তিন দশক আগে ১৯৯২ সালে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে মইজ্জারটেক এলাকায় কর্ণফুলী আবাসিক প্রকল্প গ্রহণ করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। ১৯৯৪ সালে এ প্রকল্পে ৫১৫ জনকে ৪৮৯টি প্লট বরাদ্দ দেয় সিডিএ। তবে প্লট বরাদ্দ দেয়ার প্রায় ৩০ বছর পরও প্রকল্প এলাকায় ভবন নির্মাণ দূরে থাক, কোনো নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেনি সিডিএ। প্লট বরাদ্দ পেয়েও সিডিএর অদূরদর্শিতায় প্রকল্পটি একটি পরিত্যক্ত জনপদে পরিণত হয়েছে। এদিকে প্লট বুঝে না পেয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্লটগ্রহীতারা। এরই মধ্যে মারা গেছেন প্লট মালিকদের এক-তৃতীয়াংশ ব্যক্তি। শুধু কর্ণফুলী আবাসিক নয়, সিডিএর এ রকম আরো অনেক আবাসন প্রকল্প এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করে বলেন, প্রকল্পগুলোয় যখন প্লট বরাদ্দ দেয়া হয় তখন জমির উচ্চমূল্যে ধরা হয়েছে। অনেকে সেই মূল্য বায়না দিয়ে বা কিস্তির মাধ্যমে পরিশোধ করে প্রকল্প এলাকায় বিভিন্ন সাইজের প্লট নিয়েছেন। কিন্তু বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও সেই প্লট বুঝিয়ে দেয়া হয় না। এমনকি গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেনি সিডিএ।

সিডিএর প্রকল্পগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত পাঁচ দশকের বেশি সময়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ১২টি আবাসন প্রকল্পের মাধ্যমে ৫ হাজার ১৪৩টি প্লট বাস্তবায়ন করে। এর মধ্যে অন্যতম আবাসন প্রকল্পগুলো হলো—কর্ণফুলী আবাসিক, কল্পলোক আবাসিক, অনন্যা আবাসিক (১ ও ২), সলিমপুর আবাসিক, চন্দ্রিমা আবাসিক এলাকা, ফৌজদারহাট পুনর্বাসন এলাকা, হালিশহর পুনর্বাসন এলাকা, কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকা, ষোলশহর পুনর্বাসন এলাকা। এসব প্রকল্প প্রণয়নের সময়ে (পিপি) বরাদ্দকৃত স্থানে নালা-নর্দমা, রাস্তাঘাট, খেলার মাঠ, কবরস্থান, মার্কেট, নিরাপত্তাবেষ্টনী, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ওয়াসার সুপেয় পানি সরবরাহ করাসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

এদিকে চট্টগ্রাম সিডিএর নেয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে কর্ণফুলী আবাসিক, অনন্যা আবাসিক (১ ও ২), সলিমপুর আবাসিক প্রকল্প এখনো আলোর মুখ দেখেনি। এছাড়া কল্পলোক আবাসিকে আবাসন গড়ে উঠলেও এখনো গড়ে ওঠেনি পূর্ণাঙ্গ সড়ক ব্যবস্থা।

সরেজমিন কর্ণফুলী আবাসিকে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৫০ একর জায়গার প্রকল্প এলাকায় কোনো ভবণ নির্মাণ করা হয়নি। পুরনো ইটের তৈরি সড়কে বড় গাছের শেকড় উঠে সেগুলোও নষ্ট হওয়ার পথে। প্লট এলাকায় কিছু ছোট ঘর থাকলেও সেখানে মাদকের কারবার চলে অহরহ। এমনকি কোনো সীমানাপ্রাচীরও নেই প্রকল্প এলাকায়। মূলত পানি এবং বিদ্যুৎ সংকটের কারণে এখানে কোনো আবাসিক স্থাপনা গড়ে ওঠেনি বলে জানায় স্থানীয়রা।

অনন্যা আবাসিক (১ ও ২) এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, এলাকাটিতে কোনো আবাসন এখনো গড়ে ওঠেনি। এছাড়া সলিমপুর আবাসিক এলাকার অবস্থাও একই।

কর্ণফুলী আবাসিকের নিরাপত্তারক্ষী মো. লোকমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই কর্ণফুলী আবাসিকের একই অবস্থা দেখে আসছি। এখন সিডিএর নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করি, কিন্তু কোনো আবাসন গড়ে উঠতে দেখিনি। প্লট মালিকরা অভিযোগ করে বলেন, কর্ণফুলী বা অনন্যা আবাসিক প্রকল্পে আবাসনের জন্য যখন প্লট বরাদ্দ দেয়া হয় তখন ভবিষ্যতের আশায় অনেকে ভিটেমাটি বিক্রি করে উচ্চমূল্যে প্লট ক্রয় করেছিলেন, কিন্তু সেটাই অনেকের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্ণফুলী আবাসিকে পানির জন্য অনেকবার সিডিএকে আমরা চিঠি দিয়েছি তারা আমাদের স্থায়ী সমাধান দিতে পারছেন না। অন্যদিকে পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন অনেকে। অন্যদিকে প্রকল্পগুলোর কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় অন্য কারো কাছে প্লট বিক্রি করতে পারছেন না তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর নদীর দক্ষিণ পাড়ে কর্ণফুলী (বামতীর) আবাসিক প্রকল্পটি ৫১৫ জনকে ৪৮৯টি প্লট বরাদ্দ দেয় সিডিএ। ১৯৯৪ সাল থেকে প্রকল্প এলাকায় প্রথম প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়। তিন ও চার কাঠা আয়তনের প্লটের প্রথম দফায় প্রতি কাঠার দাম ছিল ৮০ হাজার টাকা। পরে কাঠাপ্রতি দাম ছিল দেড় লাখ টাকা। কিন্তু দীর্ঘদিনেও সেখানে বসতি গড়ে ওঠেনি।

কর্ণফুলী প্লট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও প্লটগ্রহীতা মোহাম্মদ ইয়াছিন বণিক বার্তাকে জানান, সিডিএর কর্ণফুলী প্রকল্পটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। তিন দশক ধরে সেখানে পানির ব্যবস্থা করা হয়নি। এমনকি বিদ্যুৎ বা গ্যাসের কোনো লাইন দেয়া হয়নি। তবে চূড়ান্ত প্রস্তাবনা না দেয়ায় এখনো সেখানে আবাসন গড়ে ওঠেনি। যারা প্লট বরাদ্দ নিয়েছিলেন তাদের তিন ভাগের এক ভাগ মালিক মারা গেছেন। অনেকে মৃত্যুসজ্জায়। বিএনপি আমল থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের আমল পর্যন্ত আমরা চেষ্টা করে গেলাম। কিন্তু সিডিএ আমাদের আবাসন করে দিতে পারল না।

১৯৮৫-৯০ সালে সলিমপুর আবাসিক প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। সেখানে মোট প্লটের সংখ্যা ছিল এক হাজার ২৯টি। সেগুলোও পরে আলোর মুখ দেখেনি। এরপর বাকলিয়া কল্পলোক এলাকায় ২০০৫-০৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে এক হাজার ৭০০টি প্লট নিয়ে বাস্তবায়ন করা হয় কল্পলোক আবাসিক প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়, কিন্তু প্রকল্পটিতে আবাসন নির্মাণ শুরু হলেও এখনো আধুনিকায়ন হয়নি সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা।

২০০৭ প্রায় ৩৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সিডিএ অনন্যা আবাসিক এলাকা প্রকল্প গ্রহণ করে। এ প্রকল্পের আওতায় দুই ইউনিটে প্রায় ১ হাজার ৭০০ প্লট বরাদ্দ দেয়া হলেও এখনো আবাসন গড়ে ওঠেনি। এ অবস্থায় বায়েজিদ হাউজিং নামে আরো একটি নতুন আবাসন প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে সিডিএ।

নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বণিক বার্তাকে বলেন, সিডিএ প্রকল্প নেয়ার সময় তড়িঘড়ি করে, কিন্তু বাস্তবায়নের সময় সেটা থাকে না। নগরীতে আবাসন ব্যবস্থার সংকট আছে। সেখানে এত বড় বড় আবাসন প্রকল্প নিয়ে সেগুলো তারা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এটা সিডিএর চূড়ান্ত ব্যর্থতা বলে মনে করেন তিনি।

সিডিএ কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রামে সিডিএ থেকে অনেক বড় বড় আবাসন প্রকল্প হাতে নেয়া হলেও নানা জটিলতায় অনেকগুলো এখনো বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। সার্বিক প্রসঙ্গে সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস জানান, আমরা সিডিএর আবাসন প্রকল্পগুলো নিয়ে কাজ করছি। পুরনো মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী অনেক আবসন প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়নি। আমরা বিভিন্ন দফতরের সঙ্গে সমন্বয় করে অসমাপ্ত আবাসন প্রকল্পগুলোর বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেব।