সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশে বেশকিছু ফসলের উৎপাদন ব্যাপক মাত্রায় বেড়েছে। উৎপাদন বৃদ্ধির দিক থেকে এসব ফসলের মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে আলু। এরই মধ্যে দেশে কৃষিপণ্যটির উৎপাদন এক কোটি টন ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশও উঠে এসেছে বৈশ্বিক উৎপাদনে শীর্ষ দশের তালিকায়। তবে এ সাফল্যের মধ্যেও ফসলটির মানসম্মত বীজ সরবরাহ নিয়ে এখনো অস্বস্তি রয়ে গিয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনো দেশের মোট আলুবীজ সরবরাহের ৮৮ শতাংশই আসে অপ্রাতিষ্ঠানিক বা আধাপ্রাতিষ্ঠানিক খাত থেকে। প্রাতিষ্ঠানিক উৎস থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় ফসলটির মানসম্মত বীজ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ তাদের।
মানসম্মত বীজের অভাবে প্রত্যাশিত মাত্রায় আলুর রফতানি বাড়াতে পারছে না বাংলাদেশ। এর কারণ হিসেবে শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, এসব বীজ থেকে প্রথাগত পন্থায় উৎপাদিত আলুতে জলীয় অংশের পরিমাণ অনেক বেশি। ফলে এসব আলুর প্রক্রিয়াকরণ ও রফতানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে এ বীজের মানসম্মততা না থাকার কারণেই ফলনশীলতাও বাড়ছে না আলুর।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট আলুবীজ সরবরাহে প্রাতিষ্ঠানিক অবদান মাত্র ১২ শতাংশ। মোট সরবরাহে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) অবদান রাখছে ৫ শতাংশ। এছাড়া কৃষিপণ্যটির বীজের মোট সরবরাহে ব্র্যাকের ২ শতাংশ, এসএসসিএলের ১ ও অন্যান্য কোম্পানির সম্মিলিত অবদান ৪ শতাংশ। এর বাইরে পুরোটাই অর্থাৎ ৮৮ শতাংশই সরবরাহ হচ্ছে অপ্রাতিষ্ঠানিক বা আধাপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে। তবে এর মধ্যে সেমি ফরমাল বা আধাপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রায় ৪৮ শতাংশ ও সম্পূর্ণরূপে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রায় ৪০ শতাংশ বীজ সরবরাহ হচ্ছে। প্রথাগত এসব বীজ ব্যবহারের কারণে উৎপাদন বাড়লেও এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়েনি আলুর বিকল্প ব্যবহার।
অন্যদিকে গত এক দশক ধরেই আলুর হেক্টরপ্রতি ফলন আটকে রয়েছে ১৮-২০ টনের মধ্যে। যদিও ২০৩০ সালের মধ্যে তা ৩০ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। অপ্রাতিষ্ঠানিক ও মানহীন বীজের সরবরাহকেই ফসলটির ফলনশীলতা বৃদ্ধিতে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, আলুর ভালো মানের বীজ সরবরাহে অন্যতম বাধা পর্যাপ্ত গবেষণা এবং ভালো জাতের অভাব। দেশে এ কাজের জন্য টিস্যু কালচার ল্যাব রয়েছে মোটে ছয়টি। এসব ল্যাবের সম্মিলিত প্লান্টলেট উৎপাদন ক্ষমতা মাত্র ৭-৮ লাখ। সরকারিভাবে বিএডিসির মাত্র দুটি বিশেষায়িত আলুবীজ উৎপাদন খামার রয়েছে। বীজ আলু উৎপাদন জোন রয়েছে ২৮টি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আলুর ভালো বীজের সরবরাহ বাড়াতে হলে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে বিএডিসিকেও নিতে হবে আরো শক্তিশালী ভূমিকা। বিশেষ করে বাড়তি ভিত্তিবীজ আলু উৎপাদনের জন্য সংস্থাটির খামার ও টিস্যু কালচার ল্যাবের সংখ্যা বৃদ্ধি, আলু উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন ও হিমাগারের সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
এ বিষয়ে বিএডিসির গবেষণা বিভাগের প্রধান সমন্বয়কারী ড. মো. রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, বীজের আমদানিনির্ভরতা হ্রাস, স্বল্পমূল্যে বীজ সহজলভ্য করা, ফলন ৩০ টনে উন্নীত করা ছাড়াও সরকারের বেশকিছু লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে অধিকতর উচ্চফলনশীল জাত অন্তর্ভুক্তকরণ, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসমুক্ত বীজ আলু উৎপাদন ও ৪০ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক বীজকে মানসম্পন্ন বীজ দ্বারা প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য রয়েছে। শিল্পে ব্যবহারযোগ্য ও রফতানি উপযোগী আলুর জাত বিদেশ থেকে আনা হচ্ছে। এরই মধ্যে আলুর বেশ কয়েকটি জাত বাংলাদেশে চাষের উপযোগী করা হয়েছে। ল্যাবের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। নির্মীয়মাণ চারটির সঙ্গে আরো চারটি নতুন হিমাগার স্থাপন করতে পারলে বিএডিসির বীজের ধারণ সক্ষমতা ৬০ হাজার টনে উন্নীত করা সম্ভব হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে প্রায় সাড়ে চার লাখ হেক্টর জমিতে আলুর উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৮ লাখ টনের বেশি। অন্যদিকে দেশে কৃষিপণ্যটির বার্ষিক চাহিদা ৭০-৭৫ লাখ টন। সে হিসেবে দেশের আলুর উদ্বৃত্ত উৎপাদন হচ্ছে। উৎপাদিত আলুর মধ্যে ফলনপরবর্তী ক্ষতি (পোস্ট হারভেস্ট লস) বাদ দিলে এ উৎপাদন দেশের মোট চাহিদার সমানে নেমে আসে। সে হিসেবে মানসম্মত বীজ সরবরাহের মাধ্যমে ফলনশীলতা বৃদ্ধি করা গেলে আলু দেশের রফতানি খাতকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারবে।










