দেশের সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি কেনার বিষয়ে তথ্য জানতে চেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত রোববার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে এ বিষয়ে একটি চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের দেয়া ওই চিঠিতে ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত কেনা সব ধরনের পরিবহনের বিস্তারিত তথ্য পাঠাতে বলা হয়েছে। গাড়ি কেনার তথ্য পাঠাতে বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সময় দেয়া হয়েছে ১৫ দিন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বিশ্ববিদ্যালয় অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আব্দুল মতিন স্বাক্ষরিত চিঠিটি সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এর ৪৬ (৫) ধারা অনুযায়ী ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্রয়কৃত মোট যানবাহন সংখ্যা ও ক্রয়সংক্রান্ত তথ্যাদি ১৫ দিনের মধ্যে প্রেরণের জন্য অনুরোধ করা হলো। এক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ছক অনুসরণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ছকে যানবাহনের ধরন, মডেল, ব্র্যান্ড নম্বর, ক্রয়মূল্য ও ক্রয়ের তারিখ উল্লেখ করতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয় শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির টাকায়। যদিও বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলের টাকা দিয়ে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নামি-দামি গাড়ি কিনে বিধিবহির্ভূত উপায়ে সেসব ব্যবহার করা হচ্ছে। তাই এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছ থেকে নির্দিষ্ট ছকে বেশকিছু তথ্য চেয়ে একটি ইস্যু করা হয়েছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এর ৪৬ (৫) ধারায় বলা হয়েছে, সরকার বা কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী যেকোনো সময় যেকোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে, যেকোনো প্রতিবেদন, বিবরণ বা তথ্য চাইতে পারবে এবং সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ওই চাওয়া প্রতিবেদন, বিবরণ বা তথ্য যথাসময়ে সরবরাহ করতে বাধ্য থাকবে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন উপাচার্য চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে এমন একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের কার্যক্রম ও লেনদেন খুবই স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পাদিত হয়। সরকার নির্ধারিত অডিট ফার্ম দিয়ে আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়মিত নিরীক্ষা করা হয়। আমরা শিগগি তথ্যগুলো একত্র করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাব।
প্রথমবারের মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি কেনার বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে ২০১৯ সালে। ওই বছর ট্রাস্টিদের ব্যবহারের জন্য অবৈধভাবে বিশ্ববিদ্যালয় তহবিলের অর্থে ল্যান্ড রোভার রেঞ্জ রোভার ২০১৯ মডেলের নয়টি গাড়ি কেনে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় (এনএসইউ) কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির টাকায় ট্রাস্টিদের গাড়িবিলাসের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে এ নিয়ে বেশ সমালোচনার মুখে পড়েন এনএসইউ ও সেখানকার বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্যরা। তবে নানা ধরনের চাপে পড়ে কয়েক মাস আগে গাড়িগুলো ফেরত দিয়েছেন ট্রাস্টিরা। নর্থ সাউথের এ ধরনের নানা অনিয়ম বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত একটি কমিটির তদন্ত চলমান রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু নর্থ সাউথ নয়; আরো অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই তহবিলের মোটা অংকের অর্থ খরচ করে নামি-দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি কিনছে। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির টাকা দিয়ে নামি-দামি গাড়ি কেনার তালিকায় রয়েছে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসসহ (ইউল্যাব) বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির টাকায় নামি-দামি গাড়ি কেনার বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী যে অতি ধনী পরিবারের, তা নয়। অনেক মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র অভিভাবকও তাদের সন্তানদের কষ্ট করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন। আমার কথা হচ্ছে, আয়ের পরিমাণ যদি এত বেশিই হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের আরো কম টাকায় পড়ানো উচিত। আসলে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠান নয়; বরং বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। তারা ট্রাস্টি নয়; নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক মনে করছেন।










