দক্ষিণাঞ্চলের জেলা গোপালগঞ্জ। মধুমতি নদীর তীরে গড়ে ওঠা ১ হাজার ৪৮৯ দশমিক ৯২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই অঞ্চলটির জনসংখ্যা ১২ লাখ ৯৫ হাজার ৫৭ (২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী)। বিপুল এ জনগোষ্ঠীর উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ২০২৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কার্যক্রম শুরু করে গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ৫০০ শয্যার হাসপাতালটিতে আটটি বিভাগ রয়েছে। তবে জনবল সংকটে গত দুই বছরেও গুরুত্বপূর্ণ চারটি বিভাগ চালু হয়নি।
সেবাপ্রত্যাশীরা বলছেন, গোপালগঞ্জ ছাড়াও নড়াইল, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরিশালের কয়েকটি উপজেলা, মাদারীপুর ও ফরিদপুরের কিছু অঞ্চলের মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসেন। তবে সার্জারি, অর্থোপেডিক, চক্ষু ও নাক-কান-গলা বিভাগ চালু না হওয়ায় রোগীদের যেতে হচ্ছে অন্য হাসপাতালে। সার্জারি চিকিৎসা অনেকটা ব্যয়বহুল। এ চিকিৎসায় বেশি দিন হাসপাতালে অবস্থান করতে হয়। দীর্ঘদিন সেবন করতে হয় ওষুধ। সরকারি হাসপাতালে সার্জারি বিভাগ থাকলে ব্যয়ভার অনেকটা সাশ্রয়ী হয়। কিন্তু মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল যাত্রা শুরু করার প্রায় দুই বছর পরও বিভাগটি চালু হয়নি। বিভাগটির সঙ্গে যোগসূত্র রয়েছে অর্থোপেডিক ও প্রসূতি সেবার।
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার দেবদুন গ্রামের মরিয়ম বেগম বলেন, ‘এ হাসপাতালে গাইনি রোগের চিকিৎসা পেয়েছি। কিন্তু প্রসূতি সেবা চালু নেই। তাই বাধ্য হয়ে ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল বা বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে। হাসপাতালের সেবার মান ভালো। তবে প্রসূতি সেবা চালু থাকলে এক হাসপাতাল থেকেই সব সেবা পাওয়া যেত।’
দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার কলাতলা গ্রামের শফিকুল ইসলাম। তিনিও গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে পায়ের অপারেশন করিয়েছি। এতে প্রায় ২ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এখনো সমস্যা রয়ে গেছে। ঠিকমতো হাঁটতে পারি না। গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অর্থোপেডিক বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন। তাদের পরামর্শে চিকিৎসাও নিচ্ছি। কিন্তু এখানে অপারেশন থিয়েটার চালু হয়নি। এটি চালু হলে কম খরচে মানসম্পন্ন চিকিৎসা পেতাম। সময় ও ব্যয় সাশ্রয় হতো।’
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার আমবৌলা গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা বলেন, ‘পেট ব্যথা নিয়ে গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. অনুপ কুমার মজুমদারকে দেখিয়েছি। তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পিত্তথলির পাথর অপারেশনের পরামর্শ দিয়েছেন। এ হাসপাতালে সার্জারি বিভাগ চালু হয়নি। তাই অপারেশন হচ্ছে না। বাইরে অপারেশন করতে গেলে ৪৫ হাজার টাকা চাইছে। এ টাকা দিয়ে আমার অপারেশন করানোর সামর্থ্য নেই। হাসপাতালে এটি চালু থাকলে ৬-৭ হাজার টাকার মধ্যে অপারেশন করানো সম্ভব হতো। এখন কী করব ভেবে পাচ্ছি না।’
গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য বলছে, হাসপাতালের কার্যক্রম ২০২৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়। ওইদিন শুধু বহির্বিভাগ চালু করা হয়। ৫০০ শয্যার হাসপাতালে মেডিসিন, কার্ডিওলজি, শিশু, গাইনি, সার্জারি, অর্থোপেডিক, নাক-কান-গলা ও চক্ষু বিভাগ রয়েছে। ২০২৪ সালে ১০ জানুয়ারি মেডিসিন, কার্ডিওলজি, শিশু, গাইনি বিভাগের মাতৃ স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি বিভাগের যাত্রা শুরু হয়। তবে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সার্জারি, অর্থোপেডিক, চক্ষু ও নাক-কান-গলা বিভাগ চালু করা যায়নি। এছাড়া গাইনি বিভাগের প্রসূতি সেবা কার্যক্রম শুরু করা যায়নি।
হাসপাতালটিতে জনবল সংকট রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কনসালট্যান্ট চিকিৎসকের পাঁচটি পদ থাকলেও কর্মরত রয়েছেন তিনজন। এছাড়া ৫৫টি মেডিকেল অফিসারের পদের বিপরীতে ২৭ জন কর্মরত রয়েছেন। অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের চারটি পদই শূন্য রয়েছে। এসব কারণে সার্জারি, অর্থোপেডিক ও প্রসূতি সেবা বিভাগ চালু করা যাচ্ছে না।
এ ব্যাপারে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. প্রেমানন্দ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাসপাতালের আট বিভাগের মধ্যে চারটি চালু রয়েছে। সার্জারি, অর্থোপেডিক ও প্রসূতি সেবা বিভাগ চালু করতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দুজন অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ও ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের একজন অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট দিয়ে ওই বিভাগগুলো সপ্তাহে দুদিন চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একইভাবে ওইসব বিভাগে চিকিৎসক, নার্সসহ প্রয়োজনীয় লোকবল দেয়া হয়েছে। অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট পদে লোকবল চেয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠিও দেয়া হয়েছে।’
গোপালগঞ্জে সরকারি চক্ষু হাসপাতাল রয়েছে। এ কারণে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চক্ষু বিভাগ এ মুহূর্তে চালু হচ্ছে না জানিয়ে ডা. প্রেমানন্দ বলেন, ‘নাক-কান-গলা বিভাগ চালু করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি এন্ডোস্কপি, ইকোকার্ডিওগ্রাফি, এক্স-রে, হরমোন পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে এখনো সিটিস্ক্যান মেশিন চালু করা হয়নি। এ কারণে সিটিস্ক্যান হচ্ছে না। এখানে স্যালাইন, ৪২ ধরনের ওষুধ, অ্যান্টিভেনম ও ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট পর্যাপ্ত রয়েছে।’
মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট বড় নয় জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, প্রভাষক ও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা বিভাগগুলো পরিচালনা করেন। এ কারণে এখানে চিকিৎসক সংকট তেমন কোনো সমস্যা নয়। শুধু হাসপাতালে চার অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট নিয়োগ দিলেই সার্জারি, অর্থোপেডিক ও প্রসূতি বিভাগ সপ্তাহের সব কর্মদিবসেই চালু করা সম্ভব হবে।’










