চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থেকে রাঙ্গুনিয়াসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে যাতায়াত সহজ করতে নেয়া হয় সাড়ে সাত কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ প্রকল্প। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পাহাড় ঘিরে সড়কটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। তবে বারবার পাহাড় ও খাদের মাটি ধসের কারণে সড়কটি কয়েক দফা সংস্কারের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। শেষ পর্যন্ত সড়কটির নির্মাণকাজ শেষ করতে অপারগতা প্রকাশ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ফলে প্রায় দুই বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে সংযোগ সড়কটি।

এদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কেন কাজটি সম্পন্ন করতে পারল না কিংবা তাদের কাজে কোনো ঘাটতি আছে কিনা সে বিষয়ে উচ্চতর তদন্তের জন্য এলজিইডির সদর দপ্তরে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে আদালতে মামলা করেছে এলজিইডি। মামলার রায়ের পর নতুন করে প্রকল্পের কাজ শুরু করতে হলে বাজেট বাড়বে বলে জানিয়েছেন এলজিইডি কর্মকর্তারা। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তথ্যমতে, ‘ক্লাইমেট রেসিলেন্ট রোড ইনফ্রাস্ট্র্যাকশন ইন ফ্লাস ফ্লাড এরিয়া অব চিটাগং ডিস্ট্রিক্ট রাঙ্গুনিয়া অ্যান্ড বোয়ালখালী উপজেলা’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০১৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি অনুমোদন দেয় একনেক। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় জুন ২০১৫ থেকে ডিসেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আরটিআইপি-২ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ সরকার সাড়ে সাত কিলোমিটার সড়কটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে। এ প্রকল্পে নির্মাণব্যয় ধরা হয় ২৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

সড়কটির দৈর্ঘ্য ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫৮৮ কিলোমিটার এবং প্রস্ত ২৪ ফুট। সড়ক নির্মাণে দায়িত্ব পায় নিউটেক প্যাসিফিক লিমিটেড নামের ঢাকার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এ সংযোগ সড়কটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। সড়কটি ২০১৯ সালের মার্চের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। এ সংযোগ সড়কের জন্য বোয়ালখালী উপজেলার কালুরঘাট-শ্রীপুর খরনদ্বীপ-ভাণ্ডালজুড়ি পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৫ কিলোমিটার ও রাঙ্গুনিয়ার গুদামঘর থেকে পূর্বমুখী ২০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।

তবে এলজিইডি বোয়ালিয়া উপজেলা কার্যালয় সূত্র জানা গেছে, ২০০৭ সালে কালুরঘাট থেকে ভাণ্ডালজুড়ি হয়ে গুদামঘর পর্যন্ত প্রায় ২৩ কিলোমিটার সড়কটি নির্মাণ ও পুনরায় মেরামত করা হয়েছিল। এরপর ২০০৯ সালে জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) সহায়তায় সড়কের উন্নয়ন করা হয়েছিল।

সরেজমিন চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর জ্যৈষ্ঠপুরা ও খড়নদ্বীপ থেকে রাঙ্গুনিয়ার সরফভাটা গুদামঘর পর্যন্ত নির্মাণাধীন সড়কটিতে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার সড়কটি পাহাড়ি ঢালের পাশ দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। বোয়ালখালীর অংশে শুরুর দিকে কিছুটা সড়ক ঠিক থাকলেও সামনের দিকে সড়কে প্রায় ভেঙে গেছে। সড়কটি যে বারবার সংস্কার করার চেষ্টা করা হয়েছে তা দৃশ্যমান হয়েছে। সড়কটির মূলত চার কিলোমিটার দূরত্বের হলেও উঁচুনিচু হওয়ায় সড়কটির দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে প্রায় আট কিলোমিটারে। সংযোগ সড়কটি পাহাড়ের মাঝে ও পাদদেশ দিয়ে যাওয়ায় ৩১টি সেতু এবং কালভার্ট নির্মাণ করার কথা থাকলেও এখনো সবগুলো নির্মাণ করা হয়নি। তবে সামনে এবং দুই পাশের মাটি ধসে যাওয়ায় এ সেতু ও কালভার্টগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এছাড়া অনেক জায়গায় সড়কটির মাটি ধসে যাওয়ায় বিকল্প পথেও সড়কটি সম্প্রসারণের চেষ্টা করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার ৮ নং শ্রীপুর খরনদ্বীপ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. মোকাররম বলেন, সংযোগ সড়কটি নির্মাণ হলে বোয়ালখালীর সঙ্গে রাঙ্গুনিয়াসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের যাতায়াত ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হতো। যাত্রা সময় কমে আসত। সড়কটির বেশ খানিকটা কাজ সম্পন্ন করা হয়েছিল। কিন্তু পাহাড়ি এলাকায় সড়কটি যেখানে নির্মাণ হচ্ছে তার পাশে পানির ছড়া ও খাদই বেশি। তাছাড়া এখানকার মাটি বেলে ও ধসে যাওয়ায় সড়কটি বারবার ভাঙনের কবলে পড়েছে। ফলে কয়েক দফায় সংস্কার করেও কোনো কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত ঠিকাদার কাজ বন্ধ করে দিয়ে চলে গেছেন।

এদিকে এলজিইডি কর্মকর্তারা জানান, সড়কটির নির্মাণকাজ প্রথমে যে ঠিকাদার শুরু করেছিলেন, তিনি কাজ সম্পন্ন করতে পারেননি। বারবার সংস্কার করতে ব্যর্থ হওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা সড়কটির নির্মাণকাজ শেষ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। কিন্তু আইন অনুযায়ী তাদের কাজটি সম্পন্ন করার কথা ছিল। যেহেতু তারা কাজ করতে আগ্রহী নন, সেজন্য তাদের ১ কোটি টাকা জরিমানাও করা হয়েছিল। নতুন করে প্রকল্প নিয়ে সড়কটির বাকি অংশের কাজ সম্পন্নের জন্য দরপত্রসহ অনান্য কাজ শুরু হয়নি। এছাড়া আগের ঠিকাদার প্রায় ২০ কোটি টাকার কাজ করেছেন, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে। প্রকল্পের বাকি অংশ শেষ করতে এবং ভাঙা অংশ সংস্কার করতে হলে নতুন করে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। যার কারণে প্রকল্প ব্যয় বাড়তে পারে।

এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী একেএম আমিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, বোয়ালখালী থেকে রাঙ্গুনিয়া পর্যন্ত যে সংযোগ সড়কটির নির্মাণকাজ শুর হয়েছিল সেটি আপাতত বন্ধ। আগের ঠিকাদার কাজটি শেষ করতে না পারায় আমাদের নতুন করে ঠিকাদার নিয়োগ করতে হবে। কেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি শেষ করতে পারল না এবং তাদের কী কী ঘাটতি ছিল সে বিষয়ে প্রতিবেদন ঢাকায় পাঠিয়েছি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আমরা আদালতে মামলা করেছি। আদালতের রায়ের পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।