জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিকাজে ভূগর্ভস্থ পানির অধিক ব্যবহারের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে। ফেনী পৌরসভা এলাকায় তিনটি ট্যাংকের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করছে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। তবে পানিতে ময়লা থাকায় গ্রাহকরা পৌরসভার এ সুবিধা নেয়া এক রকম বন্ধ করে দিতে শুরু করেছে। সুপেয় পানির সংকট নিরসনে সাড়ে ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (পানি শোধনাগার) স্থাপন করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। ২০২৩ সালে কাজ শেষে অবকাঠামোটি পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। তবে এরপর দুই বছর পার হলেও প্লান্টটি চালু করতে পারেনি পৌরসভা কর্তৃপক্ষ।
পৌরসভার বাসিন্দারা বলছেন, শোধনাগারটি চালু না করায় একদিকে শহরের মানুষ সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকল্পের বিভিন্ন সরঞ্জাম বিকল হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য পৌরসভা কর্তৃপক্ষ বলছে, নতুন প্রকল্পটি দ্রুত চালুর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৩৬টি জেলা শহরে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন প্রকল্পের আওতায় ফেনী পৌরসভার হাসপাতাল মোড় সংলগ্ন বিরিঞ্চি এলাকায় স্থাপন করা হয় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্প। দরপত্র আহ্বানের পর ২০১৯ সালে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের এ কাজটি দুই বছর মেয়াদে বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় শামীম ট্রেডার্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সাড়ে ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে আড়াই লাখ ঘনমিটার পানি ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন এ প্রকল্পে নয়টি গভীর নলকূপ ও ৪০ কিলোমিটার সরবরাহ লাইন স্থাপন করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কভিডের সময় কাজের গতি কমে যাওয়ায় ২০২৩ সালে প্রকল্পটি শেষ করে পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। সেই থেকে পড়ে আছে অবকাঠামোটি।
পৌরসভার বাসিন্দারা জানান, পৌর এলাকায় তিনটি পানির ট্যাংকের মাধ্যমে নাগরিকদের পানি সরবরাহ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পুরনো ওই প্রকল্পের আওতায় ২ হাজার ৬০০ গ্রাহক প্রতি গ্যালন পানি (১০০০ লিটার) আবাসিকে ৯ টাকা ও বাণিজ্যিকে ২২ টাকা হারে বিল পরিশোধ করে। তবে সরবরাহ করা পানিতে ময়লা থাকায় গ্রাহকরা পৌরসভার এ সুবিধা নেয়া বন্ধ করতে শুরু করেছে। পৌরসভা থেকে চাহিদামতো সুপেয় পানি না পেয়ে অনেকে বাধ্য হয়ে পৌর এলাকায় গভীর নলকূপ বসাচ্ছেন।
পৌরসভার বাসিন্দা মো. বেলাল হোসেন বলেন, ‘পৌরসভায় পুরনো পানির ট্যাংকগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে পড়েছে। এসব ট্যাংক থেকে সরবরাহ করা পানির গুণগত মান ভালো না থাকায় বাধ্য হয়ে মানুষ গভীর নলকূপ বসিয়ে পানি তুলছে। শোধনাগারটি চালু করা গেলে শহরের অন্তত দুই লাখ মানুষ সুপেয় পানি পেত। এতে একদিকে মানুষের উপকার হতো, অন্যদিকে পৌরসভার রাজস্ব আহরণ বাড়ত।’
সরজমিনে দেখা গেছে, সীমানাপ্রাচীর ঘেরা প্রকল্প এলাকার প্রধান ফটকে তালা ঝুলানো রয়েছে। প্রকল্পটির নির্মাণকাজ ২০২৩ সালে শেষ হলেও ২০২০ সালে এটি উদ্বোধন হয়েছে মর্মে স্থাপন করা ফলক দেখা গেছে। ভেতরের বিভিন্ন লোহার সরঞ্জামে মরিচা ধরে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। নষ্ট হয়ে গেছে ইলেকট্রিকের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি। প্রকল্পটি কেন বা কী কারণে স্থাপন করা হয়েছে, বিষয়টি জানেন না স্থানীয়রাও।
পৌরসভার একাধিক সূত্র জানায়, প্রকল্পটিতে ৪০ কিলোমিটার পানি সরবরাহ লাইন স্থাপন করা হয়েছে। পরে ফেনী পৌরসভার উদ্যোগে আরো ৪০ কিলোমিটার সরবরাহ লাইন স্থাপনের কাজ শেষ হলে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর পরিকল্পনা নেয়া হয়। পরিকল্পনা মোতাবেক অতিরিক্ত ৪০ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন করতে ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে পৌরসভা থেকে আরিফ নামে এক ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেয়া হয়। কিন্তু গত বছরের ৫ আগস্টের পর ওই ঠিকাদার পালিয়ে গেলে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এর পর থেকে প্রকল্পটি থমকে আছে। শোধনাগার চালু না হওয়ায় নিয়োগপ্রাপ্ত পাম্প অপারেটরকে পৌরসভার অন্য বিভাগে নিয়োজিত রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে পৌরসভার প্রশাসক (উপসচিব) গোলাম মো. বাতেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০২৪ সালের বন্যায় পানি শোধনাগারটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আমরা এটি দ্রুত চালু করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি। আশা করি প্রয়োজনীয় মেরামত ও লাইন স্থাপনকাজ শেষে শিগগিরই প্লান্টটি চালু করতে পারব।’










