তবে যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হয়েছে, সংকটটি জ্বালানির গণ্ডি পেরিয়ে সামগ্রিক বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকেই নড়বড়ে করে দিয়েছে। এর সরাসরি অভিঘাত পড়ছে কৃষির অত্যাবশ্যকীয় উপাদান সারের ওপর, বিশেষ করে ইউরিয়ায়। উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বিশ্বে বাণিজ্যিকভাবে রফতানীকৃত ইউরিয়ার প্রায় ৪৯ শতাংশ সরবরাহ হয়, যার বড় অংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সরবরাহ শৃঙ্খল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ইউরিয়ার দাম এরই মধ্যে ৪০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সারের আরেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অ্যামোনিয়ার প্রায় ৩০ শতাংশ সরবরাহও আসে এ অঞ্চল থেকে, যার দাম বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। এতে বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ দেশের সারের বড় অংশই আমদানি করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দামের এ ঊর্ধ্বগতি সরাসরি কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে এবং তা শেষ পর্যন্ত খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে প্রতিফলিত হতে পারে।

গত ২ মার্চ ইরান যখন হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ ঘোষণা করে, তখনই পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ প্রণালি দিয়ে বিশ্বে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। এর পরপরই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। সময় যত গড়িয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ও কাঁচামালের সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ সরবরাহ ব্যবস্থার সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশগুলোর একটি হলো সার খাত। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সার পরিবাহিত হয়। বিশেষ করে ইউরিয়ার বৈশ্বিক সরবরাহের বড় অংশই আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। বিশ্বে বাণিজ্যিকভাবে রফতানীকৃত ইউরিয়ার প্রায় ৪৯ শতাংশই এ অঞ্চল থেকে আসে। ইরান সংঘাত শুরুর পর থেকে ইউরিয়ার দাম ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। অক্সফোর্ড ইকোনমিকস ও অ্যালপাইন ম্যাক্রোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়ার দাম যথাক্রমে প্রায় ৫০ শতাংশ ও ২০ শতাংশ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারতথ্য সরবরাহকারী প্লাটফর্ম ট্রেডিং ইকোনমিকসের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন ইউরিয়ার দাম ৬৮০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা ফেব্রুয়ারির শুরুতে প্রায় ৪৫০ ডলারের মধ্যে ছিল। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে দামে প্রায় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বৃদ্ধি প্রায় ৮০ শতাংশের কাছাকাছি। পাশাপাশি পটাশ ও সালফারের মতো অন্যান্য সারের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

এ মূল্যবৃদ্ধি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন উত্তর গোলার্ধের কৃষকরা বসন্তকালীন বপন মৌসুমে প্রবেশ করছেন। ফলে কৃষকরা এখন দ্বিমুখী সংকটে পড়েছেন। একদিকে সারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, অন্যদিকে সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার সংগ্রহ নিয়েও তৈরি হয়েছে শঙ্কা।

উপসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদক দেশগুলো যেমন কাতার এরই মধ্যে হামলা ও অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যেসব সার এরই মধ্যে উৎপাদিত হয়েছে, সেগুলোও বাজারে পৌঁছাতে পারছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদনে। উচ্চমূল্যের কারণে অনেক কৃষক প্রয়োজনীয় পরিমাণে সার প্রয়োগ করতে পারছেন না বা কমিয়ে দিচ্ছেন। এর ফলে ফসলের ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কৃষি অর্থনীতির মৌলিক নিয়ম হলো ইনপুট কমলে আউটপুটও কমে। এ বাস্তবতায় বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে। এটি সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে প্রভাব ফেলতে শুরু করবে। অর্থাৎ, ইউরিয়ার দামের এ উল্লম্ফন শুধু কৃষকের খরচ বাড়াবে না, বরং ধাপে ধাপে তা খাদ্যপণ্যের দামে প্রতিফলিত হবে। ফলে বৈশ্বিক খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরো তীব্র হতে পারে।

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এ সংকট আরো গুরুতর। দেশের মোট সারের চাহিদার বড় অংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল, যার মধ্যে ইউরিয়া অন্যতম। সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—এ তিনটি দেশ থেকেই মূলত বাংলাদেশ সার আমদানি করে থাকে। এর মধ্যে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে প্রধানত ইউরিয়া আমদানি করা হয়, আর সৌদি আরব থেকে ইউরিয়ার পাশাপাশি ডিএপি (ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট) আনা হয়। ফলে উপসাগরীয় এ অঞ্চলের সরবরাহের ওপর বাংলাদেশের সারের বাজার উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় এ সরবরাহ শৃঙ্খল এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি, বীমা খরচ বৃদ্ধি, রুট পরিবর্তন এবং বিলম্ব—সব মিলিয়ে আমদানি প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। এর ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সার দেশে পৌঁছাতে না পারা, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা কৃষি খাতে চাপ বাড়াতে পারে।

ইউরিয়া উৎপাদনের অন্যতম কাঁচামাল অ্যামোনিয়ারও বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৩০ শতাংশ আসে গালফ অঞ্চল থেকে। হামলা ও প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে কাতারসহ কয়েকটি বড় উৎপাদক দেশ উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। সংঘাতের কারণে এ সরবরাহও ব্যাহত হয়েছে। ফলে সার উৎপাদনের পুরো চেইনই এখন চাপের মুখে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয় এবং হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক চলাচল দ্রুত পুনরুদ্ধার না হয়, তাহলে ইউরিয়া ও অন্যান্য সারের সরবরাহ স্বাভাবিক হতে মাসের পর মাস সময় লাগতে পারে। এমনকি অবকাঠামোগত ক্ষতি পূরণ করতে বছরও লেগে যেতে পারে।

এছাড়া নাইট্রোজেনভিত্তিক সারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদক ও বৃহৎ রফতানিকারক দেশ ইরান। বৈশ্বিক ইউরিয়া বাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশই ইরান ও হরমুজনির্ভর দেশগুলো থেকে আসে, যা এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পণ্যবাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিআরইউর ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্রিস লসনের মতে, হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এখন চলাচল করতে পারছে না। এটি একটি দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খল। কৃষকরা যদি প্রয়োজনীয় ইউরিয়া না পান, তাহলে ফসলের ফলন অনিবার্যভাবেই কমবে। নাইট্রোজেনই ফসল বৃদ্ধির প্রধান পুষ্টি উপাদান। যদিও কিছু মজুদ থেকে তাৎক্ষণিক ঘাটতি সামাল দেয়া যেতে পারে, তবে বছরের শেষের দিকে এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

সার সংকটের পাশাপাশি আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহও ভেঙে পড়ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। এর মধ্যে হিলিয়াম একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। অনেকের কাছে হিলিয়ামের ব্যবহার বেলুনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ মনে হলেও বাস্তবে এটি উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের একটি অপরিহার্য উপাদান। সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন, চিকিৎসা প্রযুক্তিতে এমআরআই যন্ত্র, এমনকি মহাকাশ শিল্পেও হিলিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হিলিয়াম সরবরাহ করে কাতার, যার রফতানির বড় অংশই হরমুজ প্রণালি হয়ে বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছায়। কিন্তু সংঘাত শুরুর পর দেশটি উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদিত হিলিয়ামও বাজারে পৌঁছাতে পারছে না।

হিলিয়ামের ক্ষেত্রে পরিবহন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এটি তরল অবস্থায় বিশেষভাবে নিরোধকযুক্ত কনটেইনারে মাত্র ৩৫ থেকে ৪৮ দিন সংরক্ষণ করা যায়। এরপর তা ধীরে ধীরে গ্যাসে রূপান্তরিত হয়ে বেরিয়ে যেতে শুরু করে, ফলে এর মূল্য দ্রুত কমে যায়। প্রণালিতে আটকে থাকা হিলিয়ামের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে, যা সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরো দুর্বল করে তুলছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির জন্য ব্যবহৃত চিপ তৈরিতে হিলিয়াম অপরিহার্য। ফলে সরবরাহ কমে গেলে প্রযুক্তি খাতের বড় কোম্পানিগুলোর ওপরও চাপ বাড়তে পারে।

বেসরকারি মহাকাশ কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম বাড়ার ফলে হিলিয়ামের ব্যবহার আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এমআরআই যন্ত্রে চুম্বক ঠান্ডা রাখা থেকে শুরু করে রকেটের জ্বালানি ট্যাংক পরিষ্কার করা সব ক্ষেত্রেই হিলিয়ামের প্রয়োজন রয়েছে। ফলে এ সংকট প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও মহাকাশ শিল্প—এ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকেই একসঙ্গে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি দ্রুত চালু হলেও সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে মাসের পর মাস সময় লাগতে পারে এবং উৎপাদন সক্ষমতা পুনরুদ্ধারে আরো দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সংঘাতের প্রভাব জ্বালানি খাত ছাড়িয়ে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতেও তীব্র হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কৃষি, খাদ্য ও প্রযুক্তি খাতে এর অভিঘাত এখন স্পষ্ট। এর মধ্যে সার খাত সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আগামী মাসগুলোতে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর এর প্রভাব আরো গভীর হতে পারে। এছাড়া জ্বালানির মতো সারের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক কোনো কৌশলগত মজুদ নেই। ফলে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তা দ্রুতই বাজারে প্রভাব ফেলে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো বলেন, ‘সংঘাত যদি আরো কয়েক সপ্তাহও স্থায়ী হয়, তবে তা সরাসরি বপন মৌসুমে প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে প্রধান খাদ্যশস্য, পশুখাদ্য, এবং এর ফলে দুগ্ধ ও মাংস উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় খুব কম দেশই যথেষ্ট সক্ষম।’