চট্টগ্রামের সমুদ্রবেষ্টিত উপজেলা সন্দ্বীপ। সেখানকার ন্যায়মস্তি ইউনিয়নের বাসিন্দা দ্বিজেন্দ্র লাল সাহা (৭৫)। ষাটের দশকে এ কৃষকের সাত হেক্টর ধানি জমি ছিল। কিন্তু সমুদ্রের ভাঙন খেলায় বছর বছরই তিনি অল্প করে জমি হারাতে থাকেন। ১৯৮০ সালের মধ্যে ওই বৃদ্ধের মাথা গোঁজার ঠাঁইসহ পুরো জমিই গ্রাস করে নেয় অকূল দরিয়া। ভাঙতে ভাঙতে এক সময় বঙ্গোপসাগরে বিলীন হয়ে যায় ন্যায়মস্তি ইউনিয়নটি।
বাংলাদেশের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) ১৯৭৩ সাল থেকে সমুদ্র আর নদীগর্ভে জমি বিলীন হওয়ার হিসাব রাখছে। তাদের তথ্যানুসারে, ১৯৭৩-২০২০ পর্যন্ত বাংলাদেশের ১৯টি উপকূলীয় জেলার ১ লাখ ২৪ হাজার ৬০ হেক্টর কৃষিজমি ভাঙনের কবলে পড়েছে। এর মধ্যে কেবল সন্দ্বীপেই সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়েছে প্রায় ৭১ দশমিক ১৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা। বাস্তুচ্যুত হওয়ার পাশাপাশি এখানকার মানুষ তাদের জীবন নির্বাহের অন্যতম উৎস কৃষিজমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।
দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ১৯টিই উপকূলবর্তী। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের ফেনী, নোয়াখালী, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম। বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি, বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ভোলা ও বরগুনা এবং খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট। সব জেলায়ই প্রতি বছর ভাঙনের ফলে কৃষিজমি বিলুপ্ত হচ্ছে।
সিইজিআইএসের ডাটা অনুসারে, প্রতি বছর ২ হাজার ৬৪০ হেক্টর জমি সমুদ্র কিংবা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ১৯৭৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৪৭ বছরে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ১৩ হাজার ৯৯৭ হেক্টর, ভোলা সদর উপজেলার ৯ হাজার ৪৭৯, বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার ৮ হাজার ২৯৯ ও হিজলায় ৭ হাজার ২৭৯ হেক্টর জমি সমুদ্রে বিলীন হয়েছে। আর সব মিলিয়ে পুরো ভোলা জেলায় ৩৮ হাজার ৯৭৬, বরিশালে ১৭ হাজার ৮১০, লক্ষ্মীপুরে ১৫ হাজার ৮, নোয়াখালীতে ১৪ হাজার ১২৩ ও চট্টগ্রামে ৭ হাজার ১১৫ হেক্টর জমি বিলীন হয়েছে নদী কিংবা সমুদ্রগর্ভে।
ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টারের তথ্যানুসারে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে প্রতি বছরই বাংলাদেশের কয়েক হাজার মানুষ ভিটেমাটি হারাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির স্টাডি অনুসারে, ১৮৮০ সালে সন্দ্বীপের প্রধান দ্বীপটির আয়তন ছিল ৫০২ বর্গকিলোমিটার। অতিভাঙনে এ দ্বীপ কমে হয় ২৯০ বর্গকিলোমিটার এবং ১৯৮৪-২০০৭ সালে আরো প্রায় ৪০ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এ বিষয়ে সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সম্রাট খীসা বলেন, ‘সন্দ্বীপের এ দ্বীপ এখন প্রায় ২৫৮ বর্গকিলোমিটার। প্রতি বছরই ভাঙছে নতুন নতুন এলাকা। মানুষ ঘরবাড়ির সঙ্গে সঙ্গে হারাচ্ছে ধানি জমি।’
সন্দ্বীপের ঠিক কতজন কৃষক চাষযোগ্য জমি হারিয়েছেন, তার কোনো সঠিক তথ্য নেই কৃষি বিভাগে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে এ অঞ্চলে জনসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৪২০, ২০১১ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৮ হাজার ৬০৫।
সন্দ্বীপ উপজেলার ভাঙনে কৃষিজমি বিলীন হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে ‘সন্দ্বীপ নদী সিকস্তি পুনর্বাসন সমিতি’র সভাপতি শিব্বির আহমেদ তালুকদার জানান, ভাঙন থেমে নেই। প্রতি বছরই নতুন নতুন এলাকা ভাঙছে। গত কয়েক দশকে সন্দ্বীপের বাসিন্দা ছিল চার লাখ, এখন আড়াই লাখে নেমে এসেছে। এখানে উল্লেখযোগ্য কোনো ধানি জমি নেই এখন আর। নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে কৃষিজমি। মানুষ তাই মাছ ধরা কিংবা অন্য পেশায় ঝুঁকছে।
বৃদ্ধ দ্বিজেন্দ্র লাল সাহা বলেন, ‘১৯৭০ সালের নভেম্বরে প্রলয়ংকরী বন্যা-পরবর্তী সমুদ্রের ভাঙন তীব্রতর হয়। যখন ভাঙন কাছে আসতে থাকে তখন আমরা আমাদের পরিবার নিয়ে অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হই। ওই সময়েই চাষযোগ্য বেশির ভাগ জমি হারিয়ে অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়ি। পরিবারের কর্মক্ষমরা তখন কৃষি ছেড়ে ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের পথ বেছে নিই।’
বঙ্গোপসাগরের তীরে আরেকটি দ্বীপ উপজেলা কক্সবাজারের কুতুবদিয়া। এখানকার ৮০ ভাগ মানুষই কৃষির ওপর নিভর্রশীল। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার কারণে এ দ্বীপও গত ৬০ বছরে নদীগর্ভে ৬০ শতাংশ বিলীন হয়ে গেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণেও উপকূলীয় জেলাগুলোয় ধান উৎপাদন কমছে প্রতি বছর প্রায় ৫ দশমিক ৮ থেকে ৯ দশমিক ১ শতাংশ। কুতুবদিয়া দ্বীপটি ছোট হয়ে আসার কারণ হিসেবে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে জলোচ্ছ্বাসকেও দায়ী করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশেষজ্ঞরা। উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা কোস্ট ট্রাস্টের হিসাবে, গত কয়েক দশকে কুতুবদিয়ার অনেক এলাকা জলোচ্ছ্বাসের কবলে ভেঙে গেছে। কৃত্রিম উপগ্রহ (স্যাটেলাইট) থেকে পাওয়া ছবি বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
কোস্ট ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী জানিয়েছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে উপকূলীয় এলাকার ভাঙন বাড়ছে। ভাঙনে শুধু বসতিই হারায় না, উপকূলীয় মানুষের আয়-রোজগারের প্রধান উৎস কৃষিজমি হারানোর ঘটনাই সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে উপকূলীয় অঞ্চলে শস্য উৎপাদনে পিছিয়ে পড়ার ক্ষেত্রে ভাঙন একটি অন্যতম ঘটনা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এদিকে সার্ক আবহাওয়া গবেষণা কেন্দ্রের (এসএমআরসি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। ২২ বছরের জোয়ারের পানির উচ্চতার পরিমাপ নিয়ে করা এসএমআরসির ওই গবেষণা বলছে, প্রতি বছর কক্সবাজারে দশমিক ৭৮ সেন্টিমিটার, সুন্দরবনের চরছেঙ্গায় দশমিক ৬ সেন্টিমিটার ও হিরন পয়েন্টে দশমিক ৪ সেন্টিমিটার করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। সাম্প্রতিক আরো এক গবেষণায় দেখা গেছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত কারণে ১২ দশমিক ৩৪ থেকে ১৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ উপকূলীয় জমি তলিয়ে যাবে। ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ অব বাংলাদেশ’ শিরোনামে সরকার এ গবেষণা করে।
জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় ভোলার ইলিশা ইউনিয়নের কালুপুরা চরের বাসিন্দা নাদের আলী ব্যাপারী, গাজীপুরা চরের মো. বেলায়েতসহ আরো অনেকেই সদর উপজেলায় গিয়ে থিতু হয়েছেন। এককালে নিজ জমিতে চাষ করে সারা বছরের খোরাকি উঠে আসত তাদের। বর্তমানে কয়েক শতক জমি কিনে কোনো রকমে ঘর তুলে ভিন্ন পেশায় জীবিকা নির্বাহ করছেন। উত্তরাধিকারদের কেউ কেউ কাজ করছেন ঢাকার বিভিন্ন কারখানায়, কেউবা নদীপারের ঘাট এলাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসা করে সংসার চালাচ্ছেন।
উপকূলীয় জমিতে উৎপাদন কমায় খাদ্য আমদানি বাড়ছে
একসময় দেশের প্রধান কৃষি ফসল ধানের ২৫ শতাংশই আসত উপকূলীয় জেলাগুলো থেকে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ভাঙনে জমি বিলীন হওয়ায় বর্তমানে চাষের পরিমাণ এক-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। কৃষিজমি হ্রাস ও উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটাতে প্রতি বছরই আমদানি বাড়াতে হচ্ছে। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশে জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৩ কোটি। সর্বশেষ ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ২৩ শতাংশ বেড়ে লোকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটিতে। একই সময়ে খাদ্য আমদানি বেড়েছে ৯৭৮ শতাংশ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যমতে, ২০০১-০২ অর্থবছরে দেশে চাল আমদানি হয়েছিল মাত্র ১ লাখ ২৬ হাজার টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রধান খাদ্যপণ্যটি আমদানির পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ১৩ লাখ ৫৯ হাজার ১০০ টন। আর চলতি অর্থবছরে চাল আমদানি ১৫ লাখ টন ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করছে সরকার। কৃষিজমি কমে যাওয়া, উপকূলীয় জেলাগুলো থেকে আগের মতো ধান উৎপাদন না হওয়ার কারণেই চাল আমদানির ওপর সরকারি-বেসরকারি নিভর্রতা বাড়ছে।
বরিশাল জেলার কাউনিয়া থানাধীন চরিবাড়িয়া ইউনিয়নের লামছড়ি গ্রামের কৃষক মকবুল ফকির বলেন, ‘দুই বছরের ব্যবধানে ২১ শতক জমি কীর্তনখোলা নদীর ভাঙনে হারিয়ে ফেলেছি। এ জমিতে বছরে সাত-আট মণ ধান হতো। বর্তমানে গ্রামের অন্য প্রান্তে কয়েক শতক জমি কিনে বসতি স্থাপন করেছি।’ গ্রামেই ছোট একটি দোকান দিয়ে কোনো রকমে সংসার চালান বলে জানিয়েছেন এ বৃদ্ধ।
কৃষি অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মোফাজ্জল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উপকূলীয় জেলায় সমুদ্র কিংবা নদীভাঙন চলমান রয়েছে। এতে উপকূলীয় এলাকার মানুষ প্রতিনিয়ত বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, হারাচ্ছে কৃষিজমি। কোথাও কোথাও নতুন করে চর জাগলেও সেসব চরে নতুন করে বসতি স্থাপন, কিংবা ওইসব জমি কৃষির জন্য উপযোগী হতে অন্তত ২০ বছর সময় লাগে। ফলে নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়া জমি নিজের মালিকানায় নিয়ে এসে চাষযোগ্য হতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম লেগে যায়। উপকূলীয় জেলার ভাঙনের কবলে কৃষিজমি হারানোর ঘটনাকে দেশীয় অর্থনৈতিক কাঠামোয় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।’
প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছে আর্থ জার্নালিজম নেটওয়ার্ক (ইজিএন)










