নড়াইলের কালিয়ায় নবগঙ্গা নদীতে ৬৫১ দশমিক ৮৩ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুর নির্মাণকাজ শুরু থেকেই ধীরগতিতে করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কার্যাদেশ অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জুনে সেতুর কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তখন অগ্রগতি ছিল মাত্র ২৩ শতাংশ। পরে আরো দুবার সময় পেয়েও তারা কাজ শেষ করতে পেরেছে ৬০ শতাংশের মতো। আরেকবার সময় বৃদ্ধির জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি লেখা হয়েছে।
এদিকে দীর্ঘ সময়েও সেতুর নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় ক্ষুব্ধ এ পথ দিয়ে চলাচলকারীরা। সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে নদী পার হতে হয় এ অঞ্চলের প্রায় তিন-চার লাখ মানুষকে। তাই দ্রুত সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করার আহ্বান জানিয়েছে এলাকাবাসী।
নড়াইল সড়ক ও জনপথ (সওজ) অফিস সূত্রে জানা গেছে, নড়াইল-কালিয়া সড়কের নবগঙ্গা নদীর উপর বারইপাড়া সেতু নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। প্রায় ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৫১ দশমিক ৮৩ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ১০ দশমিক ২৫ মিটার প্রস্থের সেতুটির কার্যাদেশ দেয়া হয়েছিল ২০১৮ সালের ১৮ মার্চ এবং কার্যাদেশ অনুযায়ী ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। যদিও নির্ধারিত সময় পর্যন্ত মাত্র ২৩ ভাগ কাজ সম্পন্ন হওয়ায় সওজ ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদেও কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হন ঠিকাদার। করোনার অজুহাতে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ করতে আবার সময় বাড়ানো হয়, এবার ২০২১ সালের ৩০ জুন। এবারো লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থ ঠিকাদার। সড়ক বিভাগের তথ্যানুযায়ী, কাজ শেষ হয়েছে ৬০ শতাংশের মতো। তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ, সেতুর কাজ এখনো ৫০ ভাগও শেষ হয়নি!
যৌথভাবে সেতুটি নির্মাণ করছেন যশোরের ঠিকাদার মো. মইনুদ্দীন বাসী ও মো. জামিল ইকবাল।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঘাট দিয়ে নৌকায় অসংখ্য মানুষ পারাপার হচ্ছে। একটি মোটরসাইকেল নৌকায় তোলা হচ্ছে তিন-চারজনের সহযোগিতায়। সেতু নির্মাণে প্রকল্প এলাকায় ১০-১২ জন শ্রমিক কাজ করছেন। তারা মাঝ নদীতে একটি পিলারের কাজ করছিলেন। যদিও মূল সেতুর কয়েকটি পিলারের কাজ ছাড়া আর কোনো কাজই করা হয়নি। দুপাশে সংযোগ সড়কের কাজ এখনো শুরুই হয়নি!
এলাকাবাসী জানায়, নির্মাণকাজের শুরু থেকেই সামান্য কয়েকজন শ্রমিক দিয়ে প্রকল্প এলাকায় কাজ করানো হয়। মাঝেমধ্যে কাজ বন্ধও থাকে। এভাবে ধীরগতিতে কাজ চললে এ কাজ শেষ করতে আরো অন্তত তিন-চর বছর সময় লাগবে। দ্রুত কাজ শেষ করার দাবি জানায় স্থানীয়রা।
বারইপাড়া ঘাটে সেতু না থাকায় উপজেলাটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে রয়েছে। নদীর একপাশে আটটি ও অন্যপাশে ছয়টি ইউনিয়ন। কালিয়া উপজেলাকে নড়াইল জেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে এ নদী। জেলা সদরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় এ উপজেলার লাখ লাখ মানুষকে। সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের জন্য কালিয়ার বারইপাড়া ঘাটে একটি সেতু নির্মাণ এলাকাবাসীর প্রাণের দাবি, যা এখন ঝুলে আছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে।
কালিয়া উপজেলার বাবরা গ্রামের আসলাম শেখ জানান, প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বারইপাড়া ঘাট দিয়ে নদী পার হয়ে অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, হাসপাতালে বিভিন্ন প্রয়োজনে যাতায়াত করে। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় এখানে গড়ে ওঠেনি কোনো শিল্প-কলকারখানা।
কালিয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা মুশফিকুর রহমান লিটন জানান, মারামারির ঘটনা ঘটলে থানা থেকে পুলিশ যথাসময়ে আসতে পারে না। কালিয়ায় আগুন লাগলে দ্রুত পৌঁছাতে পারে না ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ও জরুরি রোগী পরিবহনের অ্যামু্বলেন্স। ঘাটে যেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় নদী পার হতে। অবশেষে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে কাজ চলছে ধীরগতিতে। বারবার সময় পেলেও কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হচ্ছে ঠিকাদার। দ্রুত কাজ শেষ করার আহ্বান জানান তিনি।
নড়াইল সড়ক বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এএম আতিকুল্লাহ বলেন, নতুন করে ২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানোর জন্য ওপর মহলে লেখা হয়েছে। এরই মধ্যে সেতুটির কাজ ৫৫-৬০ শতাংশ শেষ হয়েছে। আশা করছি, আগামী বছরের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হবে।
নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য কবিরুল হক মুক্তি বলেন, বর্তমান সরকারের উন্নয়ন মহাসড়কের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সদিচ্ছায় বারইপাড়া সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলেও সত্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের ধীরগতির কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে পারেনি। আমি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অফিসসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি যেন দ্রুত সেতুর কাজ শেষ করে তারা। আশা করছি, দ্রুত এ কাজ শেষ করে নড়াইল ও কালিয়া উপজেলার পথচারীদের পারাপার সহজ করে দেয়া হবে।










