আগস্টে অতি বৃষ্টিপাতের ফলে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে যায়। একসময় নগরীতে হাঁটুপানির জলাবদ্ধতা হলেও বর্তমানে সেটি গিয়ে ঠেকেছে বুক সমানে। সে সময় টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিপাতে জলাবদ্ধতার পর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল নগরীর ৫০ কিলোমিটার সড়ক। এক মাস পেরিয়ে গেলেও এসব সড়ক মেরামতে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নেই। বরং প্রধান প্রধান সড়ক যেসব স্থানে অল্প বৃষ্টিতে জলাবদ্ধ হয়, সেখানে সড়ক উঁচু করার দিকেই হাঁটছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। এমনকি মূল সড়কের জলাবদ্ধতা ঢাকতে ফ্লাইওভারের মধ্যেও ভরাট কাজ চালাচ্ছে চসিক কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রামের মূল প্রধান সড়ক ধরা হয় কালুরঘাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত। প্রায় ২৮ দশমিক ৩ কিলোমিটার সড়কটির ২২ কিলোমিটার পথই এখন ফ্লাইওভার হয়ে গেছে। চান্দগাঁও থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত অংশটি প্রকল্পের মাধ্যমে সড়ক উঁচু করায় জলাবদ্ধতার তীব্রতা কিছুটা কম। তবে ১ দশমিক ৩৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বহদ্দারহাট আবদুল মান্নান ফ্লাইওভার ও ৫ দশমিক ২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের মধ্যবর্তী শুলকবহর অংশের সড়কটি যেকোনো সময় বৃষ্টিপাত ও জোয়ারের সময় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। চট্টগ্রামের প্রধান সড়কটির জলাবদ্ধতা মুক্ত করতে দেড় মিটার দৈর্ঘ্যের সড়কটি কয়েক ফুট উঁচু করা হচ্ছে। সড়কটি উঁচু করতে আবদুল মান্নান ফ্লাইওভার ও আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের প্রবেশমুখ ও বহির্গমন মুখও ইটের সুরকি দিয়ে উঁচু করছে চসিক। এতে আপাত জলাবদ্ধতা থেকে কিছুটা স্বস্তি এলেও ফ্লাইওভারের প্রবেশমুখগুলোর অবকাঠামো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

জানতে চাইলে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্পগুলো এখনো শেষ হয়নি। এ কারণে চাইলেও রাতারাতি জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব নয়। সাম্প্রতিক জলাবদ্ধতা ও বৃষ্টিপাতে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামতে আমরা বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছি। কিন্তু অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে বৃহৎ পরিসরে মেরামত সম্ভব হচ্ছে না। তবে খানাখন্দ ভরাট করে যানবাহন চলাচল উপযোগী করা হচ্ছে।’

ফ্লাইওভারের প্রবেশ ও নির্গমন পথ ভরাট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শুলকবহর এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে সড়কটির ১০০ মিটারের মতো সড়ক উঁচু করা হচ্ছে। এ কারণে সড়কের উচ্চতা বাড়ানোর প্রয়োজনে ফ্লাইওভারের কিছু অংশ ভরাট করা হচ্ছে। ফ্লাইওভারসহ সড়কের পাশের অংশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে উঁচু করার কাজ চলমান থাকায় ফ্লাইওভারের কোনো সমস্যা হবে না।’ পাশাপাশি সড়কের জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি পাশের এলাকায়ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কমে যাবে বলে দাবি করেন তিনি।

তবে চসিকের এ বক্তব্যের বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান দেলোয়ার মজুমদার এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে একাধিক প্রকল্পের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ব্যয় হলেও চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা কমেনি। প্রকল্প চলমান থাকায় আপাতত জলাবদ্ধতার হাত থেকে রেহাই পাওয়ারও সুযোগ নেই। সমালোচনা থেকে বাঁচতে সড়ক উঁচু করার মাধ্যমে সংকট নিরসনের আত্মঘাতী কাজ করছে সিটি করপোরেশন। সড়ক উঁচু করার মানে হচ্ছে শহরের মধ্যেই বাঁধ তৈরি করা। এতে ওই সড়কটি জলাবদ্ধ হবে না, কিন্তু আশপাশের অঞ্চলটির জলাবদ্ধতা আরো বেড়ে যাবে। সড়ক উঁচু করলেও পাশের নালাগুলো নিচু রেখে দেয়ার কারণে নগরীর গোটা ড্রেনেজ সিস্টেম অকার্যকর হওয়ার পথে। এতে সড়কে পানি না উঠলেও সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়বে। জমে থাকা পানি নেমে যেতে আরো বেশি সময়ক্ষেপণ হবে।’ সাম্প্রতিক সময়ে সড়ক উঁচু করে জলাবদ্ধতা ঢাকার যে চেষ্টা সেটি বন্ধ করে জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর সমাধানের উদ্যোগ নেয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

চসিক সূত্রে জানা গেছে, টানা চারদিনের জলাবদ্ধতায় নগরের বিভিন্ন সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টানা বর্ষণে এসব সড়কের কোথাও পিচ উঠে গেছে, বিভিন্ন স্থানে সড়কে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব কারণে চট্টগ্রাম শহরের অধিকাংশ এলাকায় যানবাহনগুলো ভোগান্তি নিয়ে চলাচল করছে। এতে সড়কে যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে গত দুই সপ্তাহে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় চলাচলের সময় যানবাহনের বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের।

চসিকের প্রকৌশল বিভাগ বলছে, ৫০ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামতে প্রয়োজন ৬০ কোটি টাকা। চসিক আপাতত নিজস্ব তহবিল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামতে কাজ করলেও চাহিদামতো অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের হিসাবে নগরীতে প্রায় ৩ হাজার ৫০০টি সড়ক রয়েছে। সড়কগুলোর মোট দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৪৪২ কিলোমিটার। নগরীর প্রধান প্রধান সড়কগুলো উঁচু করার মাধ্যমে চসিক জলাবদ্ধতা নিরসনে ক্রান্তিকালীন উদ্যোগ নিলেও সাধারণ মানুষের চলাচলে সড়ক ও মানুষের বসতি এলাকাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হচ্ছে।

প্রতি বছর চট্টগ্রামে বর্ষা মৌসুমে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। ২০২২ সালে নগরীতে ১০০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ২০২১ সালে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল মাত্র ৩৬ কিলোমিটার। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে চট্টগ্রামে চলতি বছর সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরিমাণ আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন চসিকের প্রকৌশলীরা।