়ী সরু চলের উৎপাদন বাড়েনি। তাই এ চালের দাম বেড়েছে। এজন্য আমরা কৃষি মন্ত্রণালয়কে সরু চালের আবাদ বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছি।

মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম বিষয়ে ওই চিঠিতে আরো বলা হয়, পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুদ, সংরক্ষণ, খাদ্যের মান পরীক্ষাসহ দেশে সুষ্ঠু খাদ্যনিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করতে কাজ করে খাদ্য মন্ত্রণালয়। খাদ্য পরিকল্পনা, গবেষণা ও পরিধারণ বিষয়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে খাদ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে চুক্তি সম্পাদন ও যোগাযোগ স্থাপনও করা হয়। এছাড়া নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩-এর আওতায় গৃহীত সব কার্যক্রম বাস্তবায়নেও কাজ করা হয়।

এদিকে সারা দেশে বিদ্যমান বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার আওতায় মোট ৫০টি খাদ্য পরীক্ষাগারের তথ্য সংবলিত একটি ল্যাব ডাইরেক্টরি তৈরি করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। আধুনিক খাদ্য সংরক্ষণাগার নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের আওতায় সারা দেশে আধুনিক মানের ৫ লাখ ৩৫ হাজার টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন স্টিল সাইলো নির্মাণকাজ চলমান। একই সঙ্গে ডিজিটাল পাবলিক ফুড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম চালুর কাজও এগিয়ে চলছে।

পাশাপাশি দেশের কৌশলগত স্থানে নতুন খাদ্য গুদাম ও আনুষঙ্গিক সুবিধাদি নির্মাণ, সারা দেশে পুরনো খাদ্যগুদাম ও আনুষঙ্গিক সুবিধাদি মেরামত ও নতুন অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। খাদ্যশস্যের পুষ্টিমান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রিমিক্স কার্নেল মেশিন ও ল্যাবরেটরি স্থাপন এবং নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে ধান শুকানো, সংরক্ষণ ও আনুষঙ্গিক সুবিধাসহ আধুনিক ধানের সাইলো নির্মাণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।

এত উদ্যোগের পরও চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারার কারণ হিসেবে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবকে দুষছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন সরকার বিভিন্ন সময়ে নানা বিষয়ে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে কিন্তু সময়মতো সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে না। তাছাড়া যেকোনো সমস্যা সমাধানে স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করে সাময়িক সমাধানের দিকেই বেশি নজর দিচ্ছে সরকার। কোনো একটা সমস্যার সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি তেমন কোনো পরিকল্পনা গ্রহণের নজির দেখা যায় না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. এম আসাদুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। এদিকে বোরো ও আমন ধানের ফলনও ভালো হয়েছে। তার পরও হু হু করে চালের দাম বাড়ছে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো অঘটন বা বিপর্যয়ও ঘটেনি, তার পরও চালের দাম বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। আমদানি করা যে পণ্য দেশের বাইরে থেকে আসে, সেগুলোর দাম বাড়তেই পারে। তবে পর্যাপ্ত উৎপাদন হওয়ার পরও চালের দাম বাড়বে কেন এটা আমরা বুঝতে পারি না।

লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হলেও সেগুলো যেন সময়মতো সংগ্রহ করে বিতরণ করা যায়, সেদিকে গুরুত্ব দেয়ার তাগিদ দিলেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, এসব ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি চিন্তা না করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এমন পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে কৃষক ন্যায্যমূল্য পায়, আবার ভোক্তারাও সহনীয় দামে খাদ্যশস্য কিনতে পারে। এজন্য সার্বিকভাবে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে খাদ্যশস্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সরকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারের গুদামে খাদ্যশস্যের মজুদ রয়েছে ১৯ লাখ ৮৫ হাজার টন। এর মধ্যে চাল ১৭ লাখ ২৪ হাজার টন, গম ২ লাখ ৩০ লাখ টন এবং ধান ৪৭ হাজার টন।

অন্যদিকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) সূত্রে জানা গেছে, গতকাল রাজধানীর বাজারে মোটা চাল বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ৪৬ থেকে ৫০ টাকায়। এক মাস আগে যা ছিল ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। গতকাল পাইজাম, লতাসহ অন্যান্য মাঝারি মানের চাল প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৫২ থেকে ৫৬ টাকায়। এক মাস আগে যা ছিল ৫২ থেকে ৫৫ টাকা। নাজিরশাইল, মিনিকেটসহ অন্যান্য সরু চাল বিক্রি হয়েছে ৬২ থেকে ৭০ টাকায়। এক মাস আগেও যা ছিল ৬০ থেকে ৬৮ টাকা।