চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন শেড ও ইয়ার্ডে জমে আছে দীর্ঘদিনের পুরনো রাসায়নিক পণ্য। এর মধ্যে আছে বিপজ্জনক পণ্যবাহী কনটেইনারও। চিহ্নিত এসব বিপজ্জনক পণ্য দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরটির জন্য যেকোনো সময়ে বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে খোদ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য আরেকটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বিপজ্জনক পণ্য চিহ্নিত করতে না পারা। অনেক ক্ষেত্রেই আমদানি হওয়া রাসায়নিক পণ্যের গায়ে মূল উপাদানের নাম না লিখে কেবল ওই দ্রব্য কী কাজে ব্যবহার হবে তা লেখা থাকে। লেবেল না থাকায় সব ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক দ্রব্য বন্দরে চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না। ফলে মজুদের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে না পারায় তৈরি হয় বিস্ফোরণের ঝুঁকি।
বন্দর কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন শেডে প্রায় চার হাজার টন পণ্য ও বিভিন্ন ইয়ার্ডে প্রায় পাঁচ হাজার কনটেইনার জমেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিপজ্জনক পণ্য থাকায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি ছাড়াও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম। চট্টগ্রাম বন্দরের ১৪টি শেডের মধ্যে বিপজ্জনক পণ্য রাখা হয় মূলত ‘পি শেডে’। প্রায় ৩০ হাজার ৩৭৫ বর্গফুট আয়তনের এ শেড থেকেই পণ্য সরাসরি খালাস দেয়া হয়। এছাড়া বন্দরের কনটেইনার রাখার চত্বরগুলোতেও ক্যাটাগরি অনুযায়ী বিপজ্জনক পণ্যবাহী কনটেইনার রাখা হয়। হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, হাইড্রোক্লোরাইড, সালফেট, কস্টিক সোডা, ফার্মাসিউটিক্যালসের কাঁচামাল, রঙ তৈরির কাঁচামাল, টেক্সটাইল কেমিক্যাল, পারফিউমারি, ফিক্সিট সিলিকন, এস্ট্রোজেন, সারফেস অ্যাক্টিভ ক্লিনিং প্রভৃতি বেশির ভাগই দাহ্য ও বিস্ফোরকজাতীয় পদার্থ। পি শেডে সব ধরনের দাহ্য ও অদাহ্য পদার্থ একত্রে ঠাসাঠাসি করে রাখার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার রাসায়নিক শ্রেণী বিভাগও করা হয়নি। দেশের শতকরা ৯৮ ভাগ আমদানি হওয়া দ্রব্যই আসে চট্টগ্রাম বন্দরকে ব্যবহার করে।
বিপজ্জনক পণ্য নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে এরই মধ্যে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দরের পক্ষ থেকে দেয়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিপুল পরিমাণ বিপজ্জনক পণ্যসহ চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরে পণ্য পড়ে থাকার ফলে দুর্ঘটনা এবং পরিবেশ ও মানবদেহের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করেছে। এছাড়া এতে বন্দরের পণ্য সংরক্ষণে স্থান সংকট তৈরি করে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে এ-সংক্রান্ত একটি বৈঠকে গত ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ধ্বংস ও নিলাম কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরে পি শেডে সাত লট পণ্য ও বিভিন্ন ইয়ার্ডে ৩৬৮ টিইইউএস (টোয়েন্টি ফিট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিটস) বিপজ্জনক পণ্যবাহী কনটেইনার রয়েছে। পাশাপশি ৩৮৪ টিইইউএস পচনশীল পণ্য ও ৪ হাজার ৩০০ টিইইউএস সাধারণ পণ্যবাহী কনটেইনার নিলাম বা ধ্বংসের অপেক্ষায় রয়েছে। সর্বশেষ গত ২ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বন্দরের অভ্যন্তর থেকে দীর্ঘদিনের পুরনো এসব পণ্য নিলাম কিংবা ধ্বংসের ওপর জোর দেয়া হলেও বিভিন্ন জটিলতায় শুল্ক বিভাগ কর্তৃক সব ধরনের বিপজ্জনক পণ্য ও পণ্যবাহী কনটেইনার ধ্বংস করা হয়নি।
মন্ত্রণালয়ে দেয়া চিঠিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যেমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করার অনুরোধ জানিয়ে আরো উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন শেড ও ইয়ার্ডে পড়ে থাকা এসব পণ্য ধ্বংস কিংবা নিলামে বিক্রির দায়িত্ব মূলত শুল্ক আইন, ১৯৮২ অনুযায়ী শুল্ক বিভাগের ওপর ন্যস্ত। বন্দরের অভ্যন্তরে পড়ে থাকা এ ধরনের পণ্যের ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে শুল্ক বিভাগকে নিয়মিত অনুরোধ জানানো হচ্ছে। সংস্থাটি বিভিন্ন সময়ে কিছু কিছু পণ্য ধ্বংস কিংবা নিলামে বিক্রি করেছেও। কিন্তু প্রতিনিয়ত যে পরিমাণ পণ্য ও কনটেইনার জমে যায় তার বিপরীতে নিলাম বা ধ্বংসের হার নগণ্য।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরে থাকা বিপজ্জনক পণ্য সরানোর ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে যে বড় বিপদের কারণ হতে পারে সেটা আমরা অবহিত করে আসছি। এরই মধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। তবে যে পরিমান জমে আছে সে অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না। নিরাপত্তা বিবেচনায় এখানে আরো দ্রুত কাজ করা জরুরি।’
জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে বিপজ্জনক সব রাসায়নিক দ্রব্য নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল অথরিটি ফর কেমিক্যাল ওয়েপনস কনভেনশন (বিএনএসিডব্লিউসি)। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় সংস্থাটির চেয়ারম্যান জানান, রাসায়নিক দ্রব্য বিরূপ পরিবেশে বিস্ফোরিত হতে পারে এবং বিপর্যয় ঘটাতে পারে। এ নির্দেশনা অনুযায়ী বিএনএসিডব্লিউসি থেকে বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি চট্টগ্রাম বন্দরসহ মোংলা ও বেনাপোল পরিদর্শন করেছে।
বিএনএসিডব্লিউসি পরিদর্শনের পর রাসায়নিক দ্রব্য মজুদজনিত ঝুঁকি চিহ্নিত করে যে ফিডব্যাক রিপোর্ট দেয়া হয়েছে তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া কেমিক্যাল পণ্যের গায়ে কোনো লেবেল না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক দ্রব্য বন্দরে চিহ্নিত করা যায় না। ফলে মজুদের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে সতর্কতা অবলম্বন করা সম্ভব হয় না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কাস্টমস আইনে অকশন করার প্রক্রিয়া বলা আছে। পণ্য আমদানির পর ৩০ দিন পার হলে কাস্টমস প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পণ্য নিলামে তোলা হয়। তবে দাহ্য পদার্থ বা বিপজ্জনক পণ্যের জন্য আলাদা করে নিলাম হয় না। নিয়মানুযায়ী সর্বোচ্চ দর পেলে তা বিক্রির অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু প্রক্রিয়ামতে তিনবার অকশন করতে মাসের পর মাস লেগে যায়। আবার অকশন করতে গেলে স্বার্থান্বেষী মহল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাধা দেয়।
চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মো. ফখরুল আলম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, আমদানিকারক যদি পণ্য এনেও সময়মতো খালাসের পদক্ষেপ না নেয় তখন আমরা নিলামের পদক্ষেপ নিতে পারি। পরবর্তী সময়ে অকশন প্রক্রিয়ায়ও যদি এর সুরাহা না হয় তখন ধ্বংসের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে নিয়মিতভাবে ধ্বংস করা হলে এভাবে বিপজ্জনক পণ্যের স্তূপ জমবে না।
বিপজ্জনক পণ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থা প্রণীত ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ডেঞ্জারাস গুডস বা আইএমডিজি কোড আছে। এতে নয়টি ক্যাটাগরির পণ্যের একটি তালিকা রয়েছে। এর মধ্যে আছে বিস্ফোরক, বিপজ্জনক গ্যাস, দাহ্য তরল ও কঠিন পদার্থ, বিষাক্ত ও তেজস্ক্রিয় পদার্থ।
চট্টগ্রাম চেম্বার ও পোর্ট ইউজারস ফোরামের সভাপতি মাহবুবুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাসায়নিক পদার্থসহ বিপজ্জনক পণ্য বিশ্বজুড়ে পরিবহন হচ্ছে। দেশে আমদানির পর বিপজ্জনক পণ্য কতদিন রাখা হচ্ছে এবং কীভাবে রাখা হচ্ছে এ বিষয়ে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। সাধারণ কেমিক্যালও উত্তপ্ত পরিবেশে বিস্ফোরক দ্রব্যে পরিণত হতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরের শেডে পণ্য পুড়ে ছাই কিংবা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন সময়ে। যেসব আমদানি পণ্য একটা নির্দিষ্ট সময় পরও কেউ গ্রহণ করছে না তা দ্রুত ধ্বংসের ব্যবস্থা ছাড়াও নিরাপদ ও উপযুক্ত পরিবেশে তা সম্পন্ন করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।










