সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বিরোধীদলীয় নেতাদের চোখে পড়ে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাদের ডাক্তার দেখানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি জানি যে আমাদের বিরোধী দল, তারা আমাদের উন্নয়নটা চোখে দেখে না, এগুলো বলার কিছু নাই। আসলে তাদের চোখের দোষ না, মনের দোষ।’ দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গতকাল তিনি এসব কথা বলেন।
ঝিনুকাকৃতির আদলে তৈরি কক্সবাজারের আইকনিক রেলস্টেশন থেকে ১০২ কিলোমিটার দীর্ঘ দোহাজারী-কক্সবাজার সিঙ্গেল লাইন ডুয়াল গেজ রেলপথের উদ্বোধন করেন সরকারপ্রধান। বাঁশি বাজিয়ে ও সবুজ পতাকা নেড়ে তিনি নতুন ট্রেনের যাত্রা উদ্বোধন করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তৃতায় রেল যোগাযোগের উন্নয়ন তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি মনে করি আজকের দিনটি বাংলাদেশের জনগণের জন্য গর্বের দিন। রেল সংযোগ করতে পেরে সত্যিই আমি খুব আনন্দিত। আমি জানি, দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের মানুষের একটা দাবি ছিল। রেলে কক্সবাজার আসা যাবে এটা অনেকের আকাঙ্ক্ষা ছিল। আজকে আমরা সেটা করেছি, এটা হবে প্রথম মর্যাদার প্রকল্প।’
তিনি বলেন, ‘আমরা এখন অপেক্ষা করে থাকব, পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার অথবা রাজশাহী থেকে কক্সবাজার আবার দক্ষিণ অঞ্চলের সুন্দরবন থেকে কক্সবাজার, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুরই বাদ যাবে কেন, সমগ্র বাংলাদেশ থেকেই যেন আসা যায়, সেই ব্যবস্থাটা আমরা নেব। কক্সবাজারবাসীকে আমরা বলব আমাদের অঞ্চলেও যাবেন, বেড়াতে যাবেন, ঘুরতে যাবেন। আমি বিশ্বাস করি পর্যটন ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন আসবে।’
সরকারপ্রধান বলেন, ‘সেই ছোটবেলা থেকে শুনতাম চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত রেললাইন ছিল, দোহাজারী থেকে কক্সবাজার রেললাইন কবে আসবে। আজকে কক্সবাজার পর্যন্ত করা হয়েছে, এটা রামু পর্যন্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক যোগাযোগের মাধ্যমে আসতে চাই, ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গে আমরা সংযুক্ত হতে চাই। কাজেই সেটা মাথায় রেখে পরিকল্পনাটা নেয়া হয়েছে।’
মানুষের সেবার বিষয়টি বিবেচনা করেই সরকার কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা যখনই কোনো কাজ করি আমরা সেটাই বিবেচনা করি, মানুষকে আমরা কতটা সেবা দিতে পারি। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম রেলের আলাদা মন্ত্রণালয় করব, কারণ এটা ছিল সড়ক সেতুর সঙ্গে সংযুক্ত। আলাদা মন্ত্রণালয় করে আলাদা বাজেট দেয়া শুরু করলাম। সারা বাংলাদেশকে এ নেটওয়ার্কে নিয়ে আসলাম।’
আন্দোলনের নামে যানবাহনে আগুন দেয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এ দুর্বৃত্ত, তাদের আসলে চোখ না, তাদের মনই অন্ধকার। কাজেই এদের ব্যাপারে সবাইকে সাবধান থাকতে হবে। এরা ধ্বংস জানে, সৃষ্টি করতে পারে না। আমরা সৃষ্টি করি, ওরা ধ্বংস করে।’
সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বিরোধীদলীয় নেতাদের চোখে পড়ে না মন্তব্য করে তাদের ডাক্তার দেখানোর পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমি জানি যে আমাদের বিরোধী দল, তারা আমাদের উন্নয়নটা চোখে দেখে না। এগুলো বলার কিছু নাই। চোখ থাকতে যারা অন্ধ হয় তাদের আর কী বলব। তাদের একটা পরামর্শ দিতে পারি—আমি কিন্তু ঢাকায় খুব আধুনিক আই ইনস্টিটিউট করেছি, চোখ থাকতেও যারা অন্ধ তারা সেই আধুনিক আই ইনস্টিটিউটে গিয়ে চোখটা দেখিয়ে আসতে পারেন। মাত্র ১০ টাকার টিকিট লাগে, বেশি লাগে না। আসলে তাদের চোখের দোষ না, মনের দোষ।’
কক্সবাজারে আইকনিক রেলস্টেশন ও দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথের উদ্বোধন করে ট্রেনে করে রামুতে যান প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে তিনি বেলা সাড়ে ৩টার দিকে মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের টাউনশিপ মাঠে মহেশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় পৌঁছান। সেখানে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রথম টার্মিনালের নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং চ্যানেলের উদ্বোধনসহ ১৪টি সমাপ্ত প্রকল্পের উদ্বোধন এবং চারটি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
জনগণের কল্যাণ করাটাই একমাত্র কাম্য মন্তব্য করে মহেশখালীর জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষকেই আমি আমার পরিবার হিসেবে নিয়েছি। আপনাদের মাঝেই আমি ফিরে পেয়েছি আমার বাবার স্নেহ, মায়ের স্নেহ, ভাইয়ের স্নেহ। কাজেই আপনাদের কল্যাণের জন্য, আপনাদের উন্নয়নের জন্য আমি যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত। প্রয়োজনে বাবার মতো বুকের রক্ত দিতেও প্রস্তুত। শুধু আপনাদের কল্যাণ করাটাই আমার একমাত্র কাম্য।’
তিনি বলেন, ‘আমার হারাবার কিছু নেই। পাওয়ারও কিছু নেই। শুধু একটাই কাজ যে বাংলাদেশের মানুষ যেন ভালো থাকে। বাংলাদেশের মানুষ যেন উন্নত থাকে। আমার বাবার স্বপ্নটাই আমি পূরণ করতে চাই।’
শিগগির মূল্যস্ফীতি কমে আসবে আশ্বস্ত করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে দেশের মানুষের উন্নয়ন। আর সেই উন্নয়নের জন্যই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমি ওয়াদা দিয়েছিলাম প্রত্যেক ঘরে বিদ্যুৎ দেয়া হবে। আজকে আমরা প্রত্যেক ঘরে বিদ্যুৎ দিচ্ছি। দুঃখের বিষয় হলো, যখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বাধল, স্যাংশন-কাউন্টার স্যাংশন, যার ফলে মুদ্রাস্ফীতি একটু বেড়েছে কিন্তু সেটাও নিয়ন্ত্রণের আমরা চেষ্টা চালিয়েছি। ইনশা আল্লাহ খুব শিগগির মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাবে। মানুষ আরো ভালোভাবে চলতে পারবে, থাকতে পারবে।’
এদিন প্রধানমন্ত্রী আরো যেসব প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তার মধ্যে রয়েছে কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বাঁকখালী নদীর ওপর সেতু ও অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ, ২১২ একর ভূমি ভরাট, ৪ দশমিক ৭৮ কিলোমিটার স্লোপ প্রটেকশন বাঁধ নির্মাণ, সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ডিজাইন ও স্থাপনাকরণ প্রকল্প এবং গোরকঘাটা-শাপলাপুর সড়ক প্রশস্তকরণ।
পাশাপাশি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প মাতারবাড়ীতে ১২০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে কুতুবদিয়া দ্বীপকে জাতীয় গ্রিডে সংযুক্তকরণ প্রকল্পও উদ্বোধন করেন তিনি। কক্সবাজারের রামু উপজেলায় কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) নির্মাণ প্রকল্পটিও ছিল উদ্বোধনের তালিকায়।
এছাড়া কৈয়ারবিল থেকে চৌকিদারপাড়া পর্যন্ত সিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ, বীর মুক্তিযোদ্ধা পৌর বাস টার্মিনাল সম্প্রসারণ ও উন্নয়নকাজ এবং জাহানারা ইসলাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ইউনুছখালী নাছির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়, রত্না পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় এবং মরিচ্যা পালং উচ্চ বিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়।










