জাতীয় শিল্পনীতি সর্বশেষ প্রণয়ন হয়েছে ২০১৬ সালে। প্রকাশের অপেক্ষায় আছে নতুন শিল্পনীতি। এরই মধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে খসড়া। পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চলতি মাসেই প্রকাশ পাওয়ার কথা রয়েছে জাতীয় শিল্পনীতি ২০২২। খসড়ায় প্রথমবারের মতো নতুন বা স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সরকারি সহায়তার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক স্টার্টআপ বা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ‘স্টার্টআপ ফাইন্যান্সিং স্কিম’ চালু করবে বলে দিকনির্দেশনা রয়েছে খসড়ায়।

২০১৬ সালের নীতিতে স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক কোনো অধ্যায় ছিল না। তবে ২০২২ সালের খসড়া শিল্পনীতিতে এ-সংক্রান্ত পৃথক একটি অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতির দ্রুত উন্নয়নের স্বার্থে উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিকল্পনা সহজে বাস্তবায়নকল্পে প্রয়োজনীয় যেকোনো সেবা, সুবিধা, প্রণোদনা, লাইসেন্স, অনুমতি, ছাড়পত্র ইত্যাদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে স্টার্টআপ বা নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও বিকাশের কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

খসড়া অনুযায়ী, স্টার্টআপ ব্যবসা পরিচালনায় প্রয়োজনীয় বিভিন্ন প্রত্যয়ন যেমন ব্যবসা নিবন্ধন, লাইসেন্স প্রক্রিয়া, পরিবেশ ছাড়পত্র ও ক্লিয়ারেন্স শর্ত ইত্যাদি সহজলভ্য করার জন্য অনলাইন/ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু এবং তা কার্যকর করা হবে। নতুন প্রজন্মকে উদ্যোক্তা হিসেবে প্রস্তুত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব ক্ষেত্রে বিজনেস ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন করা হবে। এক্ষেত্রে এসএমই ফাউন্ডেশন ও বিসিকের বিজনেস ইনকিউবেশন সেন্টারের মাধ্যমে এসএমই উদ্যোক্তাদের সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করা হবে। শিক্ষিত তরুণদের উদ্ভাবনীমূলক ব্যবসায় উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসা পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রতিযোগিতা (বিজনেস প্ল্যান কম্পিটিশন) আয়োজন করা হবে বলে উল্লেখ রয়েছে শিল্পনীতির খসড়ায়।

এসএমই ফাউন্ডেশন এবং বিসিক কর্তৃক নিজস্ব পরামর্শক সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তাদের পরামর্শ ও তথ্যসেবা দেয়া হবে উল্লেখ করে খসড়ায় বলা হয়েছে, সরকারের সহায়তায় প্রতিটি জেলা/উপজেলায় পরামর্শক সেবা কেন্দ্র স্থাপন করে পরামর্শ ও তথ্যসেবা দেয়া হবে। এক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেও নতুন উদ্যোক্তাদের নিয়মিত পরামর্শ সেবা দেয়া হবে। বিসিক কর্তৃক নিজ কার্যালয়ে স্থাপিত কেন্দ্রীয় ওয়ান স্টপ সেবা কেন্দ্র এবং জেলা পর্যায়ের অন্য সব ওয়ান স্টপ সেবা কেন্দ্রের কর্মকাণ্ড সমন্বয় করা হবে।

নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণের লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট কর্তৃক সারা দেশে নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে বলে উল্লেখ রয়েছে খসড়ায়। আবার বাংলাদেশ ব্যাংক স্টার্টআপ বা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ‘স্টার্টআপ ফাইন্যান্সিং স্কিম’ চালু করবে ও বাংলাদেশ ব্যাংক স্টার্টআপ সিএমএসএমই অর্থায়নের জন্য ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড গঠন করতে পারবে বলেও দিকনির্দেশনা রয়েছে খসড়ায়।

নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে দেশে কারখানার সংখ্যা প্রায় ৯৫ হাজার। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় অধীনস্থ কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, এসব কারখানার ৬০ শতাংশের বেশি সাতটি জেলায় স্থাপিত। শিল্পায়নের এ অসম পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে সরকার। যার প্রতিফলন হিসেবে অনগ্রসর এলাকায় শিল্প প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে জাতীয় শিল্পনীতির সর্বশেষ সংস্করণে।

অনগ্রসর এলাকায় শিল্প প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ প্রদান শীর্ষক অধ্যায়ে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে শিল্পনগরী/শিল্পপার্ক স্থাপন ও অবকাঠামো উন্নয়ন অনগ্রসর এলাকায় শ্রমনিবিড় এবং পরিবেশবান্ধব শিল্প প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগে সম্পদ বরাদ্দ দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে। বিদ্যমান সরকারি শিল্প-কারখানার অব্যবহূত জমিসহ সরকারি খাসজমিতে এবং পরিবেশসম্মতভাবে চর উন্নয়ন করে দেশব্যাপী শিল্প খাতভিত্তিক আধুনিক সুবিধাসংবলিত ও পরিবেশবান্ধব মনোটাইপ/ক্লাস্টারভিত্তিক শিল্পনগরী/শিল্পপার্ক স্থাপন করা হবে বলে উল্লেখ রয়েছে নীতির খসড়ায়।

জানতে চাইলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (নীতি, আইন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা) শেখ ফয়েজুল আমীন বণিক বার্তাকে বলেন, শিল্পনীতির খসড়া তৈরি হয়েছে। এখন আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। এখনো মতামত দেয়ার সুযোগ আছে। নতুন বেশকিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে খসড়ায় যেমন স্টার্টআপ উদ্যোক্তা ও অনগ্রসর এলাকায় শিল্পায়ন। আমাদের একটা ম্যান্ডেট আছে যেসব এলাকা অনগ্রসর, সেই এলাকাগুলোয় সুষমভাবে শিল্পায়নের। সেজন্যই এ-সংক্রান্ত একটি অধ্যায় সাজানো হয়েছে জাতীয় শিল্পনীতির ২০২২ খসড়ায়।

অনগ্রসর এলাকায় শিল্পায়ন প্রসঙ্গে জাতীয় শিল্পনীতির খসড়ায় আরো বলা হয়েছে, অনগ্রসর অঞ্চলের সঙ্গে মোংলা, পায়রা ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের নিবিড় যোগাযোগ স্থাপনের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। অনগ্রসর এলাকায় শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চল/রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা/হাইটেক পার্ক/বিসিক শিল্পনগরী স্থাপনের বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। অনগ্রসর এলাকায় শিল্প উন্নয়নের জন্য জেলাভিত্তিক আলাদা বাজেটসহ কর অবকাশ, স্বল্প সুদে ব্যাংকঋণ ও আলাদা উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।

খসড়া অনুযায়ী, অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন ২০১০, বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ আইন ২০১০ এবং বিসিক আইন অনুযায়ী শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং রফতানি বৃদ্ধি ও বহুমুখীকরণে উৎসাহ দেয়া হবে। অর্থনৈতিক অঞ্চল এলাকায় প্রতিষ্ঠিত শিল্প-কারখানার চাহিদার ভিত্তিতে কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি এবং সেবামূলক অগ্র-পশ্চাৎ শিল্প প্রতিষ্ঠায় সহায়তা দেয়া হবে।

বিনিয়োগ উৎসাহিত করার লক্ষ্যে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সমান সুযোগ দেয়া হবে এবং ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারের মাধ্যমে সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করা হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে নীতির খসড়ায়। সেখানে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করা হবে। বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের মাধ্যমে দেশী-বিদেশী উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আস্থা অর্জনে সহায়ক সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পরিকল্পনাবিহীন যেখানে-সেখানে শিল্প স্থাপনে নিরুৎসাহিত করা হবে উল্লেখ করে নীতির খসড়ায় বলা হয়েছে, মেট্রোপলিটন শহরে স্থাপিত দূষণপ্রবণ শিল্পসহ অপরিকল্পিতভাবে স্থাপিত অন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পর্যায়ক্রমে অর্থনৈতিক অঞ্চল, বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বা বিসিক শিল্পনগরীতে স্থানান্তর করা হবে। স্থানান্তরের উদ্যোগী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বিশেষ অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেয়া হবে।

জাতীয় শিল্প নীতি ২০২২-এর খসড়ায় নতুন যুক্ত হওয়া অধ্যায়ের মধ্যে আরেকটি হলো অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্প খাতের উন্নয়ন। এ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্প খাত বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জাতীয় আয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু প্রণোদনা, ঋণ, প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন ও বিপণন সহায়তার পাশাপাশি সরকার কর্তৃক প্রদত্ত অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা পাওয়ার ক্ষেত্রে অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা পিছিয়ে রয়েছেন।

কভিড-পরবর্তী সময়ে অর্থনীতির দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর বিবেচনায় অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সুরক্ষা এবং এর প্রতি সুদৃষ্টি আরো জরুরি হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে খসড়া নীতিতে বলা হয়েছে, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তাদের নিবন্ধন ও উন্নয়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও মেয়াদভিত্তিক জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানা সংস্কার ও ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে নীতিতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প খাতকে লাভজনক, প্রতিযোগী সক্ষম প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর ও কার্যসম্পাদনে দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠা এবং অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা কলকারখানা পরিচালনায় দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকল্পে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে। প্রয়োজনে অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোয় পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শিল্প স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে বলেও উল্লেখ রয়েছে জাতীয় শিল্পনীতি ২০২২-এর খসড়ায়।