কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা) ও রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) মধ্যে আবারো গোলাগুলি হয়েছে। বালুখালীর ৮নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে (পূর্ব) গতকাল ভোরে ঘটা এ ঘটনায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এর ১২ ঘণ্টা পর একই ক্যাম্প থেকে বিকাল ৫টার দিকে এক রোহিঙ্গার গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তারা সবাই আরসার সদস্য বলে জানিয়েছে পুলিশ। 

গুলিতে নিহতদের মধ্যে চারজনের পরিচয় নিশ্চিত করেছে পুলিশ। তারা হলেন, ৮ নম্বর ক্যাম্পের এইচ-৪৯ ব্লকের আনোয়ার হোসেন (২৪), এ-২১ ব্লকের মোহাম্মদ হামীম (১৬), ১৩ নম্বর ক্যাম্পের বি-১৭ ব্লকের আবুল বাশারের ছেলে নুরুল আমিন (২৪) ও ১০ নম্বর ক্যাম্পের এইচ-৪২ ব্লকের আব্দুল কাদেরের ছেলে মো. নজিমুল্লাহ (২৮)। আর গলাকাটা অবস্থায় উদ্ধার করা সানাউল্লাহ (৪৫) নামে ওই রোহিঙ্গা ১১ নম্বর ক্যাম্পের ডি ব্লকের বাসিন্দা ছিলেন।

পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দিন দিনই খুন ও নানা অপরাধ বাড়ছে। গত সাড়ে পাঁচ বছরে ক্যাম্পে প্রায় ১৬৮টি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন শীর্ষ রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা, স্বেচ্ছাসেবক ও সাধারণ রোহিঙ্গাও। এ কারণে স্থানীয়সহ সেখানে কর্মরতরা ও প্রশাসনের লোকজন আতঙ্কে রয়েছে। রোহিঙ্গারা বলছেন, ক্যাম্পে মাদক ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার ও প্রত্যাবাসন ঘিরে আরসা ও আরএসওর মধ্যে এসব ঘটনা ঘটেছে। আবার অপহরণ করে চাঁদা না পাওয়ায় কিছু হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা।

অনুসন্ধান করে জানা গেছে, ক্যাম্পগুলোতে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন, ইয়াবা, মানব পাচার ও স্থানীয় হাটবাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে অন্তত ১৪টি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সক্রিয়। তাদের মধ্যে প্রায়ই হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নিত্যদিন চলে অস্ত্রের মহড়া। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অভিযান ও নজরদারিতেও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না তাদের অপরাধ। সর্বশেষ গতকাল ভোরে বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী দুই সন্ত্রাসী সংগঠন আরসা ও আরএসওর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। প্রাণ হারান ছয়জন। মূলত ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণেই কিছুদিন ধরে তাদের মধ্যে চলছে তীব্র এ লড়াই। 

নিরাপত্তায় নিয়োজিত আর্মড ৮ পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি আমির জাফর বলেন, ‘এলাকার আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে ভোরে দুটি সংগঠনের সন্ত্রাসীরা গোলাগুলিতে জড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে এপিবিএন ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগেই সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। এ সময় ঘটনাস্থলে তিনজনের গুলিবিদ্ধ মরদেহ পাওয়া যায়। আহতাবস্থায় দুজনকে উদ্ধার করে পাশের আইএমও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের মৃত্যু হয়। এরপর রাত সাড়ে ৮টার দিকে আরো একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় একটি দেশীয় ওয়ান শুটারগান।’ নিহতরা আরসার সন্ত্রাসী বলে জানান পুলিশের এ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। 

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পগুলোতে গত সাড়ে পাঁচ বছরে ১৬৮টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গত দুই বছরে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। নিহতদের বেশির ভাগ ক্যাম্পের কমিউনিটি নেতা ও স্বেচ্ছাসেবক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতা জানান, প্রথমদিকে ‘আরসা’ নিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভিন্নমত থাকলেও ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা, মাঝি ও মুসল্লিসহ বিভিন্ন খুনের ঘটনায় আরসা ও আরএসও জড়িত। এছাড়া সক্রিয় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে নবী হোসেন গ্রুপ, মুন্না গ্রুপ, ডাকাত আবদুল হাকিম গ্রুপ, ডাকাত মো. সালেহ গ্রুপ, ইসলামিক মাহাস গ্রুপ ও আল-ইয়াকিন গ্রুপ অন্যতম। এর পাশাপাশি আরসা ও আরএসও পরিচয় দিয়ে আরো কয়েকটি গ্রুপ ক্যাম্পে সক্রিয় আছে। আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, অপহরণ ও চাঁদাবাজির ঘটনায় এসব গ্রুপের সদস্যরা জড়িত।

এপিবিএন অবশ্য বলছে, ক্যাম্পগুলোতে অস্ত্রের ব্যবহার, মাদক ব্যবসা, হত্যা ও অপহরণের ঘটনা বাড়লেও সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। গত এক বছরে ৩৮০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও শতাধিক গোলাবারুদসহ ১৬৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি ২৬ লাখ ৩০ হাজার পিস ইয়াবা ও ২৯ কেজি আইসসহ গ্রেফতার করা হয়েছে ৭৭৯ রোহিঙ্গা অপরাধীকে। একই সময়ে ৪৮ জন খুন হন। এসব ঘটনায় ১১৬ সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৩৬ রোহিঙ্গাকে অপহরণের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৮টি। এসব মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে ২৯ জন অপহরণকারীকে। বেশির ভাগ ঘটনা ঘটেছে টেকনাফের নয়াপাড়া, উনছিপ্রাং ও শালবাগান এবং উখিয়ার লম্বাশিয়া, কুতুপালং, জামতলী, ময়নারঘোনা ও মধুরছড়া ক্যাম্পে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকটি ক্যাম্পের হেড মাঝি (নেতা) জানান, ক্যাম্পে অস্ত্র নিয়ে রাতে মহড়া দেয় একটি গ্রুপ। নিজেদের আরসা পরিচয় দিয়ে প্রত্যেক ব্লকে গিয়ে যুবকদের গ্রুপের সদস্য হিসেবে যোগ দিতে আহ্বান জানায়। কখনো কখনো বাধ্যও করা হয়। রাজি না হলে অপহরণ করে নিয়ে যায়। 

ক্যাম্পে অপরাধ বাড়ার কথা স্বীকার করে ৮ এপিবিএনের সহকারী পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ বলেন, ‘বেশ কয়েকটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয় আছে। তবে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি। যারাই অপরাধ করবে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

আশ্রয় শিবিরগুলোর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত আছেন এপিবিএনের পৃথক তিনটি ব্যাটালিয়নের ২ হাজার ৩০০ সদস্য। আশ্রয় শিবিরগুলো পরিচালিত হয় সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অধীন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয়ের আওতায়। এ প্রসঙ্গে আরআরআরসি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘রাতের বেলায় আশ্রয় শিবিরে সন্ত্রাসীদের গোলাগুলি সংঘর্ষের ঘটনায় সাধারণ রোহিঙ্গারা ঘুমাতে পারছে না। দিনদুপুরে খুনখারাবির ঘটনাও ঘটছে। সেখানে কাজ করতে যাওয়া এনজিও-আইএনজিওর কর্মীরাও উদ্বিগ্ন। তাদের অনেকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এ কারণে আশ্রয় শিবিরের চারদিকে দ্রুত কাঁটাতারের বেড়ার কাজ শেষ করা, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের ক্রম বৃদ্ধি ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর তাগিদ দেয়া হচ্ছে।’