ব্যাংকিংয়ের সব আইন ও রীতি ভঙ্গ করে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে রাত ৮টার পর তোলা হয়েছিল ২২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। বেসরকারি ব্যাংকটির গুলশান করপোরেট শাখা, গুলশান ও বনানী শাখা থেকে নগদে এ টাকা তোলা হয়েছিল। অস্বাভাবিক এ লেনদেনের সঙ্গে ব্যাংকটির আট কর্মকর্তার যোগসাজশ পেয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) সৈয়দ রইস উদ্দিনের নামও রয়েছে। দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে না, সেটি জানতে চেয়েছে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাটি।
গত ৮ মে ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) কাছে এ চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে আইন লঙ্ঘন করে রাতে নগদ অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেয়ার জন্য ব্যাংকটির বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে না, সেটিও জানতে চাওয়া হয়েছে। দুটি ক্ষেত্রেই জবাব দেয়ার জন্য পাঁচ কর্মদিবস সময় বেঁধে দিয়েছে বিএফআইইউ।
চিঠিতে বলা হয়, নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যাংকিং কার্যক্রম ও লেনদেনের বিষয়টি তদারক করেন ন্যাশনাল ব্যাংকের ডিএমডি সৈয়দ রইস উদ্দিন। তিনি সংশ্লিষ্ট শাখা ও আইটি বিভাগের মাধ্যমে কোর ব্যাংকিং সিস্টেম চালু রাখেন। একই সঙ্গে ঋণ মঞ্জুরিপত্র ও নগদ অর্থের জোগান দেয়ার সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের সমন্বয় করেন।
অবৈধ ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্য কর্মকর্তারা হলেন— ন্যাশনাল ব্যাংকের কোম্পানি সেক্রেটারি কায়সার রশিদ, সিআরএম-১-এর প্রধান আবু রাশেদ নওয়াব, ক্যাশ ফিডিং শাখা (দিলকুশা) ব্যবস্থাপক আশরাফ উদ্দিন আহমেদ, আইটি ডিভিশনের প্রধান সৈয়দ কাজী কামাল, গুলশান করপোরেট শাখা ব্যবস্থাপক ডিএম রফিকুল ইসলাম, গুলশান শাখার ব্যবস্থাপক অলক কুমার বিশ্বাস ও বনানী শাখার ব্যবস্থাপক খান মোহাম্মদ মোর্শেদ আজিজ।
বিএফআইইউ থেকে পাঠানো চিঠি পেয়েছেন বলে জানান ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মেহমুদ হোসেন।বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বিএফআইইউ থেকে পাঠানো চিঠি পেয়েছি। চিঠিতে ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তারও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। এ কারণে আমি ওইসব কর্মকর্তাকে চিঠি দিয়ে তিনদিনের মধ্যে ব্যাখ্যা চেয়েছি। আর সামগ্রিকভাবে ব্যাংক ও কর্মকর্তাদের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য বিএফআইইউর কাছে দুই সপ্তাহ সময় চাওয়া হয়েছে। সংস্থাটির কাছ থেকে বর্ধিত সময় মঞ্জুর করা হয়েছে।’
প্রসঙ্গত, গত ১৯ ফেব্রুয়ারি বণিক বার্তার অনলাইনে ‘জড়িত কর্মকর্তাদের শাস্তির নির্দেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের; ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে রাত ৮টার পর তোলা হয় ২২ কোটি টাকা’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ হয়। ওই সংবাদে বলা হয়, দেশে ব্যাংকিং লেনদেনের নির্ধারিত সময়সূচি সকাল ১০টা থেকে বেলা সাড়ে ৩টা। লেনদেন শেষে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ব্যাংক কর্মকর্তারা দাপ্তরিক কাজ করতে পারেন। কিন্তু ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ২২ কোটি ৬০ লাখ টাকা তোলা হয়েছে রাত ৮টার পর। ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর ব্যাংকটির গ্রাহক ইনফ্রাটেক কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড এ টাকা তুলে নেয়।
ব্যাংক থেকে রীতিনীতি বহির্ভূতভাবে রাতে টাকা তুলে নেয়ার ঘটনাটিকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডির কাছে পাঠানো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়, ইনফ্রাটেক কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের অনুকূলে অনুমোদিত ১০০ কোটি টাকার ঋণপত্র সীমার বিপরীতে কীভাবে সীমাতিরিক্ত ঋণপত্র স্থাপন করা হয়েছে, সে বিষয়ে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে হবে। একই সঙ্গে রাত ৮টার পর কোম্পানিটির হিসাব থেকে নগদ ২২ কোটি ৬০ লাখ টাকা উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, সে বিষয়েও পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ব্যাংকিং রীতিনীতির চরম লঙ্ঘনপূর্বক রাত ৮টার পরে নগদ লেনদেন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকের কর্মকর্তারা গুরুতর অনিয়ম সংঘটন করেছেন। এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
অনিয়ম-দুর্নীতির পাশাপাশি করপোরেট সুশাসন ভেঙে পড়ায় ন্যাশনাল ব্যাংক আর্থিক দুর্দশায় পড়েছে। ব্যাংকটির তথ্যমতে, গত বছর ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৪২ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০ হাজার ৬৭০ কোটি টাকাই ছিল খেলাপি ঋণ। স্বাভাবিক পদ্ধতিতে আদায় অযোগ্য হওয়ায় আরো ১ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করেছে ব্যাংকটি। ২০২২ সালে ৩ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা পরিচালন লোকসান দিয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক। একই বছর নিট লোকসানের পরিমাণও ছিল ৩ হাজার ২৬১ কোটি টাকা।










