গ্যাসের দাম গড়ে ১১৭ শতাংশ বাড়াতে ছয় বিতরণ কোম্পানি গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে প্রস্তাব দিয়েছিল। যদিও বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের দাম ২০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করে। তবে এখন পর্যন্ত গ্যাসের দামের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি সংস্থাটি। এর কারণ হিসেবে বিইআরসি বলছে, ভর্তুকি, গ্যাস উন্নয়ন তহবিল ও রিটেনশন মানি—এ তিন উৎস থেকে অর্থপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত দাম নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া যাচ্ছে না।
গ্যাসের দামের বিষয়টি মূলত নির্ভর করে ভর্তুকির ওপর। বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে সর্বশেষ গ্যাসের দাম নির্ধারণের সময় প্রতি ঘনমিটারে ২ টাকা ৪৯ পয়সা ভর্তুকি দেয়া হয়েছিল। এবার গ্যাস খাতে সরকার কোনো ভর্তুকি দেবে কিনা বা দিলেও তার পরিমাণ কত; সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।
গ্যাস খাতে উন্নয়নের জন্য গ্রাহকের কাছ থেকে প্রতি ঘনমিটারে ৪৬ পয়সা করে কেটে রাখা হয়। যে তহবিলে এটি যুক্ত হয় সেটির নাম গ্যাস উন্নয়ন তহবিল (জিডিএফ)। পেট্রোবাংলার কাছে জিডিএফ থেকে এবার ৪ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে বিইআরসি। এ অর্থ গ্যাসের মূল্যে ভর্তুকি হিসেবে ব্যবহার করতে চায় সংস্থাটি। একইভাবে গ্যাস কোম্পানিগুলোর কাছে গচ্ছিত আপত্কালীন (রিটেনশন মানি) যে অর্থ রয়েছে, সেখান থেকেও ৩ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে বিইআরসি। এসব অর্থপ্রাপ্তির বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে এখনো কোনো সাড়া পায়নি কমিশন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে গ্যাসের দাম গড়ে ১১৭ শতাংশ বাড়াতে বিইআরসিকে প্রস্তাব দিয়েছিল ছয়টি বিতরণ কোম্পানি। একই সঙ্গে পেট্রোবাংলা ও সঞ্চালন কোম্পানি গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) বিতরণ মার্জিন বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। তবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে পারেনি।
গত ২২-২৪ মার্চ গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর শুনানি করে বিইআরসি। কমিশন আইন অনুযায়ী, গণশুনানির ৯০ দিনের মধ্যে দামসংক্রান্ত ঘোষণার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে দুই মাস পার হলেও এখন পর্যন্ত গ্যাসের দামসংক্রান্ত ঘোষণার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু জানাতে পারছে না কমিশন।
কমিশনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো প্রস্তাব দেয়ার আগেই কমিশন গ্যাস খাতে ভর্তুকির বিষয়টি জানতে ১৩ মার্চ জ্বালানি বিভাগে চিঠি দেয়। দুই দফায় বিষয়টি জানতে চিঠি দেয়া হলেও ২৮ মে পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।
তবে বিইআরসির অন্য একটি সূত্র বলছে, ক্যাপটিভ পাওয়ার ও সার কারখানাগুলোর গ্যাস বিল বাড়াতে কমিশনের ওপর চাপ রয়েছে। বিষয়টি পর্যালোচনা করছে কমিশন। এটির সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত গ্যাসের দাম ঘোষণার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না তারা।
বিষয়টি নিয়ে বিইআরসির সদস্য মো. মকবুল ই-ইলাহী চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, গ্যাসের দাম নির্ধারণে ভর্তুকির বিষয়টি জড়িত। সরকার কী পরিমাণ ভর্তুকি দেবে সেই অর্থের ওপর দাম নির্ভর করবে। এছাড়া এটি দাম ঘোষণার সঙ্গেও জড়িত। এখনো নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে সে ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।
গ্যাস খাতে গত অর্থবছরে সরকার ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছিল বলে জানায় কমিশন। এ বছর ঠিক কী পরিমাণ ভর্তুকি দেয়া হবে সে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয় সংস্থাটি। কারণ চলতি অর্থবছরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় এলএনজি ক্রয়ে জ্বালানি বিভাগের ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ। বিদ্যমান ভর্তুকি দিয়ে এ চাপ সামাল দিতেও হিমশিম খাচ্ছে অর্থ বিভাগ। এরই মধ্যে এলএনজি আমদানি করতে প্রথমবারের মতো জিডিএফ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা পেট্রোবাংলাকে ঋণ হিসেবে নেয়ার অনুমতি দিয়েছে অর্থ বিভাগ। ফলে চলতি অর্থবছরে গ্যাস খাতে বরাদ্দের পরিমাণ বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এদিকে এবারের গণশুনানিতে গ্যাস খাতে অর্থ সাশ্রয় করতে গ্যাসের আবাসিক গ্রাহকদের জন্য নির্ধারিত পরিমাণের মাত্রা কমিয়ে আনার সুপারিশ করেছে কারিগরি কমিটি। সুপারিশে বলা হয়েছে, দুই চুলায় এখন ৭৭ ঘনমিটার গ্যাসের ব্যবহার ধরে আবাসিক গ্রাহকদের বিল করা হয়। এটি কমিয়ে ৬০ ঘনমিটার করতে হবে। অর্থাৎ গ্রাহকপ্রতি ১৭ ঘনমিটারের বাড়তি বিল আদায় করতে হবে। যদিও ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) দাবি, দুই চুলায় গ্যাসের বিল ৪০ ঘনমিটার ধরে হিসাব করতে হবে। কারণ প্রিপেইড মিটার গ্রাহকরা মাসে গড়ে এ পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার করে। ফলে সব বিষয় আমলে নিয়ে এবারের গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করছে কমিশন।
গ্যাসের দাম বাড়ানো নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিল্প মালিক, সব পর্যায়ের গ্রাহকের মধ্যে উত্কণ্ঠা রয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এ বাজারে গ্যাসের দামও বাড়ানো হলে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে বলে সতর্ক করে দিয়েছে ব্যবসায়ী সংগঠন থেকে শুরু করে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো।
এর আগে ২০১৯ সালের ৩০ জুন গ্যাসের গড় মূল্য ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়ায় বিইআরসি। তাতে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৭ টাকা ৩৮ পয়সা থেকে বেড়ে ৯ টাকা ৮০ পয়সা হয়। আবাসিক গ্রাহকদের এক চুলার জন্য মাসে ৭৫০ টাকার পরিবর্তে ৯২৫ টাকা এবং দুই চুলার জন্য ৮০০ টাকার পরিবর্তে ৯৭৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।










