চার বছর আগে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) পুনর্মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত হোল্ডিং ট্যাক্স বা পৌর কর বাস্তবায়নের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছিল সরকার। বর্তমানে এ স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। ফলে এখন থেকে আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করতে হবে নগরবাসীকে। বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রামে সিটি করপোরেশন এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, এ স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের ফলে সাধারণ মানুষের ব্যয় আরো বাড়ল। কভিডকালে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে তা নগরবাসীকে আরো কঠিন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেবে। স্বয়ং চসিক মেয়রও নির্বাচনের আগে হোল্ডিং ট্যাক্স না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় চসিককে হোল্ডিং ট্যাক্স না বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন নগরবাসী।
হোল্ডিং ট্যাক্স বা পৌর কর হলো ভবন ভাড়া এবং সড়ক বাতি ও আলোকায়নের জন্য নগরবাসীর থেকে আদায়কৃত কর। দ্য সিটি করপোরেশন ট্যাক্সেশন রুলস অ্যাক্ট ১৯৮৬-এর ২১ ধারা অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রতি পাঁচ বছরে একবার সব ধরনের স্থাপনার মাপ ও সংশ্লিষ্ট তথ্য সরেজমিন সংগ্রহ করে পৌর কর নির্ধারণের বাধ্যবাধকতা আছে। এ অনুযায়ী সাবেক মেয়র আ জ ম নাসির উদ্দিনের সময়ে ২০১৬ সালে গৃহ ও ভূমির পঞ্চবার্ষিক কর পুনর্মূল্যায়ন শুরু হয়। ওই বছরের মার্চ থেকে ২০১৭ সালের ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত দুই দফায় সরেজমিনে মূল্যায়ন কার্যক্রম চালানো হয়। পুনর্মূল্যায়ন শেষে তা ২০১৭ সালের ৩১ আগস্ট প্রকাশ করা হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২ হাজার ৫৪৭টি সরকারি হোল্ডিংয়ের বিপরীতে বার্ষিক গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৭৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৫৬ কোটি ২১ লাখ টাকা। অর্থাৎ ওই সময়ে বার্ষিক আদায় বাড়ে ২১৯ কোটি টাকা। তবে পুনর্মূল্যায়নের পর ১ লাখ ৮৫ হাজার ২৪৮টি হোল্ডিংয়ের বিপরীতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৮৫১ কোটি ৩০ লাখ ৬৪ হাজার ৫৫৯ টাকা পৌর কর আদায়ের প্রস্তাব করে চসিক।
এ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে নগরীতে আন্দোলন শুরু হলে চসিকের প্রয়াত মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরী এবং সাবেক মেয়র মনজুর আলম এর বিরোধিতা করেন। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন মন্ত্রী-এমপিরা। পরবর্তী সময়ে দেশের গৃহকর কার্যক্রম অটোমেশনের আওতায় না আসা পর্যন্ত এ পুনর্মূল্যায়নকৃত কর স্থগিতের সিদ্ধান্ত হয়। পরে ২০১৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর চসিকের তত্কালীন প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে স্থগিত হওয়া পুনর্মূল্যায়নের আলোকে পৌর কর আদায়ে প্রস্তাব দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ অক্টোবর সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নেয় মন্ত্রণালয়।
ব্যক্তিমালিকানাধীন হোল্ডিংয়ের জন্য করা পঞ্চবার্ষিক কর পুনর্মূল্যায়নের ওপর স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের জন্য ৩ জানুয়ারি চসিক থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিবকে চিঠি দেয়া হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়টি জানিয়ে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহীদুল আলমকে ১৮ জানুয়ারি চিঠি দিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। চিঠিতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম মহানগরীতে জনসাধারণ ১০ বছর আগের নির্ধারিত হারে কর পরিশোধ করছে। এতে চসিক বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জনসাধারণের নাগরিক সেবা ও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গতিশীল রাখাসহ সিটি করপোরেশনের আয় বৃদ্ধির স্বার্থে ব্যক্তিমালিকানাধীন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হোল্ডিংয়ের ওপর থাকা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হলো।
এ প্রসঙ্গে চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহীদুল আলম বলেন, মন্ত্রণালয়ের চিঠি পেয়েছি। পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। বিস্তারিত পরে জানানো হবে।
হোল্ডিং ট্যাক্স প্রত্যাহার নিয়ে চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন আন্দোলন করছে করদাতা সুরক্ষা পরিষদ। সংগঠনের নেতারা বলছেন, ১৯৯১ সালের বাড়ি ভাড়া আইন অনুযায়ী ১০ শতাংশ বাড়ানো যায়। অ্যাসেসমেন্টেও তেমন করা যেতে পারত। কিন্তু সেটা না করে চসিক শতভাগ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। আন্দোলনের মুখে পুনর্মূল্যায়নটি স্থগিত করা হয়েছিল। কিন্তু সরকার সে স্থগিতাদেশ এখন প্রত্যাহার করে নিল। সংগঠনের মুখপাত্র হাসান মারুফ রুমি বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমান মেয়র চসিক নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, তিনি নির্বাচিত হলে কোনো ট্যাক্স বাড়ানো হবে না। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে পঞ্চবার্ষিক কর পুনর্মূল্যায়নে অত্যধিক মাত্রায় নির্ধারিত গৃহকরের পক্ষে সিদ্ধান্ত জানানো হলো। এ সিদ্ধান্ত চট্টগ্রাম নগরীর মানুষের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। যদি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পুনর্মূল্যায়ন অনুযায়ী ট্যাক্স আদায় করা হয়, তাহলে আমরা আন্দোলনে নামব।










