নাগরিকরা এখন আর স্বপ্ন দেখে না। নেতা নেত্রীরা স্বপ্ন দেখলেই কেবল তারা স্বপ্ন দেখেন। এছাড়া ব্যক্তির বিকাশ বাঁধাহীন না হবার কারনেই দেশে বৈষম্য বাড়ছে। এটি কমাতে হলে ব্যক্তির বিকাশ বাধাহীন করতে হবে। সেখানে কার্ল মার্ক্স এর দর্শন বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার আব্দুল গফুর মেমোরিয়াল লেকচার-২০২১ এ এসব কথা বলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।

রাজধানীর আগারগাঁও-এ বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সম্মেলন কক্ষে এ লেকচার অনুষ্ঠিত হয়।  ‘মার্কস স্টাডিস ইন বেঙ্গল: সাম ক্রিটিক্যাল রিফ্লেকশনস’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, বিশ্বের যেকোন স্থানে যখন কোন ঘটনা ঘটেছে তখন কার্ল মার্ক্স উঠে আসেন। এটা তার জীবন্ত  উপস্থিতি। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে মার্কস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।  বিশ্বের  যেখানে  বৈষম্যের  ঘটনা ঘটেছিল সেখানেই মার্কস প্রতিবাদী হয়ে এসেছে। কিন্তু বাংলা ভাষায় মার্কসকে খুব বেশি তুলে ধরা হয়নি। মার্কসীয় তথ্যগুলোর নিয়ে আরও বেশি গবেষণা হওয়া দরকার।

বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। বক্তব্য রাখেন সেন্টার ফার পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাণীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, বিআইডিএসের সাবেক গবেষণক রুশিদান ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম এ আকাশ প্রমুখ।

অনুষ্ঠানের শুরুতে গত ১০০ বছরে বাংলা ভাষায় কিভাবে মার্কসীয় দর্শন অধ্যায়ণ হয়েছে এবং বাংলা অঞ্চলে মার্কসীয় অধ্যায়ন হয়েছে সে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তবে মার্কসীয় চিন্তার প্রভাব বিআইডিএস এর বিভিন্ন গবেষকদের মধ্যে ৮০ দশক পর্যন্ত আমরা দেখেছি। ৯০ দশক থেকে এটা আস্তে আস্তে ক্ষয় হতে থাকে এবং অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। মার্কসীয় দর্শণ দ্বারা কাজী নজরুল ইসলামের লেখা প্রভাবিত হয়েছিল বলে জানান অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। নজরুলের বিভিন্ন কবিতা, গদ্যে মার্কসীয় চিন্তা এবং সাম্যবাদী চিন্তার প্রভাব ঘনিষ্টভাবে পাওয়া যায়। তার বিভিন্ন কবিতা ও গদ্যে শ্রেণী শোষণ, ধনী গরীবের বৈষম্য, লিঙ্গ বৈষম্যের কথা আছে। এছাড়া ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অনুরোধে তিনি আন্তর্জাতিক গানের বাংলা অনুবাদ করেন। ১৯২৭ সালে নজরুলের করা অনুবাদ গনবানী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এছাড়া ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, মানিক বন্দোপাধ্যায় মার্কসীয় দর্শন দ্বারা প্রভাবিত ছিল। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের খবর বাংলায় পৌঁছানোর পর মার্কস এর লেখার প্রতি আগ্রহ অনেক বেড়ে যায়। রুশ বিপ্লবের পর থেকে ব্রিটিশ ভারতে যেন মার্কসীয় দর্শনের প্রভাব না পড়ে সেদিকে ব্রিটিশদের নজর ছিল মাত্রারিক্ত। তখন কার্ল মার্কস, লেলিনের একটা বই বহন করাও ছিল সাংঘাতি ঝুঁকি। সেই সময় এমন বই কঠোর গোপনীয়তার সাথে আনা নেওয়া করা হতো।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা বলেন, মার্কসীয় দর্শন কাজে লাগিয়ে বৈষম্যহীন সমাজ গঠন করতে হবে। এক শ্রেণীর মানুষের হাতে বিপুল সম্পদ, আর বড় অংশের হাতে কিছুই থাকবে না এটা হতে পারে না। মার্কস ও লেলিনের উপর গবেষণা  বাড়ানো দরকার।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, মার্কস  এর বিষয়গুলো আরও বেশি বেশি অনুবাদ হওয়া উচিত ছিল। কেন এত কম অনুবাদ হয়েছে  সেটিই বড় প্রশ্ন। কার্ল মার্কসের মতো চিন্তার জগতে যারা পথিকৃত্ ছিলেন তাদের  খুঁজে  বের করে চর্চা করতে হবে। এ বিষয়ে আমাদের  সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দেশের প্রবৃদ্ধিমূলক অর্থনীতি অলৌকিক ও বায়বীয়। সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার উপস্থিতি এখানে অনুপস্থিত থাকে। কভিডকালে নতুন ভঙ্গুরতা তৈরি হয়েছে। সেটি সমাধানে সফল হতে পারছি না। গড় আয়ের উচ্ছাস বৈষম্যকে কোনভাবেই কোন ধারনা দিচ্ছে না। আমরা স্বৈরাচার বিরোধীর আন্দোলনের অনেক পরিকল্পনা করেছি এই বিআইডিএসের সম্মেলন কক্ষে বসে। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে আধাসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে বসে আন্দোলনের রুপরেখা তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু আজকের দিনে সেটি কি সম্ভব? দেশের ৮৫ ভাগ মানুষের হাতে কিছু নেই, আর ১৫ ভাগ মানুষের হাতে অধিকাংশ সম্পদ ব্যাপক বৈষম্য সৃষ্টি করছে। মার্কস এর শ্রেণী বৈষম্যের পাশাপাশি আরও নানা রকম বৈষম্য আমাদের সমাজে বিরাজমান। তবে গনতন্ত্রের প্রতি মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গি কি সেটি নিয়ে আরো গবেষনা হতে পারে।

আব্দুল গফুর স্মারক বক্তব্য তুলে ধরে ড. বিনায়ক সেন বলেন, আব্দুল গফুর বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ছিলেন। তিনি পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এটি তৃতীয়বারের মত তার স্মরণে লেকচার হচ্ছে। পুজিবাদে প্রযুক্তির অভারিত উন্নতির যে বিষয়টি রয়েছে সেটি মার্ক্স অস্বীকার করে নি। বাংলাদেশের ৭২ এর সংবিধানে মার্ক্সের উপস্থিতি রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু একচেটিয়া পুজিবাদের বিকাশ হোক সেটি কখনই চাননি। পাকিস্থান আমলের ২২ পরিবারের সৃষ্টি হোন সেটি বঙ্গবন্ধুর কাম্য ছিলো না।

অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, মার্কসকে জানতে হলে মার্কস এর মূল বই পড়তে হবে। মার্কসের নিজস্ব ভাষায় লেখা বই আমরা পড়ি নাই। ইংরেজীতেও কম পড়েছি। বাংলায়তো বই নেই বললেই চলে।

ড. রুশিদান ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের জন্য মার্কস ও লেলিন চিন্তার প্রয়োগ কিভাবে করা যায় সেজন্য গবেষণা করতে হবে। পুঁজি ও উদ্বৃত্ত উত্পাদনের বিষয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে। কেননা ক্ষুদ্র কৃষকরা শোষিত হচ্ছে মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের মাধ্যমে। সমাজতন্ত্র আমাদের মনে আছে। কিন্তু সেটাকে কাজ লাগাতে হবে।