সরবরাহ ঘাটতি পূরণে চলতি অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বাইরেও স্পট মার্কেট থেকে ১৩ কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির পরিকল্পনা করছে পেট্রোবাংলা। এরই মধ্যে এ নিয়ে দরপত্র আহ্বানও শুরু হয়েছে।

প্রায় এক বছর ধরে অস্থিতিশীল রয়েছে এলএনজির আন্তর্জাতিক বাজার। এ অস্থিতিশীলতাকে আরো দীর্ঘায়িত করে তোলার আশঙ্কা তৈরি করেছে চলমান ইউক্রেন সংকট। এশিয়ার বাজারে বর্তমানে এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ (মেট্রিক মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) ২৫ ডলারের আশপাশে থাকলেও যেকোনো মুহূর্তে তা আবারো লাগামহীন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে ইউরোপের বাজারে রুশ এলএনজির সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে চাহিদা পূরণের জন্য এশিয়ার বাজারের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে ইউরোপ। সেক্ষেত্রে এখানকার বাজারে নিয়ন্ত্রণহীন অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষকদের।

অনিশ্চিত এ মুহূর্তেও এলএনজি আমদানির কোনো বিকল্প দেখতে পাচ্ছেন না পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্যমতে, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে ২৮০ কোটি ঘনফুট করে। এর মধ্যে এলএনজির অবদান ৫৫ কোটি ঘনফুট। চলতি বছর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহ কমিয়ে দেয়ার কথা জানিয়েছে কাতার ও ওমানের সরবরাহকারী দুই প্রতিষ্ঠান। গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা থাকে বেশি। সে সময় গ্যাসের চাহিদাও বেড়ে যায়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমেই গ্যাসের সরবরাহ বজায় রাখা নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গ্রীষ্মে গ্রিড লাইনে রেশনিং করেও অন্তত ৩৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন পড়বে। গ্যাসের স্থানীয় সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সংগৃহীত এলএনজি দিয়ে এ ঘাটতি পূরণ করা অসম্ভব। উচ্চ চাহিদার মৌসুমে যাতে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে না পড়ে, সেজন্যই স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা হচ্ছে। এক্ষেত্রে অন্তত এক ডজনের বেশি কার্গো আমদানির প্রয়োজন পড়বে। এরই মধ্যে এ নিয়ে দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, চলতি অর্থবছরে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বাইরেও ১৩ কার্গো এলএনজি প্রয়োজন হবে। স্পট মার্কেট থেকে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে এসব কার্গো কেনা হবে।

এরই মধ্যে পেট্রোবাংলার আহ্বানে সাড়া দিয়ে একটি কোম্পানি স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সরবরাহের জন্য দরপত্র দিয়েছে বলে সংস্থাটির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে। দরপত্রে প্রতি এমএমবিটিইউ ৩২ ডলার মূল্য নির্ধারণ করে প্রস্তাব দিয়েছে কোম্পানিটি। তবে দরপত্রদাতা কোম্পানির নাম এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এর আগে চলতি মাসের শুরুতে এলএনজি সরবরাহের জন্য ফরাসি কোম্পানি পেট্রোবাংলাকে আরেকটি প্রস্তাব দিয়েছিল। নতুন দরপত্রটিতে এলএনজির প্রস্তাবিত মূল্য ধরা হয়েছে টোটালের প্রস্তাবের চেয়ে অন্তত ৮ শতাংশ বেশি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান বণিক বার্তাকে বলেন, চলতি অর্থবছরের জন্য স্পট মার্কেট থেকে বেশকিছু কার্গো আমাদের আমদানি করতে হবে। আমরা দরপত্র নিয়ে কাজ করছি। স্পট মার্কেটে বর্তমানে যে মূল্য চলছে, সেখান থেকে দরপত্র প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতার মাধ্যমে আমরা এলএনজি আমদানি করব।

গত বছরের অক্টোবরে স্পট মার্কেট থেকে দুই কার্গো এলএনজি সংগ্রহ করেছিল পেট্রোবাংলা। এর মধ্যে প্রতি এমএমবিটিইউ ৩৫ ডলার ৮৯ সেন্ট করে এক কার্গো সরবরাহ করেছিল ভিটল এশিয়া। ৩৬ ডলার ৯৫ সেন্টে আরেকটি কার্গো সরবরাহ করে গ্যানভার। এছাড়া সেপ্টেম্বরে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮ ডলার মূল্যে আরেক কার্গো এলএনজি সরবরাহ করেছিল ভিটল এশিয়া পিটিই লিমিটেড।

এর আগে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে স্পট মার্কেট থেকে প্রায় তিন মাস এলএনজি আমদানি বন্ধ রেখেছিল জ্বালানি বিভাগ। পরিকল্পনা ছিল, নতুন বছরে মূল্য কমে গেলে স্পট থেকে বেশি করে কার্গো আমদানি করা হবে। কিন্তু জ্বালানি বিভাগের এ পরিকল্পনায়ও ব্যাঘাত ঘটায় পণ্যটির ক্রমবর্ধমান বাজার অস্থিতিশীলতা। তবে শেষ পর্যন্ত এ অস্থিতিশীলতা সত্ত্বেও স্পট থেকে কার্গো আমদানির কোনো বিকল্প দেখতে পাচ্ছে না পেট্রোবাংলা।

স্পট থেকে উচ্চমূল্যে বিপুল পরিমাণ এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা করা হলেও এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থানের উপায় নিয়ে এখনো নিশ্চিত পেট্রোবাংলা বা অর্থ বিভাগ। জ্বালানি বিভাগের এক চিঠি সূত্রে জানা গিয়েছে, এলএনজি আমদানির জন্য চলতি অর্থবছরে ৩২ হাজার ২১৯ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে পেট্টোবাংলা। কিন্তু বাজেটে সংস্থাটির জন্য বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ৪ হাজার কোটি টাকা।

পেট্রোবাংলার ওই চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকি বাড়ানোর বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। তবে পেট্রোবাংলা ৩২ হাজার ২১৯ কোটি টাকা অর্থ বরাদ্দ চেয়েছে। কিন্তু এর পুরোটা কোনোভাবেই বাজেট থেকে দেয়া সম্ভব নয়। বাজেটে বরাদ্দকৃত ৪ হাজার কোটি টাকার থেকে কিছুটা হয়তো বাড়ানো হবে। এর মধ্যে পেট্রোবাংলাকে ভর্তুকি বাবদ ১ হাজার কোটি টাকা পেট্রোবাংলাকে দেয়া হয়েছে।

দেশে বর্তমানে গ্যাসের সরবরাহ সংকট ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে। এ সংকট মোকাবেলার জন্য এলএনজি আমদানির ওপরই নির্ভরশীল বাংলাদেশ। স্পট মার্কেটে পণ্যটির দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠায় গত বছর স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা কমিয়ে দেয় বাংলাদেশ। এতেই দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহনসহ অন্যান্য খাত অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে উচ্চমূল্যেই স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে বাধ্য হয় বাংলাদেশ। দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ গোটা অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতেই বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে এলএনজি বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি।

এলএনজির দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিতে ২০১৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর কাতারের রাস লাফান লিকুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করে পেট্রোবাংলা। ১৫ বছর মেয়াদি এ চুক্তি শেষ হচ্ছে আগামী ২০৩২ সালে। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশে ১৮ থেকে ২৫ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ করার কথা কোম্পানিটির।

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহকারী আরেক প্রতিষ্ঠান ওমানের ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড। ২০১৮ সালের ৬ অক্টোবর পেট্রোবাংলার সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী কোম্পানিটির ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বছরে ১০-১৫ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ করার কথা।

গত কয়েক বছরে দেশ দুটি থেকে এলএনজি আমদানির পরিমাণে তারতম্যও দেখা গিয়েছে। এ সময়ের মধ্যে কাতার থেকে আসা এলএনজিবাহী কার্গোর সংখ্যায় নিম্নমুখিতা দেখা গেলেও ওমান থেকে কার্গো আসার সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এ দুই প্রতিষ্ঠান থেকে চলতি বছরে (২০২২ সাল) দেশে ৫৬ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে পেট্রোবাংলার সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল)।

দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি আমদানির শুরুর দুই বছর পর স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা শুরু করে জ্বালানি বিভাগ। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। মূল্যে সাশ্রয়ীর বিবেচনায় শুরুতে প্রতি এমএমবিটিইউ ৪ ডলার করে কেনা হয়। সেখানে বেশ লাভবানও হয় পেট্রোবাংলা।