বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রয়াত আল্লাহ মালিক কাজেমীর ক্যারিয়ার ছিল ৪৪ বছরের। এর মধ্যে দুই দশকেরও বেশি সময় ছিলেন নীতিনির্ধারণী ভূমিকায়। মুদ্রানীতি প্রণয়ন, রিজার্ভ ও ট্রেজারি ব্যবস্থাপনাসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি প্রণয়নে তার অবদান ছিল বেশ প্রশংসনীয়। এ ভূমিকার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চার গভর্নর নিজ নিজ মেয়াদে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল ছিলেন। কভিডে আক্রান্ত হয়ে ২০২০ সালের ২৬ জুন আল্লাহ মালিক কাজেমী মারা যান। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের চেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট অ্যাডভাইজার পদে দায়িত্বরত ছিলেন। এ পদে তার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল আটবার। দায়িত্বরত গভর্নরদের দাবির মুখেই এ ভূমিকা নিতে হয়েছিল তাকে।
চলমান অর্থনৈতিক সংকটে একজন আল্লাহ মালিক কাজেমীর অভাব এখন বেশ ভালোভাবেই অনুভব করছেন দেশের ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, আল্লাহ মালিক কাজেমীর অনুপস্থিতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের বিনিময় হার নিয়ে গৃহীত কোনো সিদ্ধান্তের ওপরই অটল থাকতে পারছে না। আবার মুদ্রানীতির হাতিয়ারগুলোর বাস্তবায়ন নিয়েও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত আসছে। এতে বিরাজমান অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণ তো দূরে থাক, উল্টো অর্থনীতির প্রতিটি খাতেই বিপর্যয় ত্বরান্বিত হচ্ছে।
বিরাজমান অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে আল্লাহ মালিক কাজেমীকে অনেক বেশি অনুভব করেন আনিস এ খান। প্রায় চার দশক ধরে দেশের ব্যাংক খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন তিনি। প্রায় ১০ বছর ধরে শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করেছেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি)। ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) নেতৃত্বও দিয়েছেন তিনি। এ ব্যাংকার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আল্লাহ মালিক কাজেমী ছিলেন মুদ্রানীতির ত্রাণকর্তা। তিনিই ছিলেন দেশের ব্যাংক খাতের চালিকাশক্তি। প্রতি মুহূর্তে তাকে অনুভব করি। বর্তমান অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা তার অনুপস্থিতিকে আরো বেশি জোরালো করেছে। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকে আল্লাহ মালিক কাজেমীর কোনো বিকল্প তৈরি হয়নি।’
আনিস এ খান বলেন, ‘আল্লাহ মালিক কাজেমী প্রায়ই আমাকে ডেকে পাঠাতেন। একান্তে ব্যাংক খাতের সমস্যা সম্পর্কে জানতেন। সমাধান কী হতে পারে, সে বিষয়ে পরামর্শ চাইতেন। কোনো পরামর্শ দিলে সেটির ক্ষতিকর দিক কী হতে পারে, সে বিষয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতেন। এভাবে তিনি দেশের মানুষের স্পন্দন বুঝতে পারতেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে সেটির প্রয়োগ ঘটাতেন। এখন সেসব অভিজ্ঞতা বিরল।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে গোল্ড মেডেলিস্ট আল্লাহ মালিক কাজেমী ১৯৭৬ সালে প্রথম শ্রেণীর অফিসার পদে বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ দেন। এরপর ধারাবাহিক পদোন্নতি পেয়ে ১৯৮৫ সালে যুগ্ম পরিচালক, ১৯৮৯ সালে উপমহাব্যবস্থাপক, ১৯৯৩ সালে মহাব্যবস্থাপক ও ১৯৯৯ সালে নির্বাহী পরিচালক হন। ২০০২ সালে তিনি ডেপুটি গভর্নর পদে নিয়োগ পান। এ পদে কাজ করেছেন ২০০৭ সাল পর্যন্ত। ২০০৮ থেকে দুই মেয়াদে ২০১২ সাল পর্যন্ত সিনিয়র কনসালট্যান্ট পদে কর্মরত ছিলেন। ২০১২ সালের ১ এপ্রিল যোগ দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট অ্যাডভাইজার পদে। এ পদে তার মেয়াদ বাড়ানো হয় আটবার। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ডেপুটি গভর্নর হিসেবে আল্লাহ মালিক কাজেমী সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমদ ও ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে কাজ করেছেন। এরপর উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান ও ফজলে কবিরের সঙ্গে। এ চারজন গভর্নরের মেয়াদে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপর্ণ ভূমিকা ছিল তার। কাজেমীর মৃত্যুর পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার নীতি প্রণয়নের ধারাবাহিকতা হারিয়ে ফেলেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
আল্লাহ মালিক কাজেমী গভর্নরদের ছায়া হিসেবে ভূমিকা রাখতেন বলে জানান সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ মালিক কাজেমী বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী ভূমিকায় ছিলেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যেকোনো বিষয়ে তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ছিল। এ কারণে তিনি যথাযথ পরামর্শ দিতে পারতেন। রাজনৈতিক কোনো বিবেচনা তার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলত না।’
সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন বড় ধরনের দুর্বলতার পরিচয় দিচ্ছে। দেশের বিরাজমান অর্থনৈতিক সংকটের প্রধান কারণ পলিসি লিগ্যাসি। সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে ডলারের বাজার নিয়ে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। আগেই বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে ডলারের দর সংশোধন হয়ে স্থিতিশীল হয়ে যেত। ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে বেঁধে রাখা ভুল ছিল। আর ঋণখেলাপিদের ছাড় দিয়ে নীতি প্রণয়ন একেবারেই উচিত হয়নি।’
ডলার ও রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন বিড়ম্বনার মধ্যে রয়েছে। ডলারের বিনিময় হার গত বছরের আগস্টে বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা) ও ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির ওপর ছেড়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই সময় থেকে এবিবি ও বাফেদার পক্ষ থেকে মুদ্রাটির যে দর নির্ধারণ করা হয়েছিল, তার কোনোটিই বাস্তবায়ন হয়নি।
নির্ধারিতের চেয়ে বেশি দরে ডলার বেচাকেনায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে দেশী-বিদেশী ছয়টি ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানকে অপসারণের নির্দেশ দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর প্রভাবে গত বছরের (২০২২ সাল) সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স এক ধাক্কায় ৫০ কোটি ডলার কমে যায়। শেষ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের আগস্টে এসে বেশি দামে ডলার বেচাকেনা ঠেকাতে আবারো ব্যাংকগুলোয় বিশেষ পরিদর্শন চালায় বাংলাদেশ ব্যাংক। ১০ ব্যাংকের ট্রেজারিপ্রধানকে জরিমানা করা হয়। এতে রেমিট্যান্স প্রবাহে বিপর্যয় নেমে আসে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল মাত্র ১৩৩ কোটি ডলার, যা ছিল ৪১ মাসে সর্বনিম্ন। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোকে যেকোনো মূল্যে রেমিট্যান্স আনতে উৎসাহ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে গত অক্টোবরে দেশের রেমিট্যান্স বেড়ে দাঁড়ায় ১৯৭ কোটি ৭৫ লাখ ডলারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উৎসাহ পেয়ে ব্যাংকগুলো ১২৪ টাকায়ও রেমিট্যান্সের ডলার কেনা শুরু করে। এর প্রভাবে কার্ব মার্কেটে (খুচরা বাজার) ডলারের দাম উঠে যায় ১২৮ টাকায়। এ অবস্থায় আবারো ডলারের দর নিয়ে নিজেদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বৃহস্পতিবার দেশের ২১টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) সঙ্গে গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার বৈঠক করেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, প্রণোদনাসহ রেমিট্যান্স আনার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো ডলারপ্রতি সর্বোচ্চ ১১৬ টাকা পর্যন্ত দিতে পারবে। কোনো ব্যাংক এর চেয়ে বেশি দামে ডলার কিনলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে ব্যাংকগুলো যে দরেই ডলার কিনুক না কেন, বিক্রি করতে হবে সর্বোচ্চ ১১১ টাকায়। আর ব্যাংকগুলোর সংগৃহীত রেমিট্যান্সের ১০ শতাংশ অবশ্যই আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে বিক্রি করতে হবে।
এ সিদ্ধান্তের প্রভাবে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ আবারো থমকে গেছে। দেশের একাধিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা বলেছেন, গত বৃহস্পতিবারের সিদ্ধান্তের পর তারা রেমিট্যান্স কেনা প্রায় বন্ধ রেখেছেন। এতে হুন্ডির বাজার আবারো চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। রেমিট্যান্সের বড় অংশ চলে যাচ্ছে হুন্ডিতে। আবার এদিকে ডলার সংকটের প্রভাবে রিজার্ভের ক্ষয়ও অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী (বিপিএম৬) রিজার্ভ এখন ১৯ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে এসেছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২১ সালের আগস্টে রিজার্ভ বেড়ে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। সে হিসাবে দুই বছরের ব্যবধানে রিজার্ভের পরিমাণ অর্ধেকেরও অনেক নিচে নেমে এসেছে।
ডলার সংকটের কারণে ব্যবসায়ীরা চাহিদা অনুযায়ী এলসি খুলতে পারছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মাসিক আমদানি এখন ২০২১-২২ অর্থবছরের তুলনায় অর্ধেকে। চাহিদা অনুযায়ী মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি না হওয়ায় দেশের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ বসে থাকছে। আবার বাজারে সরবরাহ কমায় মূল্যস্ফীতিও উসকে উঠছে।
ঋণের সুদহার বাড়িয়েও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। উল্টো গত মাসে মূল্যস্ফীতির হার আরো বেড়েছে। এমনকি খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারও সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, এমন অর্থনৈতিক সংকট তিনি নিজের ৩৬ বছরের চাকরিজীবনে কখনই দেখেননি।
চলমান এ সংকটে একজন আল্লাহ মালিক কাজেমীর প্রচণ্ড অভাব বোধ করছেন বিশিষ্ট ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘যেকোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গৃহীত নীতির ধারাবাহিকতা থাকা দরকার। কিন্তু এ মুহূর্তে বাংলাদেশে সেটির অনুপস্থিতি প্রবল। আল্লাহ মালিক কাজেমী বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। তার যেকোনো কাজের ধারাবাহিকতা ছিল। প্রতিটি নীতি প্রণয়নের আগে তিনি সবার সঙ্গে আলাপ করতেন। অনেক সময় আমার মতামত “তিন লাইনে” লিখে পাঠাতে বলতেন। কেউ আমার মতামতের বিপরীত কিছু বললে সেটিও জানাতেন। এভাবে নীতি প্রণয়নে তিনি পরিপক্বতার পরিচয় দিতেন। এ কারণে আল্লাহ মালিক কাজেমীকে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে অনুভব করছি।’










