সারা দেশের মানুষ ঈদের আনন্দে মাতোয়ারা। চোখের সামনেই ট্রেনে কত স্বপ্ন বাড়ি এল। কিন্তু ঈদের আনন্দ ছোঁয়নি ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন স্টেশনের ভাসমান ও ছিন্নমূল মানুষকে। তাদের জীবনের একই রুটিন। শুধু পেটের দায় মেটানো।

এসব হতদরিদ্র মানুষ জানায়, প্রতিনিয়তই তাদের ব্যস্ত থাকতে হয় জীবন বাঁচানোর সংগ্রামে। ‘বড় বড় স্যার’দের কাছে হাত পেতে টাকা পেলে তা দিয়ে কিনে খায় খাবার। কোনো সরকারি সাহায্য পায় না।

রেলওয়ে বুকিং অফিসের পাশে ওভারব্রিজে চলাচলরত সবার কাছে সাহায্য চাচ্ছিলেন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ মোবারক হোসেন। তিনি বলেন, ‘ছেলেরা বিয়ে করে যার যার মতো সংসার পেতেছে। ছোট মেয়েটাও অসুস্থ। ওদের মা মারা গেছে ১০ মাস আগে। তাই এখন সবার সাহায্য নিয়েই চলতে হয়। আমাদের ঈদে নেই আনন্দ।’

ঈশ্বরদী জংশনের ৩-৪ নম্বর প্লাটফর্মের দক্ষিণ পাশে ময়লা আর ছেঁড়া কাপড় পরে বসেছিলেন বৃদ্ধ রোমেলা বেগম। কান্ত, শ্রান্ত, বিষণ্ন মুখ। রোমেলা বেগম বলেন, ‘ভিক্ষা করে নিজের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু এভাবে কী আর চলে। ঈদের দিনে সকালে কিছু সেমাই ও রুটি পেয়ে ওই গুলাই খাইছি। এটাই আমার ঈদ।’

নাটোরের সিংড়ার সাজ্জাদ আলীর (৬৫) সঙ্গে প্লাটফর্মের ওই স্থানেই কথা হয়। জানান, গ্রামের বাড়িতে পৈত্রিক কয়েক শতক জমি যা ছিল, তাই বেঁচে রোগের চিকিৎসা করিয়েছেন। ভিটে-মাটি না থাকায় চলে এসেছেন ঈশ্বরদীতে। সেই থেকে স্টেশনেই জীবন কাটে। ভিক্ষাবৃত্তি করেই চলছে জীবন। রমজান আর ঈদে ভিক্ষা অন্য সময়ের চেয়ে বেশি পাওয়া যায় বলে জানালেন তিনি। কিন্তু ঈদ উপলক্ষে সরকারি কোনো সহায়তা তিনি পাননি।

অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার চাটমোহরের জোঁকাদহ গ্রামের লতিফুর রহমানের জীবনে ঈদ বয়ে আনতে পারেনি নিরলস আনন্দ। তিন সন্তানের মধ্যে ১২ ও ১৪ বছরের দুটি ছেলেকে চা স্টল ও গ্যারেজে কাজে দিয়েছেন। স্ত্রী ও ছোট ছেলেকে নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করেন। ১০ দিন আগে এসেছেন ঈশ্বরদীতে। থাকছেন বুকিং অফিস ও প্লাটফর্ম এলাকায়। ফিতরা ও জাকাত তোলার সঙ্গে ভিক্ষা করেছেন। তিনি বলেন, ‘কয়েক দিনে বেশকিছু সহযোগিতা পেয়েছি। সকালে বাড়ি বাড়ি ঘুরে সেমাই-রুটি চেয়ে এনে খেয়েছি। দুপুরে আবার বের হবো। আজকে ভালো খাবার খেতে পেয়েছি। তবে সমস্যা হচ্ছে থাকা নিয়ে। স্টেশনের পুলিশ বারবার চলে যেতে বলছে। আজকে ট্রেন চলছে না। কোথায় কীভাবে যাব বুঝতে পারছি না।’

অল্পতেই তুষ্ট থাকতে চাওয়া এ মানুষগুলো ঈদ এলে উচ্ছ্বসিত হতে পারে না। ছোট ছোট শিশুদের শরীরে নতুন জামা ভাগ্যে জোটেনি। এসব ভাসমান পরিবারের কাছে ঈদ মানে যেন অন্ধকার। কেননা ঈদ উৎসবের তার পরিবারের শিশুদের যে বায়না থাকে, তা মেটাতে পারেন না তারা। যেখানে তাদের দিনের খাবার জোগাতেই অনেক কষ্ট, সেখানে ঈদের আনন্দে পরিবারের চাহিদা মেটাতে না পেরে উৎসবের দিনও তাদের কাছে বর্ণহীন।