চট্টগ্রামে গত বছর কর্মরত অবস্থায় মারা গেছেন ২৩৮ জন শ্রমিক। এর মধ্যে ৪ জুন সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোয় লাগা আগুন ও কেমিক্যাল বিস্ফোরণের ঘটনায় নিহত হন ৫১ জন। আহত হন আরো দুই শতাধিক শ্রমিক। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন বলছে, নিহতদের মধ্যে পরিবহন, নির্মাণ খাত, জাহাজ ভাঙা, পোশাক শ্রমিক, দিনমজুরসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার সাধারণ শ্রমিক রয়েছেন। শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতাদের অভিযোগ, চট্টগ্রামের কর্মক্ষেত্রগুলো শ্রমিকদের ন্যূনতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা পূরণ করছে না।
বিলসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে চট্টগ্রামে বিভিন্ন শ্রম খাতে কাজ করা অবস্থায় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে কমপক্ষে ২৩৮ জন শ্রমিক প্রাণ হারানোর পাশাপাশি মারাত্মক আহতের সংখ্যা চার শতাধিক। আহতদের অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিএম কনটেইনার ডিপো ছাড়া অনান্য খাতের মধ্যে পরিবহন খাতের ৪৯ জন, নির্মাণ খাতের ৩৫ শ্রমিক, জাহাজ ভাঙা খাতে সাত, চা শিল্পে আট, পোশাক খাতে আট, সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে ১২, কৃষক ১৩ এবং নয়জন সুইপারের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া দিনমজুর, বিদ্যুৎ কর্মী, প্রবাসী, কলকারখানা, গৃহপরিচারিকাসহ অন্যান্য শ্রমিক মিলিয়ে আরো প্রায় ৫০ জন নিহত হয়েছেন।
বিলসের সহকারী প্রোগ্রাম অফিসার ফজলুল করিম মিন্টু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শ্রমিকরা কাজ করতে গিয়ে কর্মক্ষত্রে বার বার দুর্ঘটনার শিকার হয়ে অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন এবং অনেকে চিরতরে পঙ্গু হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আমাদের সংগঠনের গবেষণা সেল এবং সাপোর্ট সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।’
এর আগে গত ১৯ অক্টোবর চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে ছুরিকাঘাতে নিহত হন মো. মাসুদ নামে এক শ্রমিক। পিকআপ চালকের সঙ্গে কথা কাটাকাটির জেরে চালকের ভাড়া করা সন্ত্রাসীর হামলায় মাসুদ নিহত হয়। এ ঘটনায় একজন গ্রেফতার হলেও মামলা এখনো চলমান। খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণের দাবি তোলা হলেও কে ক্ষতিপূরণ দেবে সে বিষয়ে কেউ কিছু বলতে পারেননি। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও অপ্রচলিত খাতের শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ নিয়ে কোন আলোচনা হয় না। এ অবস্থায় কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে ক্ষতিপূরণ কে দেবে সেগুলো নিয়েও তৈরী হয় জটিলতা।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকেলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সহকারী সচিব নাজমুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জাহাজভাঙ্গা শ্রমিকরা কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে তাদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি নিয়ে কোন জটিলতা নেই। আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে নিয়মানুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। এমনকি কেউ যদি ক্ষতিপূরণ দিতে গড়িমসি করে তাহলে সংগঠন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে।’
শ্রমিক সংগঠনের নেতারা বলছেন, তাজরীন ফ্যাশন, রানা প্লাজা, সেজান জুস কোম্পানী, এস এস পাওয়ার প্লান্ট এবং সর্বশেষ বিএম কন্টেইনার ডিপোসহ বিভিন্ন কলকারখানায় দুর্ঘটনায় মালিক এবং সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্মকর্তাদের গাফিলতি প্রমানিত হলেও এখন পর্যন্ত কেউ দৃষ্টান্তমূলক শান্তি পায়নি। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মালিক এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরগুলোর উদাসীনতার পরিচয় পাওয়া যায়। আমাদের দেশে মালিকপক্ষ তাদের কল-কব্জা যন্ত্রপাতির নিরাপত্তার জন্য যেরকম যত্নশীল হন, শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিধানে ততটুকু আন্তরিকতার পরিচয় দেননা। অথচ আশংকামুক্ত হয়ে শ্রমিকেরা যদি নিরাপদ কর্ম পরিবেশে কাজ করতে পারে তাহলে একদিকে শ্রমিকের জীবন রক্ষা পায় অন্য দিকে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতাও বাড়ে।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি তপন দত্ত জানান বলেন, ‘শ্রম আইনে কোন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় আহত হয়ে মারা গেলে ২ লাখ এবং চিরতরে পঙ্গু হলে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা উল্লেখ আছে। এটা যেন শ্রমিকদের দারিদ্রতার সাথে চরম উপহাস ছাড়া কিছুই নয়। কেননা মানুষের জীবনের মূল্য এ পরিমাণ অর্থ হতে পারে না।










